রোজায় লাইফস্টাইল পরিবর্তন করুন

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ :

আজ থেকে শুরু হচ্ছে রোজা। এই পুরো মাসে আমরা সংযমের যে দীক্ষা নিয়ে থাকি, তা সারা বছর মেনে চললে আমাদের শারীরিক, মানসিক বা আধ্যাত্মিক সব সমস্যা দূর হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা রোজার মাস শেষ হলেই সংযমের কথা ভুলে যাই, অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন শুরু করি। তখন আবার শুরু হয় যাবতীয় শারীরিক, মানসিক বা আধ্যাত্মিক সমস্যা।

রোজার মাসে লাইফস্টালে পরিবর্তন আনা অতি জরুরি। দিন দীর্ঘ ও গরমের কারণে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়। পানিশূন্যতা আপনার শরীরে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ইফতার ও সেহরির মাঝে পর্যাপ্ত পানি পান করা দরকার। মনে রাখবেন, পানির বিকল্প হিমশীতল ফান্টা, সেভেনআপ, কোকাকোলা বা অত্যাধিক চিনিসমৃদ্ধ সিরাপ নয়।

এসব কোল্ডড্রিংক আপনার শরীরের উপকারের চেয়ে অপকারই করবে বেশি। ইফতারে লেবু বা দইয়ের শরবত আপনাকে তৃপ্তিও দেবে, শরীরের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করবে। বাজার থেকে কেনা চিনিসমৃদ্ধ ফলের রসের চেয়ে ঘরে তৈরি ফলের রস অনেক ভালো। চা ও কফিতে রয়েছে ক্যাফেইন, যা সাধারণত ডাইইউরেটিক হিসেবে কাজ করে। ডাইইউরেটিকের কাজ হলো শরীর থেকে পানি বের করে দেওয়া। সুতরাং ইফতার ও সেহরির মাঝে বেশি চা বা কফি পান থেকে বিরত থাকুন।

রোজার মাসে মানুষ ইফতার ও সেহরিতে ভাজা-পোড়া, তৈলাক্ত খাবার বেশি পছন্দ করে। এসব খাবার খেতে সুস্বাদু হলেও স্বাস্থ্যসম্মত নয় বলে বেশি করে ফলমূল, চিড়া, নারিকেল, দুধ, ঘরে তৈরি ছানা খাওয়া উচিত। রাতের খাবার বা সেহরিতে শাকসবজি ও অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই রাখবেন।

মনে রাখা দরকার, খাবার হতে হবে সুষম ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। রাস্তায় ইফতারি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। রাস্তায় ইফতারি তৈরি হয় মূলত আটা, ময়দা, বেসন, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি ও তেল দিয়ে। দিনের পর দিন একই তেল ব্যবহার করা হয় বলে তা পুড়ে গিয়ে ট্রান্সফ্যাটে রুপান্তরিত হয় এবং এই ট্রান্সফ্যাট স্ট্রোক ও হূদরোগ সৃষ্টি করে।

অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড় পরে ময়লা ও জীবাণুযুক্ত হাতে রাস্তার খাবার তৈরি করা হয় বলে এসব খাবার দিয়ে ইফতার করা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার খাবার তৈরিতে প্রায়শ ব্যবহার করা হয় দূষিত পানি। খাওয়ার পানিও বিশুদ্ধ খাকে না। বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয় না বলে পানিতে ই. কোলাই ও প্রোটিয়াস বেসিলাসজাতীয় জীবাণু থাকে।

যেসব থালা বাসন, পাত্র বা কাগজের ঠোঙায় ইফতার পরিবেশিত হয়, সেগুলোতে প্রায়শ ক্ষতিকর জীবাণু থাকে। এসব জীবাণুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অ্যাপেডারমিডিস ও সালমোনেলা প্রজাতির জীবাণু। রাস্তায় তৈরি বিভিন্ন ফলের রসে থাকে অসংখ্য জীবাণু। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে বার বার ধোয়া হয় বলে যেসব যন্ত্রপাতি বা আনুসঙ্গিক ব্যবহার্য দিয়ে ফলের রস তৈরি করা হয় এবং যেসব গ্লাস বা পাত্রে তা পরিবেশিত হয়, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ময়লা ও জীবাণুতে ভর্তি থাকে।

