সুন্দরগঞ্জের সেনপাড়ায় চলছে কুমুড় বড়া তৈরির ধুম

সুন্দরগঞ্জের সেনপাড়ায় চলছে কুমুড় বড়া তৈরির ধুম
সুন্দরগঞ্জের সেনপাড়ায় চলছে কুমুড় বড়া তৈরির ধুম

জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধিঃ রাত তিনটায় জেগে ওঠে পাড়া। বাড়ির মহিলাদের টেঁকির শব্দে মুখরিত হয় গ্রাম। মাষ কলাই টেঁকিতে কিংবা জাতায় পিষে গুড়ো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পরিবারের সকলে। কেউবা চাল গুড়ো করায় ব্যস্ত। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই শুরু হয় তাদের কর্মব্যস্ততা।

গ্রামটি হলো উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ফলগাছা (সেনপাড়া) গ্রাম। গ্রামটি জুড়ে প্রায় ১’শ হিন্দু পরিবারের বসবাস। সে কারণে হিন্দু পাড়া নামেও বেশ পরিচিত রয়েছে গ্রামটির। শতাধিক পরিবার এভাবেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ডালের বড়া তৈরির কাজে। শীতকাল শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেনপাড়ার প্রতিটি বাড়িতে চোখে পড়বে ডালের বড়া তৈরির এ দৃশ্য।

শীতকালে সবজির সঙ্গে মুখরোচক খাবার হলো ডালের বড়া। স্থানীয়ভাবে এটিকে বলা হয় কুমুড় বড়া। সারা বছর এর কদর থাকলেও শীতকালে চাহিদা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। তাই এখন সেনপাড়াতে চলছে কুমুড় বড়া তৈরির ধুম। সেনপাড়ার শতাধিক হিন্দু পরিবারের বর্তমান আয়ের প্রধান উৎস এই বড়া বিক্রির টাকা। বড়া তৈরির প্রধান উপাদান হচ্ছে মাশকলাই (ডাল)। মূলত বড়া তৈরির জন্য মাশকলাইয়ের সঙ্গে চালের আটা মিশিয়ে বড়া তৈরি করতে হয়।

শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে বড়া বানানোর কাজে লেগে যায় সেনপাড়ার শতাধিক হিন্দু পরিবারের সকল নারী-পুরুষ। বাদ থাকে না বাড়ির ছেলে-মেয়েরাও। সবাই লেগে যায় বড়া তৈরির কাজে। সারারাত বালতি বা বড় পাতিলে মাষকলাই পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর ঢেঁকি কিংবা জাতা পিষে গুড়ো করেন তাঁরা। পরে তা চালের আটার সঙ্গে মিশিয়ে ছোট ছোট গুটি করতে হয়। এসব গুটি পাতলা কাপড় অথবা টিনের উপরে রেখে রোদের তাপে শুকাতে হয়। রোদ ভালো হলে দুই দিনের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয় বড়া।

বারো মাস বড়া তৈরি করে হাট-বাজারে বিক্রি করে সংসারের চাকা সচল রাখে পরিবার গুলো। তবে শীত শুরু হওয়ায় বাজারে বড়ার চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুন। এ কারণে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বড়া তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে পরিবার গুলো। আগের চেয়ে এখন বড়া বিক্রি করে ভালো টাকা আয় করছে তারা।

প্রথমে মাসকলাই রৌদ্রে শুকিয়ে যাতায় ভেঙ্গে পরিষ্কার করে কিংবা না ভেঙে পানিতে ভিজিয়ে রেখে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হয়। প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা মাসকলাই পানিতে ভেজাতে হয় বলে জানান কুমড়া বড়ি তৈরিতে অভিজ্ঞ নারীরা। তারপর ঢেঁকি বা শিল-পাটা বেটি নিয়ে বড়ার মিশ্রণ তৈরি করা হয়। দুইটি উপকরণের সংমিশ্রণে তৈরিকৃত ডালের বড়া বা কুমড়া বড়া মাঠ, বাড়ির আঙ্গিনা, ছাদ বা খোলা জায়গায় সকাল থেকে রোদে রাখতে হয়। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত তা শুকানো শেষে উঠানো হয়।

বিভিন্ন রংয়ের পাতলা কাপড়ে সারি সারি বড়ার গুটি বসানোর দৃশ্য দেখতেও মনোমুগদ্ধকর লাগে। ওই বড়া বসানোর পর কয়েক দিন একটানা রৌদ্রে শুকানো হয়। সূর্যের আলো কম হলে ৫-৭ দিন পর্যন্ত লেগে যাওয়া শুকানো বড়ি কাপড় থেকে উঠিয়ে অন্য পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। এসব বড়া সবজি তরকারির সঙ্গে ছাড়াও ভর্তা করে খাওয়া যায়। বিশেষ করে আগের রাতে বড়ার সঙ্গে মাছ, মুলা এবং বেগুন দিয়ে ঝোল তরকারি রান্না করে পরের দিন সকালে গরম ভাতের সঙ্গে খেলে তৃপ্তি সহকারে ঢেকুর ওঠে।

প্রতি কেজি বড়া তৈরি করতে খরচ পরে ১১০-১২০ টাকা পর্যন্ত। শীত মৌসুমে বড়া বিক্রি করে ভালোই চলে সংসার। তবে ভালোমানের বড়া প্রতি কেজি ২৫০ টাকা আর একটু কম মানের বড়া ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। সেনপাড়ার তৈরি এসব বড়া স্থানীয় হাট-বাজার ছাড়াও গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়। সেনপাড়ার বড়া ব্যবসায়ী বিধান চন্দ্র সেন জানান, ডালের বড়া তৈরি এবং বিক্রির ব্যবসা করে শীতকালে আমাদের ঘরে মোটামুটি একটা আয় আসে। বাজারে ডালের বড়ার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আশপাশের অনেক এলাকা থেকে বহু মানুষ আমাদের বাজার থেকে এসব বড়া কিনে নিয়ে যায়।

রুপেন চন্দ্র সেন বলেন, বাজারে আমাদের বড়ার যে চাহিদা রয়েছে তা অন্য সময়ের চেয়ে এখন অনেক গুনে বেশি। তাই এই সময়ে স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু পায়ে ঢেকিঁ পার দিয়ে তা মেটানো সম্ভব হয় না। আরেক ব্যবসায়ী সুভাষ চন্দ্র সেন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ কেজি বড়া তৈরি করি। তা স্থানীয় বাজার ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হয়। তবে, মষ কলাইয়ের দাম আগের থেকে অনেক বেড়ে যাওয়ায় খুব একটা লাভ হয় না। মল্লিকা নামের আরেক নারী বলেন, প্রতিদিন গভীর রাতে উঠে ঢেকিঁতে কলাই গুড়ো করতে হয়। এতে পরিশ্রম বেশি হয়। তাঁর দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যেমে কলাই গুড়ো ও মিশ্রণের যন্ত্র দিয়ে সরকারি সহায়তা করলে শৈল্পিক এ পেশা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আশরাফুজ্জান সরকার জানান, বড়ার অন্যতম উপাদান হলো মাশকলাই। আর মাশকলাইয়ে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন। সবজি জাতীয় খাবারের পাশাপাশি শিশুদের ডালের বড়া খাওয়ালে শিশুর দেহ গঠনে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

আপনার মতামত লিখুনঃ