শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র ইস্যুতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিপুল টাকা আয়

শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র ইস্যুতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিপুল টাকা আয়
শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র ইস্যুতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিপুল টাকা আয়

শিক্ষাঃ শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র ইস্যুতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর বিপুল টাকা আয়। দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলো কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।

তবুও ওসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র ইস্যুর নামে কোটি কোটি টাকা আয় করছে।

বোর্ডগুলো শিক্ষার্থীপ্রতি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করছে। আর সেক্ষেত্রে স্বাক্ষর না লাগলেও সই করার নামে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সম্মানী নিচ্ছে।

বিগত ২০১৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের ভর্তি অনলাইনে সম্পন্ন হতে শুরু হয়। এরপর ওই স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে টিসি নেওয়ার প্রবণতা দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্যানুসারে গত কয়েক বছরে ৮টি শিক্ষা বোর্ডে ১৫৪ কোটি টাকার সম্মানী বোর্ড কর্মকর্তারা অতিরিক্ত গ্রহণ করেছে। যা তাদের প্রাপ্য ছিল না।

মূলত পছন্দসই কলেজে ভর্তিতে সুযোগ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় কলেজ পাল্টায়। আর এ সুযোগে শিক্ষা বোর্ডগুলোও তাদের টিসি ফি বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাছাড়া মা-বাবার বদলিজনিত ও বাসা বদলানোর কারণেও বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে টিসি নিতে হয়। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০১৫ সালের আগে ঢাকা বোর্ডে টিসি নেয়ার সংখ্যা ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার। কিন্তু ২০১৫ সালের পর প্রতি শিক্ষাবর্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার টিসি ইস্যু হচ্ছে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোকে উচ্চমাধ্যমিকশ্রেণিতে শুধু প্রথম বর্ষেই দু’বার টিসি ইস্যু করতে হচ্ছে। গত অক্টোবরে প্রথম দফা টিসি দেয়ার কাজ শেষ হয়।

জানুয়ারি মাসে আরেকবার টিসি ইস্যু করা হবে। আগে শুধু জানুয়ারিতেই টিসি ইস্যু করা হতো। মূলত পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এক ধরনের তাড়না কাজ করে। যা টিসির সংখ্যা বাড়ার অন্যতম একটি কারণ।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন বোর্ডে টিসি দেয়ার সময়কাল ভিন্ন ভিন্ন হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। উচ্চমাধ্যমিকশ্রেণির ক্ষেত্রে গত ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে টিসি দেয়ার সময় শেষ হয়।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ আরো তিন দিন বাড়িয়ে তা ১৯ অক্টোবর নির্ধারণ করে। আর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের টিসি দেয়ার শেষ তারিখ ছিল ৩১ অক্টোবর।

বোর্ডগুলোর টিসি দেয়ার ভিন্ন ভিন্ন সময়ের কারণে এবার ঢাকা থেকে টিসি নিয়ে চট্টগ্রাম বোর্ডের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারলেও

চট্টগ্রাম বোর্ডের টিসি দেয়ার তারিখ আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই বোর্ডের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বোর্ডের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আসতে পারছে না।

ফলে যেসব শিক্ষার্থীদেও মা-বাবা সরকারি বা বদলিজনিত চাকরি করেন, তাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যারেও ভিন্নতা রয়েছে।

একই নিয়মে সব বোর্ডের সাইটে ঢোকা যায় না। একেক বোর্ডের ওয়েবসাইটে একেক কর্নার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থাকে।

কমন কোনো ফরমেশন সেখানে নেই। তাছাড়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে টিসির সব কাজ ডিজিটালি সম্পন্ন হলেও বাকি সব বোর্ডে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই করা হচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে টিসি ফি ৭০০ টাকা। কুমিল্লা বোর্ডেও ৭০০ টাকা। নতুন প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ওই ফি ৮০০ টাকা।

যশোর ও রাজশাহী বোর্ডে এক হাজার, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এক হাজার ২০০ টাকা, সিলেট বোর্ডে এক হাজার ৫০০ এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ওই ফি সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার টাকা।

টিসি ফি’র সঙ্গে সংশ্নিষ্ট শিক্ষার্থীকে আবার টিসির জন্য ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়। সেখানে আরো ৫৮ টাকা ব্যাংক চার্জ দিতে হয়। আবার একই বোর্ডে দুই ধরনের টিসি ফি রয়েছে।

চট্টগ্রাম বোর্ডে ইন্টারনাল টিসি ফি (একই বোর্ডের আওতাধীন অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে চাইলে) এক হাজার টাকা নেয়া হলেও বোর্ড ট্রান্সফার বা বিটিসি (অন্য বোর্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে) ফি এক হাজার ২০০ টাকা।