জাঙ্কফুড হলো স্বল্প পুষ্টিসম্পন্ন অস্বাস্থ্যকর খাবার। অন্যান্য দরকারি খাবারের মতো এসব খাবারে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং আঁশ জাতীয় খাবারের পরিমাণ কম থাকে। তাই রোজার মাসে জাঙ্কফুড যত কম খাওয়া যায় তত ভালো।

কতগুলো রোগ-ব্যধি নিয়ে রোজা পালন করলে স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এসব জটিল রোগ নিয়ে রোজা পালন না করাই শ্রেয়। প্রসঙ্গক্রমে এখানে দু’একটি রোগের ওপর রোজার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১৯৯৪ সনে মরোক্কোর কাসাব্লাংকা সম্মেলনে ডায়াবেটিস রোগীদের ওপর রোজার প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিকগণ তাদের গবেষণালদ্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেন। ইন্সুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস রোগীদের রোজাপালন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়। এ জন্য ইন্সুলিন নির্ভর রোগীদের রোজা না রাখার পক্ষে বিশেষজ্ঞগণ মতামত প্রকাশ করেন।

ডায়াবেটিস নিয়েও যারা রোজা পালন করতে চায়, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অন্যতম হলো, দিনের বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার রোগীর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নির্ণয়, যাতে দিনে অভুক্ত অবস্থায় ইন্সুলিনের কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার অতি কম পরিমাণ এবং রাতে অতিভোজনে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার অত্যাধিক গ্লুকোজের উপস্থিতি রোগীর ক্ষতির কারণ হতে না পারে।

ডায়াবেটিস রোগী রোজা পালনে আগ্রহী হলে তার ইন্সুলিনের ডোজ ও প্রদানের সময়ে পরিবর্তন আনতে হবে এবং তা করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক।

অস্থিতিশীল ডায়াবেটিস, সংক্রামক রোগ, কোন কোন হৃদরোগ এবং হাইপোগ্লাইসেমিক শকের ক্ষেত্রে রোজা রোগীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব ডায়াবেটিসের রোগীকে ইন্সুলিন গ্রহণ করতে হয় না, মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং খাবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব এবং যাদের ডায়াবেটিস স্থিতিশীল থাকে, তাদের রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

অ্যাজ্মা বা হাঁপানির আক্রমণ অস্বস্তিকর ও কষ্টদায়ক। হাঁপানি রোগের সুষ্ঠু ও পূর্ণ প্রতিকার এখনো আবিষ্কৃত হয়নি বলে এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রোগীকে ওষুধ গ্রহণ ছাড়াও বিভিন্ন সতর্ককতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। হাঁপানির আক্রমণ হলে সাথে সাথে ওষুধের মাধ্যমে আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পেতে হয়।

হাঁপানির আক্রমণে ক্রমাগত ওষুধ এড়িয়ে গেলে পরবর্তীকালে রোগের আরো অবনতি ঘটতে পারে। রোজার মাসে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ জটিল ও কষ্টকর।

চিকিত্সকগণ হাঁপানির রোগীদের শেষরাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর মাত্রায় থিওফাইলিন প্রদান করতে পারেন। রোগীর হাাঁপানির তীব্রতা অনুসারে রোগীকে স্টেরয়েডসহ সালিবউটামলজাতীয় ব্রংকোডাইলেটর ইনেহলার প্রদান করতে পারেন।

রোজা পালনকালে ইনেহলার গ্রহণ ধর্মীয় আইন বিরুদ্ধ নয়। কারণ ইনেহলার থেকে গৃহীত ওষুধ ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং এই ওষুধ শরীরে শক্তি উৎপাদন করে না।

যারা হৃদরোগে ভোগেন তাদের নিয়মিত এবং সময়মতো অনেকগুলো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। হূদরোগ নিয়ে যারা রোজা পালন করতে চান, তাদের অবশ্যই রোজা শুরু করার আগে নিজ নিজ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে।

রোজা পালনকালে অনেকেরই হয়তো গ্লিসারাইল ট্রাইনাইট্রেট সেপ্র নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। রোজা নষ্ট হওয়ার ভয়ে এই সেপ্র না নিলে জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, রমজান মাসে পেটে অ্যাসিড ও পেপসিন নিঃসরণ বেড়ে যায়। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমজান মাসে গ্যাস্ট্রো-ডিউওডিন্যাল আলসারের জটিলতা বিশেষ করে রক্তক্ষরণ ও পারফোরেশন বৃদ্ধি পায়।

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ, যাঁরা আলসারের রোগীদের ওপর রোজার প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন, তাঁরা মনে করেন, গ্যাস্টো-ডিইওডিন্যাল আলসারের কারণে রক্তক্ষরণ বা পারফোরেশন হয়ে গেলে এই অবস্থায় রোজা রাখা হলে রোগীর আরোগ্য লাভ ব্যাহত হতে পারে।

রমজান মাসে সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় ও মাত্রায় পরিবর্তন আনা আবশ্যক হয়। রোজা পালন কালে ৬ বা ৮ ঘণ্টা অন্তর অন্তর অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ সম্ভব নয়। এখন ১২ ঘণ্টা অন্তর অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে রোজা নষ্ট না করেই সেহরি এবং ইফতারেরর সময় রোগী চিকিত্সক কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করতে পারেন। কোনো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বেলায় রোজা পালন ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হলে রোজা কাজা করতে হবে।

মুসলিম বিশ্বের বহু নারী অবগত নয় যে, রমজান মাসে গর্ভবতী নারী এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়েদের জন্য রোজা পালন বাধ্যতামূলক নয়। যেসব মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান, তারা রোজা রাখলে বুকের দুধের পরিমাণ কমে যায় বলে শিশু পর্যাপ্ত দুধ পায় না।

অন্যদিকে গর্ভবতী মহিলা রোজা রাখলে কষ্ট হওয়া ছাড়াও গর্ভজাত সন্তানের পুষ্টিপ্রাপ্তি, শারীরিক গঠন ও বয়োবৃদ্ধিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে গর্ভবতী মহিলা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুর মায়েদের রোজার মাসে রোজা না রাখার পরামর্শ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন ধর্মীয় আলেম, চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞগণ।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রমজান মাসে মানসিক ও মৃগীরোগের অবনতি ঘটে। সমীক্ষায় এবং অভিজ্ঞতার আলোকে অধিকাংশ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ রমজান মাসে মানসিক ও মৃগীরোগীসহ বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের রোজা না রাখার পরামর্শ প্রদানের পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। মৃগীরোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। ওষুধ গ্রহণে অসঙ্গতি বা অনিয়মের কারণে মানসিক ও মৃগীরোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে।

রোজার সময় পানিশূন্যতার পেছনে আবহাওয়ার একটি ভূমিকা রয়েছে। বয়স্ক লোক এবং যারা ডাইইউরেটিক (মুত্রবর্ধনকারী ওষুধ) গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার প্রকোপ বেশি হয়। সাধারণ পানিশূন্যতায় খুব বেশি সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত পানিশূন্যতার কারণে কিডনির সমস্যা হতে পারে। বেশি পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার জরুরি ভিত্তিতে পানিপূরণ দরকার হয়ে পড়ে।

বর্তমান তাপদাহ পুরো মাসে বজায় থাকলে প্রখর রোদে বেশি চলাফেরা ঠিক হবে না। পানিশূন্যতা রোধ করার জন্য ইফতার ও সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে প্রচুর পানি পান করুন।
আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন ও সুস্থভাবে রোজা পালনের তৌফিক দান করুন।

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুনঃ