হাফিজ ও রাজহাঁসের গল্প – মিনহাজ উদ্দীন শরীফ

হাফিজ ভর দুপুরে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে একা একা হাঁটছে। রাস্তার দুপাশে সবুজ লতা পাতায় ঘেরা। দেখলে নয়ন কাড়ে। হাতের ডানে একটা পদ্ম পুকুর আছে, যেখানে সোনালী রঙের একটা রাজহাঁসের দেখা মিলে তবে সবাই দেখতে পায় না। যারা নিষ্পাপ ও নির্লোভী তারা ঐ হাঁসের দেখা পায়। লোকের মুখে শুনা কথা। যখন হাফিজের মন খারাপ থাকে তখন সে সেখানে যায়। ঐ পুকুর পাড়ে ছোট-বড় গাছ থাকে হরেক রকম পাখি। বেশিরভাগ সময় বক, চড়ুই, টিয়া, শালিক আর বাবুই পাখির দেখা পাওয়া যায়। অন্য পাখি গুলো ভোর হতেই না হতে অন্নের খুঁজে দূরের বনে ছুটে যায়।

ফিরে গোধূলি বেলা, তাই আর ও’র দেখা হয় না। কারণ সন্ধ্যার পর এই পুকুর পাড় বিপদজনক।গাঁয়ের মোড়ল সাহেব গণ বলে পুকুর পাড়ে নাকি প্রেতাত্মার বাস! কিন্তু আজও কেউ দেখেনি। এই কারণে লোকজন দিনের বেলাই যেতে চায় না পুকুর পাড়ে। আজ হাফিজ স্কুলে যায়নি! কারণ স্কুল ব্যাগটা ছিঁড়ে গেছে। বড় ভাই সকালের খাবার খেতে অফিস থেকে এসে দেখে হাফিজ ঘরে’। ‘জিজ্ঞাসা করে কি রে  ‘হাফিজ’ তুই স্কুলে যাস নি কেন? সে কোনো কথাবার্তা না বলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় ভাই সোফা থেকে উঠে এসে আবারও কারণ জানতে যাচ্ছে স্কুলে কেন গেলো না!সে ভয়ে ভয়ে বলে ভাইয়া আমার স্কুল ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে তাই আজ যাইনি। ভাই অবাক হয়ে বলে একটা ব্যাগ ছেঁড়া বলে স্কুলে গেলি না। যদি ঘরে চাল না থাকে তাহলে কি কর বি?এই বলে বড় ভাই বলে যা আমার চোখের সামন থেকে। জ্ঞান বুদ্ধি তোর কিছুই নেই। আজকে তোর খাবার-দাবার সব বন্ধ। হাফিজ ভয় পেয়ে ঘর থেকে বাহির হয়ে সেই পুকুর পাড়ে চলে গেলো।

কাউকে কিছু না বলে,পুকুর পাড়ে গিয়ে আউ-মাউ করে কান্না জুড়ে দিলো। ও’র কান্না শুনে পুকুরের ঐ রাজহাঁস টা জল থেকে ডাঙায় উঠে এলো। সে সোনালী রঙের রাজহাঁসটা দেখে ও কান্না থামায় নি। রাজহাঁস হাফিজের কান্নার কারণ জানতে যাচ্ছে। কিন্তু সে শুধু কেঁদেই যাচ্ছে কোনো কথাবার্তা না বলে। রাজহাঁস টা কোনো উত্তর পাচ্ছে না বলে, পুকুর পাড়ের গাছ থেকে টিয়া আর শালিক’কে ডেকে নিয়ে এলো। তারা ও এসে একই প্রশ্ন করল কান্নার কারণ কি? হাফিজ এবার কান্না থামাল, ওদের বলছে আমার কান্নার কারণ জানতে চাও? রাজহাঁস,টিয়া আর শালিক একটু বিরক্ত হয়ে বলে শুনবো বলেই তো এসেছি। তাড়াতাড়ি বল না? টিয়া;- রাজহাঁসের ও শালিকের কানে কানে বলল এখন তো স্কুলের সময়। তাহলে এই সময় এই ছেলে স্কুলে না গিয়ে কান্না করছে কেন? ব্যাপারটা কেমন রহস্যময় লাগছে আমার কাছে। রাজহাঁস বলল আচ্ছা, এটা নিয়ে পরে আলোচনা করব। এখন সে বলুক ও’র কি সমস্যা।

হাফিজ ভেজা কন্ঠে বলে! আমি আজ স্কুলে যাইনি তাই আমার বড় ভাইয়া আমাকে বকুনি দিয়ে  ঘর থেকে বাহির করে দিয়েছে। আমাকে বলেছে তোর খাবার -দাবার আজ থেকে বন্ধ। আমি কি করে আমার খাবার যোগাড় করব, আমি তো এখনও ছোট এই ভেবে কান্না করছি। টিয়া জানতে চাচ্ছে তাহলে স্কুলে না যাওয়ার কারণ কি? সে জবাব দিলো আমার স্কুল ব্যাগটা ছিঁড়ে গেছে তাই স্কুলে যাইনি। টিয়া একটু মুচকি হেসে বলল ব্যাগ ছিঁড়েছে তাতে কি? হাতে করেও তো বই নেওয়া যায়। হাফিজ আর কোনো কথা বলেনি কারণ একটা বন্যপ্রাণী ও ও’র থেকে জ্ঞান বুদ্ধিতে এগিয়ে। রাজহাঁস তাকে বলে দেখো ভাই- “বড় ভাই হচ্ছে বাবার সমতুল্য”। বড়রা কখনো তোমার অমঙ্গল চাইবে না। তারা সবসময় তোমার মঙ্গল  কামনা করবে। তোমার ও উচিৎ তাদের শ্রদ্ধা ভক্তি করা। তাদের সাথে কখনো রাগ দেখানো তোমার কাম্য নয়। তুমি বললে-না তোমার ভাই বলেছে। তোমার খাবার-দাবার আজ থেকে বন্ধ। এটা তো রেগে বলেছে। যখন রাগ কমে যাবে তখন, তুমি দেখে নিও তোমাকে বুকে জড়িয়ে নিবে। আমি যখন পুকুরে সাঁতার কাটতে আসি বাবা আমাকে আসতে দেয় না, মা আমাকে আসতে দেয়, বাবা তখন আমার প্রতি খুব রাগ করে।

যখন আমি আবার ভালোয় ভালোয় ফিরে যাই তখন বাবার রাগে থাকে না। বাবা মায়ের সাথে আমাকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আমাকে ও তো তারা শাসন করে কই আমি তো তাদের ছেড়ে যাই না। যদি চলে যাই যেকোনো সময় বিপদে পড়ে প্রাণ হারাতে পারি। কারণ বাহিরের জগতে চতুর্দিকে বিপদ আর বিপদ। বাবা মায়ের কাছে ও অনেক বিপদ আছে।”না বললেই নয় কিন্তু”। তবে তারা আমাদের বুঝতে দেয়না। রাজহাঁসের কথা শুনে হাফিজ চোখের পানি মুছে ফেলল। রাজহাঁস টিয়া আর শালিক তাকে বলছে এখন তুমি তোমার ভাইয়ের কাছে ফিরে যাও। দেখবেন তোমার বড় ভাই তোমাকে আর বকুনি দিবে না আর খেতে ও দিবে। হাফিজ বলে তাই যেনো হয়।  রাজহাঁস,টিয়া আর শালিক বিদায় দিলো। কিন্তু হাফিজ ওদের ছেড়ে আসতে চাই ছিলনা। ‘রাজহাঁস বলে এখন তুমি যাও ‘সন্ধ্যা হলে তুমি বিপদে পড়বে৷ যদি আবার দেখা করতেই চাও তাহলে তোমার বিপদের দিনে এসো।

হাফিজ এখন একথা শুনে আর দেড়ি করল না। ওদের দিকে হাত উঠিয়ে টা টা দিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরে হেঁটে এলো। গেইটের সামনে দেখে বড় ভাই দাঁড়িয়ে আছে। হাফিজ ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বড় ভাই দেখেই দৌড়ে এসে হাফিজকে বুকে জড়িয়ে বলে কি রে ভাই আমার সাথে অভিমান করে কোথায় চলে গিয়েছিল? দেখ তোর জন্য আমি এখনও পানি ও মুখে দেইনি। চল্ দু’ভাই এক সাথে আজ খেতে বসি। সে বলে তুমি তো সকাল বেলা বলেছিলায়, আমার খাবার-দাবার আজ থেকে বন্ধ। তাহলে এখন কেন আমি খাবো? বড় ভাই বলে আরে পাগল রাগে মানুষ কত কথাই বলে। এইসব মনে রাখতে নেই।

চল্ না ভাই খেতে, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে, সে বলে চলো ভাইয়া। হাফিজ খেয়ে একটু জিড়িয়ে আবারও চলে গেল পুকুর পাড়ে। গিয়ে দেখে রাজহাঁসটা নিজের নীড়ে যাওয়ার জন্য,টিয়া আর শালিকে বিদায় জানাচ্ছে। তখনই হাফিজ গিয়ে তাদের আড্ডায় হাজির। রাজহাঁস, টিয়া শালিক দেখে আবেগময় হয়ে প্রশ্ন করল বাড়ি যাও নি? সে প্রতিউত্তরে বলে গিয়েছিলাম তো । তারা বলে তাহলে এলে যে, আবার কোনো বিপদ হয়েছে কি? হাফিজ হাসি মুখে বলে ”বিপদের দিনে আসব আর সুখের দিনে আসব না” এটা তো হতে পারে না। রাজহাঁস কিছুটা আন্দাজ করেছে। কিন্তু টিয়া আর শালিক কিছুই বুঝেনি তাই জানতে চায় আসল ঘটনা। সে কবিত্বের মতো উদাস হয়ে বলে
”রাজহাঁসের কথা তো হয় – নি টিয়া-শালিক মিছে;বাড়িতে যাওয়ার পর খাবার স্নেহ সব দাদা দিছে”। রাজহাঁস আজকে বড্ড খুশি,কারণ তার কথা মিছে হয়নি।হাফিজ রাজহাঁসের অনেক প্রশংসা করছে। টিয়া ও শালিকের কথা বলতে বলতে সূর্য ডুবে গেছে। তাই প্রত্যেকে নিজের নীড়ে যাওয়ার জন্য। নিজ থেকেই বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। হাফিজ ও বাড়িতে চলে এলো।

আপনার মতামত লিখুনঃ