সুবর্ণচরে তরমুজের সর্বনাশ, দুশ্চিন্তায় কৃষক
সুবর্ণচরে তরমুজের সর্বনাশ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

চলতি মার্চ মাসের বৃষ্টি ও বৃষ্টি পরবর্তী খরায় ছত্রাক, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে মরে যাচ্ছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের তরমুজ গাছ। কোথাও কোথাও গাছ সবল থাকলেও নেই ফলন। এমন ফলন বিপর্যয়ে লোকসানের আশঙ্কা করছে কৃষকরা। এমন ঘটনাকে স্থানীয় কৃষিবিদরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মনে করছেন। তারা আবহাওয়া ও লবণাক্ত সহনীয় বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

জেলার অন্যতম কৃষি অঞ্চল বিবেচিত সুবর্ণচর উপজেলার পুরো অংশ জুড়েই তরমুজের ফলন বিপর্যয়ের অবস্থা বিরাজ করছে। তবে যারা অগ্রিম তরমুজ চাষ করেছে তাদের কেউ কেউ ভালো ফলন তুলতে পেরেছেন। কৃষকরা জানান, গত এক দশকের বেশি সময় এখানে রবি মৌসুমে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি তরমুজ বেশ ভালো উৎপাদন হয়ে আসছে।

বেসরকারি এক হিসেব বলছে, প্রতি বছরে প্রায় দুইশত কোটি টাকার তরমুজ উৎপাদন হয়ে আসছে এ কৃষি অঞ্চলে। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় দিনদিন তরমুজ চাষে আগ্রহী উঠেছে কৃষক। কিন্তু গত বছর অল্প পরিসরে তরমুজে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দেখা দেয়। এতে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন কৃষক। চলতি বছরের মার্চ মাসে বৃষ্টি হলে অধিকাংশ জমিতে পানি জমে যায়। এর পরপরই দেখা দেয় খরা। খরায় বৃষ্টির পানি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেতের তরমুজের গাছগুলো হলুদ বর্ণ ধারণ করে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কোনো জমিতে লবণাক্ত বেড়ে গিয়েও ঝলসে যাচ্ছে গাছ।

আবার কোথাও কোথাও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। জমিতে গাছগুলো সবুজ ও বেশ ভাল গজালেও নেই ফুল বা ফল। কিছু কিছু স্থানে ফলন হলেও পরিমাণে কম ও আকারে অনেক ছোট হয়েছে। তরমুজ গাছে ছত্রাক ও ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন কোম্পানির বালাইনাশক ব্যবহার করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না কৃষক। তারা বলছেন, এখনই ক্ষেতের তরমুজ কাটার কথা ছিল। কিন্তু ফলন না হওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। লাখ লাখ টাকার ঋণ নিয়ে তরমুজে ব্যয় করে এখন ঋণের জালে সর্বশান্ত হওয়ার পথে তারা।

উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় বেশিরভাগ জমির তরমুজ গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। একই জমিতে বিভিন্ন অংশের গাছ মরে শুকিয়ে গিয়েছে। কিছু কিছু শুকানোর পথে। গাছে কোনো ফুল বা ফল নেই। এভাবে একরের পর একর জমির তরমুজ গাছ মরে যাচ্ছে। গাছের গোড়ার অংশ ভালো থাকলেও পাতা থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করতে করতে শুকিয়ে আসছে গোড়া পর্যন্ত।

একই চিত্র দেখা গেছে পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের বিভিন্ন ক্ষেতে। মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়নের তরমুজ ক্ষেতে দেখা যায় অন্য চিত্র। সেখানে বেশ কয়েকটি ক্ষেতে লবণ বেড়েছে। এতে ওই জমির গাছগুলো অনেকটা ঝলসে গেছে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে চরজুবলি ইউনিয়নের উত্তর কচ্ছপিয়া গ্রামে। সেখানকার তরমুজ ক্ষেতের গাছগুলো বেশ ভালো গজিয়েছে। সবল ও সবুজে ছেয়ে গেছে তরমুজ ক্ষেত। কিন্তু গাছে নেই কোনো ফুল বা ফল। সেসব ক্ষেতেরও কোনো কোনো অংশে গাছের পাতায় হলুদ বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে।

