লাল-সবুজ রঙ করেই ৫ কোটি টাকা হরিলুট!

লাল-সবুজ রঙ করেই ৫ কোটি টাকা হরিলুট!

পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি :
লাল সবুজ রঙ আর ছোট কিছু প্লাষ্টার করেই ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা হরিলুট করা হয়েছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ১৭৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। আর এসব অভিযোগে সম্প্রতি বদলী হওয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিক উজ জামান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে।

তারা যোগসাজস করে কাজের নামে ৫ কোটি টাকা হরিলুট করেন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের হলে একটিরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং অভিযোগ গুলো তদন্ত করেছেন দুনীর্তির সাথে জড়িত কর্মকর্তারাই। সম্প্রতি বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়লে গোটা উপজেলা জুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে ১৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয় পাঁচ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সংস্কার কাজের জন্য তিন কোটি ৪৬ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয় চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)। গত অর্থবছরের ১৮ জুন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ৩০ জুনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়।

কিন্তু মাত্র ১২ দিনের মধ্যে স্টিমেট তৈরী ও কাজ সম্পন্ন করা যেহেতু সম্ভব না, তাই টাকা ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে রাতা-রাতি ম্যানেজ করে প্রতিটি বিদ্যালয়ের বিপরীতে স্টিমেট তৈরি করে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ওই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়। পরে ওই টাকা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার একাউন্টে জমা রাখা হয়।

এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে স্লিপ ফান্ডে এক কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার, প্রাক প্রাথমিকে ১৭ লাখ ৮০ হাজার, রুটিন মেরামতের জন্য ৪১ লাখ ৬০ হাজার ও ওয়াশ ব্লকের জন্য তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দ উপজেলার ১৭৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়।

যা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতিকে ম্যানেজ করে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিক উজ জামান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম কাজের নামে ভূয়া বিল ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করে আতœসাত করেন। আর পুরো দুর্ণীতির বিষয়টি সমন্বয় করেন উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান মন্ডলসহ বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। এসব কারণে দ্রুত বদলী নিয়ে পার্শ্ববতী পীরগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেন তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার রফিক উজ জামান।

সরেজমিনে বেশ কিছু বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে তেমন কোন কাজ নেই। শুধু বরাদ্দের টাকা হরিলুট করতে সড়কের পাশের কিছু বিদ্যালয়ে দেয়ালে লাল-সবুজ রঙে আলপনা, একটি করে ষ্টীলের সাইন বোর্ড এবং সামান্য টাকিটুকি প্লাষ্টার করে কাজ সমাপ্ত করা হয়। প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাস সজ্জিতকরণের বরাদ্দ থাকলেও তা করা হয়নি।

বরাদ্দের টাকা দিয়ে দৃশ্যত কোন কাজই করা হয়নি
কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুল মাজেদ বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বিদ্যালয়টির উন্নয়নে সংস্কার কাজের জন্য দুই লাখ টাকা, ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য ৪০ হাজার টাকা, স্লিপ ফান্ডের ৭০ হাজার টাকা, প্রাক-প্রাথমিকের ১০ হাজার টাকা, ওয়াশ ব্লকের জন্য ২০ হাজার টাকা কাজ না করেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা প্রধান শিক্ষকের যোগসাজসে আত্মসাৎ করা হয়।

গত ৩ মাসে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ করা হলেও কোন কাজ হয়নি। বরং দুনীতির সাথে জড়িতরাই অভিযোগ গুলো তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে ধামাচাপা পড়ে যেতে বসেছে গোটা বিষয়টি।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সদ্য বিদায়ী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিক-উজ-জামান বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করা সম্ভব না হওয়ায় টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকগণ কাজ করার বিল-ভাউচার জমা দিয়ে টাকা নিয়েছেন।’

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাহজাহান সিদ্দিকের মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন কাজ হয়নি। রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘ওই শিক্ষা কর্মকর্তার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’