২৪ বছরেও মেলেনি উত্তর

২৪ বছরেও মেলেনি উত্তর
২৪ বছরেও মেলেনি উত্তর

নজরুল মৃধা রংপুর: চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের মৃত্যুর দেখতে দেখতে ২৪টি বছর পেরিয়ে গেল। মৃত্যুবার্ষির্কী এলেই তাকে সীমিত আকারে স্মরণ করা হলেও বছরের বাকি দিনগুলোই তার নাম থাকে অনুচ্চারিত।

১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংবাদ সংগ্রহের জন্যে ছুটে গিয়েছিলো গাইবান্ধায়। সেখানে ফুলছড়ি উপজেলার যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্ট থেকে ফেরী যোগে নদী পারাপারের সময় পা পিছলে নদী গর্ভে হারিয়ে যায় মোনাজাত উদ্দিন।

সেখানেই মৃত্যুর সাথে মহা মিলন ঘটে তার। এই মৃত্যুকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন আছে। সেকি আসলে পা পিছলে মারা যায়। নাকি কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এসব কোন প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যায়নি আজোও।

মৃত্যুর একদিন পর ৩০ ডিসেম্বর রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়া কবরস্থানে শায়িত করা হয় মোনাজাত উদ্দিনকে। চির বিদায়ের সাথে প্রশ্ন রেখে যায় অনেকের মাঝে। সত্যি কি পা পিছলে পড়ে নাকি কোনো ষড়যন্ত্রে চলে গেলেন তিনি। সেইসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি দুই যুগেও।

রংপুরের কৃতিসন্তান মফস্বল সাংবাদিকার দিকপাল চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন একজন সফল গবেষকও ছিলেন। তার লেখনিতে ওঠেছে এসেছে গ্রাম বাংলার অজানা অনেক কথা। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এরপর তথ্য-উপাত্তের সঠিক কিনারা উপলব্ধি থেকেই কলমের কালি দিয়ে তৈরি হতো তার রিপোর্টিং।

সততা, ধৈর্য্য আর অসীম সাহসিকতাকে পুঁজি করেই তিনি সাংবাদিকতায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তার লেখনিতে পাঠকরা পেতে নতুন স্বাদ। তাই তিনি পেয়েছিলেন চারন সাংবাদিকের উপাধি। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি নাটক, গল্প, গান লিখে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

চিত্র শিল্পি হিসেবেও তার নামডাক ছিল যথেষ্ট।
তার মৃত্যুর বিষয়ে বেশকজন সিনিয়র সাংবাদিক তাদের অভিব্যক্তি তুলে ধরা হল।

রংপুরের সিনিয়র সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন আব্দুস সাহেদ জানান, মোনজাত উদ্দিন যেদিন মারা যায় সেদিন তিনি ট্রেনে করে রংপুরে আসছিলেন।

বাহাদুরাবাদ ঘাটে এসে শুনতে পান পানিতে পড়ে এক সাংবাদিক মারা গেছে। তিনি কাছে দিয়ে দেখেন মৃত সাংবাদিক আর কেউ নয় তার আপনজন মোনাজাত। পরে তারা লাশ নিয়ে রংপুরে আসেন। এসময় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিল।

তিনি আরো জানান মোনাজাত কাল সোনা চরের রিপোর্ট করেতে সেখানে গিয়েছিলেন। সেই রিপোর্ট করে ফিলিপস পুর¯কার পেয়েছিলন।

তিনি দুঃখ করে বলেন মোনাজাতের মৃত্যু নিয়ে অনেক কথা শুনেছেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এখনো রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। মোনাজাতের মৃত্যু রহস্য দেশবাসিকে জানানো উচিত ছিল।

এক সময়ের মোনাজাত উদ্দিনের একান্ত ঘনিষ্ঠ শিষ্য বর্তমানের সিনিয়র সাংবাদিক এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলাম জানান, আমরা যারা মোনাজাত উদ্দিনের অনুরাগি ছিলাম তাদের একটাই দুঃখ এখন পর্যন্ত তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পারিনি।

এটা দেশের জন্য যেমন কষ্টের তেমনি সাংবাদিক সমাজের জন্যও দুঃখের। কারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন সত্যিকার অর্থে একজন সব্যসাচি ছিলেন।

লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একজন ভলো চিত্র শিল্পীও ছিলেন। প্রচ্ছদ অঙ্কনসহ সব গুণই তার মধ্যে ছিল। এই গুনি মানুষের মৃত্যুর কারণটা জানা উচিত ছিল।

রংপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম তার স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখিতেও পারদর্শি ছিলেন।

তার বেশকটি বই পাঠক সমাজে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন মোনাজাত উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনা আজো অজানা। আসলে সেদিন কি ঘটেছিল এটা উদঘাটন হলে দেশবাসি প্রকৃত ঘটনা জানতে পারতো।

রংপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুর রশিদ বাবু জানান, মোনাজাত উদ্দিনের মৃত্যু আজও রহস্য রয়ে গেছে রংপুরের তথা দেশের সাংবাদিকদের কাছে।

এ প্রশ্নের উত্তর আর কোন দিন পাওয়া যাবেনা। মোনাজাত উদ্দিন পানি এবং মৃত্যুকে খুব ভয় পেতেন। শেষ পর্যন্ত পানিতেই তার মৃত্যু হলো।

মোনাজাত উদ্দিনের মৃত্যুর পর অনেক কথাই উঠেছিল। তবে সব কথার উত্তর পাওয়া যায়নি।

গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি প্রবীন সাংবাদিন নুরুজ্জামান প্রধান দুঃখ প্রকাশ করে বলেন , মোনজাত উদ্দিনের মৃত্যুর ২৪ বছর পেরিয়ে গেল।

এখনো অনেক প্রশ্নের জববা পাওয়া যায়নি। তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্যও দেশবসি জানতে পারেনি । আসলে সেদিন কি হয়েছিল সে প্রশ্ন এখনো অনেকের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে।

রংপুরের মাহিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি বাবলু নাগ তার অভিব্যক্তি বর্ননা করে বলেন, আমরা শুনেছি তিনি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি কুচক্রি মহলের রোষানলে পড়েছিল।

তারাই তাকে ফেরি থেকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। কিন্তু এসব রহস্যের কোন কিনারা আজোও হয়নি। তিনি আরো বলেন বেচে থাকতে যদি মোনাজাত উদ্দিন প্রকৃত মৃত্যু রহস্য জেনে মরতে পারতাম তা হলে অনেক ভালো লাগতো।

ছাত্র থাকা অবস্থাতেই বগুড়ার সাপ্তাহিক বুলেটিন পত্রিকার মাধ্যমে ঝুকে পড়েন তিনি সাংবাদিকতায়। ১৯৬২ সালে স্থানীয় সংবাদদাতা হিসেবে ঢাকার কাগজ দৈনিক আওয়াজ এবং ১৯৬৬ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

মোনাজাত উদ্দিন শুধু সাংবাদিকতায় নয় নাটক, গল্প, কবিতা আর ছড়া লেখায়ও পারদর্শি ছিলেন। বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘করিম মন্ডলের বৈঠকখানা’র পান্ডলিপি লেখার পাশাপাশি ভালো গীতিকার হিসেবেও তার ছিলো বেশ সুনাম। মৃত্যু আগে তার লেখা নয়টি এবং পরে আরো দুটি গ্রন্থ প্রকাশ পায়।

তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – পথ থেকে পথে, মজিবর ও শাহ আলমের কাহিনী, কানসোনার মুখ, লক্ষীটারী, অনুসন্ধানী রিপোর্ট ইত্যাদি।

উত্তর তথা দেশের অহংকার চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে ফিলিপস পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে (মরনোত্তর) ২১শে পদকসহ প্রায় অর্ধ ডজন পুরস্কার পান।

স্বাধীনতার পর তিনি নিজেই দৈনিক রংপুর নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। আর্থিক সমস্যার কারণে সেটি থমকে যায়।

এরপর ১৯৭৬ সাল থেকে মোনাজাত উদ্দিন দৈনিক সংবাদে প্রায় ২০ বছর কাজ করেন। সেখান থেকে বের হয়ে ১৯৯৫ সালে দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় তিনি সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেয়।

মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত জনকন্ঠেই ছিলেন ।

মোনাজাত উদ্দিন রংপুর নগরীরর ধাপ এলাকায় ১৯৪৯ সালের ১৮ জানুয়ারী এক মুসলিম পরিবারে তার জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মৌলভি আলিম উদ্দিন আহমেদ ও মাতা মতিজানেছা।

মোনাজাত কৈলাশ রঞ্জন স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ শেষে ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

এসময় তার বাবাকে হারিয়ে বিপাকে পড়ে মোনাজাত উদ্দিন। পরে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাশ করেন তিনি।