দক্ষিণ কচ্ছপিয়া গ্রামের কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, গত কয়েক বছর তিনি তরমুজ চাষ করে আসছেন। প্রতি বছর ভালো ফলন হওয়ার পাশাপাশি ভালো দামও পাচ্ছিলেন। এবছর তারই সুবাদে তিন একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে দেড় লক্ষাধিক টাকা খরচও হয়েছে। স্থানীয় এনজিও সাগরিকা থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। তবে যদি তার তরমুজ ক্ষেতের তরমুজ ভালোভাবে হতো তাহলে তিনি এ ক্ষেত থেকে ছয় লক্ষাধিক টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারতেন। এতে তিনি সকল ঋণ পরিশোধ করে ভালো লাভবানও হতে পারতেন। কিন্তু চলতি মাসের বৃষ্টিতে তিনি একদম শেষ হয়ে গেছেন।

ওই কৃষকের ভাষ্য মতে, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের বৃষ্টিতে প্রথমে গাছগুলো সবুজ ও সুন্দর দেখা যায়। কিন্তু বৃষ্টির পর পরই যখন খরা দেখা দেয় তখনই তার গাছগুলোর পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। বিভিন্ন বালাই নাশক কোম্পানির পরামর্শে তিনি একাধিক বালাই নাশক ব্যবহার করেও কোনো প্রতিকার পাননি। দিন দিন ক্ষেতের গাছগুলো শুধু মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। অথচ মার্চ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে প্রথম দফায় তিনি অন্তত দুই লক্ষাধিক টাকার তরমুজ তুলতে পারতেন যা দিয়ে ঋণের টাকা শোধ করতে পারতেন । এমন অবস্থায় কি করবেন সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না এ কৃষক।

উত্তর কচ্ছপিয়ার কৃষক মো. ইসমাইল জানান, তিনি দেড় একর জমিতে এ বছর তরমুজ করেছেন। বৃষ্টির পর পর গাছগুলো দারুণ গজিয়েছে। পুরো ক্ষেত সবুজের সমারোহে ভরে গেছে। এমন অবস্থা দেখে বেশ খুশি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গাছ গজালেও কোনো ফুল ও ফল দেখা দিচ্ছে না। পরে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির ভিটামিন ব্যবহার করলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। তিনি শঙ্কা করছেন গাছগুলো গজালেও আর কোনো ফল আসবে না। যদি ফল না আসে তাহলে তিনি কয়েক লক্ষ টাকা ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়বেন।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের তরুণ কৃষক আতিক বলেন, এই প্রথম তিনি আড়াই একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। শুরুর দিকে গাছগুলো বেশ সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছিল। পোকা-মাকড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ফাঁদ ব্যবহার করছেন। কিন্তু মার্চের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টির পরপরই তার জমিতে দেখা দিয়েছে লবণের প্রভাব। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত তার জমির গাছগুলো ঝলসে যেতে শুরু করে। তিনি এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন স্থানীয় এনজিও থেকে। তিনি জানান, জমিতে অনেক ফল আসলেও সেগুলো পচে যাওয়ার পথে। তাছাড়া ফলগুলো বড়ও হচ্ছে না। আকারে বেশ ছোট।

পিকেএসএফ এর অর্থায়নে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা সাগরিকার কৃষি বিভাগে কাজ করেন কৃষিবিদ শিবব্রত ভৌমিক। তিনি বলেন, ‘গত বছরই মূলত এ রোগের আক্রমন শুরু হয়। প্রথমত একই জমিতে একই ফসল বারবার করার কারণে এ রোগ আক্রান্ত হয়। এর বাহিরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন না করাও একটি বড় কারণ। কৃষকরা সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। তাছাড়া যে বীজ তারা ব্যবহার করেন তাও এ অঞ্চলের উপযোগি নয়। ফলে খুব দ্রুত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জমিতে আক্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। তিনি বলেন, এ মুহুর্তে এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই।

গবেষণা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউটের নোয়াখালী কার্যালয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমির ফয়সাল এ ব্যাপারে জানান, তার দপ্তর ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি মাঠ সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। দেখা যায় নিচু জমিতে রোগের আক্রমন বেশি আর উচু জমিতে পোকার আক্রমণ। মূলত ক্রাউন ফ্রুট রুট রট নামক রোগ। যা পাতা থেকে শিকড় পর্যন্ত নষ্ট করে। ঢলে পড়া রোগও রয়েছে। এ বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে দাপ্তরিকভাবে দ্রুত জানানো হবে এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে এ বছর জেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সুবর্ণচরেই তরমুজ করা হয়েছে ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে।

আপনার মতামত লিখুনঃ