এদিকে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন দুর্ভাগ্যবশত কোনো শিক্ষার্থীর প্রবেশপত্র হারিয়ে গেলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।

ফের প্রবেশপত্র ইস্যু করতে বোর্ডে যেতে হয়। বোর্ড থেকে ডুপ্লিকেট প্রবেশপত্র ইস্যু করানোর আগে আরো কয়েক রকমের ঝক্কি রয়েছে।

নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা, গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ নানা জটিলতা পেরিয়ে তারপর পেতে হয় ডুপ্লিকেট প্রবেশপত্র।

তবে অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের মতে, একবার প্রবেশপত্র ইস্যু করা হলে ছবি মিলিয়ে দ্রুতই সংশ্নিষ্ট পরীক্ষার্থীর নামে ডুপ্লিকেট প্রবেশপত্র ইস্যু করা যায়।

বড়জোর সংশ্নিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রত্যয়ন চাওয়া যেতে পারে। যদিও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে ডুপ্লিকেট প্রবেশপত্র ইস্যুর কাজ সহজ করেছে।

ওই পদ্ধতিতে বোর্ডের মূল তথ্য সার্ভারের পাসওয়ার্ড সংশ্নিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্রকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে।

প্রবেশপত্র হারালে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্র থেকেই মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে প্রবেশপত্রের একটি প্রিন্ট আউট কপি সহজেই বের করে নিতে পারছে পরীক্ষার্থী।

অন্যদিকে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরে ৬টি বোনাস পেয়ে থাকে। তার বাইরে কর্মকর্তারা ইচ্ছেমতো বিভিন্ন মিটিংয়ে সিটিং অ্যালাউন্স তুলে নিচ্ছে।

উত্তোলন করছে পরিদর্শন ভাতা, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নামে ভাতা, রয়েছে ওভার টাইমও।

বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে, বোর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল দায়িত্ব কোনটি তা নির্ধারণই এখন দুরূহ হয়ে গেছে। পরীক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্র স্বাক্ষরের জন্য বোর্ডের সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা সম্মানী নেন।

আগে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফরমে সই করার জন্য ৫০ পয়সা বা ২০ পয়সা (বোর্ডভেদে ভিন্ন ভিন্ন) করে সম্মানী নিতেন বিদ্যালয় পরিদর্শক।

উচ্চমাধ্যমিকপরীক্ষার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন কার্ডে সইয়ের জন্য সম্মানী নেন কলেজ পরিদর্শক। আর প্রবেশপত্রে সইয়ের জন্য সম্মানী নেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।

বর্তমানে সফটওয়্যার অটোমেশনের মাধ্যমে ওসব কাজ ডিজিটালি সম্পন্ন হওয়ায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং স্কুল ও কলেজ পরিদর্শকদের নিজ হাতে স্বাক্ষর করা লাগে না।

অথচ তারা ওই কাজের জন্য একই হারে সম্মানী নিয়ে চলেছে।

টিসি প্রদানের সময়কাল প্রসঙ্গে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুস সালাম জানান, সব বোর্ডে একসঙ্গে টিসি দেয়া শুরু ও শেষ করা গেলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য তা ভালো হতো।

তবে ভিন্নমত পোষণ করে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মকবুল হোসেন জানান, মাইগ্রেশনের জন্য শিক্ষার্থীদের লম্বা সময় দেয়া হয়।

তাই বোর্ডগুলোর টিসি ইস্যুর সময়ের ভিন্নতা থাকলেও শিক্ষার্থীরা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল কবির জানান,

বিটিসি বা বোর্ড ট্রান্সফারের আবেদন সারাবছরই বিবেচনা করা হয়। কেবল ওই বোর্ডের ভেতরে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য টিসি নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়।

আর বোর্ডগুলোতে টিসি ফি ভিন্নতা প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল কবিরের মতে, টিসি ফির ভিন্নতা থাকলেও তাতে কোনো সমস্যা নেই।

সব শিক্ষা বোর্ডের আর্থিক সঙ্গতি এক রকমের নয়। নতুন বোর্ডগুলোয় আয় কম।

তাই তাদের বিভিন্ন ফির হার একটু বেশি। পরীক্ষার ফি ছাড়া বাকি সব ফি বোর্ডভেদে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের।

আর টিসি ফি গ্রহণে সর্বশীর্ষে থাকা বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুসের মতে, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্য সব বোর্ডের চেয়ে কম। আয়ও কম।

সব খরচ বোর্ডের আয় থেকেই নির্বাহ করা হয়ে থাকে। বোর্ডের অর্থ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারেই সব ফি নির্ধারণ করা হয়। তা চেয়ারম্যানের একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আর বরিশাল বোর্ডের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ।