সাঁওতাল হত্যা দিবস আজ

সাঁওতাল হত্যা দিবস আজ

এনামুল হক-গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
সাঁওতাল হত্যা দিবস আজ। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামারের বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল। সেসময় পুলিশের গুলিতে আহত হন কমপক্ষে ৩০জন আদিবাসী সাঁওতাল। এরপর থেকে দিনটিকে সাঁওতাল হত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে আদিবাসী সাঁওতালরা। ঘটনার তিন বছর পূর্ণ হলেও হত্যার বিচার হয়নি আজো। সরকারের পক্ষ থেকে নিহত পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরবাসন সহ বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি।

নিহত শ্যামল হেমব্রমের বড় ছেলে সাগর হেমব্রম (১৩) বলে, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরে পুলিশের গুলিতে আমার বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা সোনামনি কিসকু বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সর্বস্ব হারিয়ে যাওয়ায় আমার লেখা-পড়া বন্ধ হয়ে যায়। জীবন-জীবিকা নির্বাহে ঢাকায় একটি সিমেন্ট কারখানায় শ্রমিকের কাজ করি। আমার উপার্জিত অর্থে পরিবারসহ ছোট ভাইয়ের লেখা-পড়া চলে।

নিহত মঙ্গল মার্ডি পারিবারিক জীবনে নিঃসন্তান। নিহতের সহধর্মিনী শান্তিনা টুডু (৭০) বলেন, আমাদের সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি প্রথা না থাকায়, অন্যের সাহায্যে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে মাঝে মধ্যে বনে-জঙ্গলে গিয়ে জংলি আলুসহ বিভিন্ন খাদ্য সংগ্রহ করে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি।

নিহত রমেশ টুডুর পরিবারের খোঁজ নিতে সাঁওতাল পল্লিতে গিয়ে জানা যায়, রমেশ টুডুর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর, মেয়ে জোসনা টুডুকে নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন। ৬ নভেম্বরে রমেশ টুডুর মৃত্যুর পর জীবন বাঁচানোর দাগিদে ঢাকায় একটি গার্মেন্টস কোম্পানীতে চাকরী করে।

আহত বিমল কিসকু (৩৬) বলেন, ৬ নভেম্বরের ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানেই পুলিশ আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে হাতকড়া লাগিয়ে রাখে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৯ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকি। আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিলে টাকার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। এখন আমার দু-পা পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছি। ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে বিপাকে রয়েছি। পরিবারের উপার্জনকারী না থাকায় আমার স্ত্রী অন্যের জমিতে দিন মজুরির কাজ করে। তার আয়-উপার্জন দিয়েই সংসার চলছে। বিমল কিসকুর মতই আহত অনেকের জীবন এভাবেই চলছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৫৪-৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর চিনিকল লিঃ। চিনিকলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন সময়ে আখ সরবরাহের উদ্দেশে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নে ৫টি মৌজার সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামারের জন্য পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পূর্ব পাকিস্তান) সরকার স্থানীয় জমির মালিকদের মতামত উপেক্ষা করে শর্ত সাপেক্ষে ১৮৩২.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে আখ চাষ শুরু করে।

শর্তে উল্লেখ ছিল শুধু আখ চাষের জন্যই এ জমি অধিগ্রহণ করা হলো। সর্বস্ব হারিয়ে জীবন বাঁচার তাগিদে আদিবাসী সাঁওতালরা বিভিন্নস্থানে আশ্রয় নেয়। প্রতিষ্ঠিত চিনিকলটি প্রায় ৫০ বছর পর শর্ত ভঙ্গ হওয়ার খবর পেয়ে জমির মূল মালিকের ওয়ারিশগণরা বাপ-দাদার ভিটে মাটিতে ফিরতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে আদিবাসী সাঁওতালরা প্রায় আড়াই হাজার পরিবার তাদের বাপ-দাদার জমিতে ঘর-বাড়ী নির্মাণ সহ তারা খামারের প্রায় বেশির ভাগ জমিই দখলে নিয়ে চাষাবাদ শুরু করে ।

বাপ-দাদার হারানো সম্পত্তি স্থায়ীভাবে ফেরত পাওয়ার লক্ষে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকজন সরেজমিনে তদন্তপূর্বক বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের সহযোগীতা নিয়ে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর দখলদার উচ্ছেদের নামে ব্যাপক ধ্বংস লীলা চালায়। এতে সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগসহ নিরীহ আদিবাসীদের উপর গুলিবর্ষণও করা হয়। ওইদিনের নারকীয় ঘটনায় ৩ জন আদিবাসী সাঁওতাল নিহতসহ অর্ধশত সাঁওতাল আহত হন। সেই সাথে লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ওই সময় সারাদেশে এ ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সাঁওতালরা সে সময় সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেও জমি রক্ষার আন্দোলন থেকে পিছপা হয়নি।

এদিকে, খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার আদিবাসী সাঁওতালরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। গৃহহীন হয়ে তারা অসহায় দিনাতিপাত করছে। ৬ নভেম্বরের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাসের বাণী শোনালেও তার কোনটিই আজো বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে সাঁওতালরা অতি বিদ্রোহী হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষক মহল।

গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি

আপনার মতামত লিখুনঃ