রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি জালিয়ানওয়ালাবাগ

রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি জালিয়ানওয়ালাবাগ
রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি জালিয়ানওয়ালাবাগ

পবিত্র সরকার :

গত ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের শতবর্ষ গেল, পৃথিবীজুড়েই তার নানা ধরনের উদ্যাপন চলছে।

আর তারই প্রায় এক মাস পর রবীন্দ্রনাথের জন্মতারিখও বটে, তাই চৈত্রসংক্রান্তিতে জালিয়ানওয়ালাবাগের বৈশাখী মেলাতে নিহত ৩৭৯ জন (বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেড় থেকে দু’হাজার) আবালবৃদ্ধবনিতার নৃশংস হত্যাকা-ের কথা আমরা যখন আবার এবং বারবার স্মরণ করব, একই সঙ্গে স্মরণ করতেই হবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই মহামানবের ভূমিকাকে- রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী।

ব্যক্তিপূজার জন্য নয়; কিছুটা প্রশ্ন তুলে, প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে; যে উত্তর এখনও আমাদের পাওয়া হয়নি।
ঘটনাটা ঘটেছিল, সবাই জানি, ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধ কিছুদিন আগে শেষ হয়েছে, তার শ্বাসরোধকর নিয়ন্ত্রণমূলক আইন ‘ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ তখনও চালু।

কিন্তু পাঞ্জাব আর বাংলা অঞ্চলে সশস্ত্র বিপ্লবীদের কার্যকলাপ তখনও অব্যাহত। ফলে ভারতীয় জনগণের গলার ফাঁস আরও কড়া করার জন্য, তাদের আরও বেশি করে পায়ের তলায় রাখার জন্য বিলেতের বিচারক রাউলাটকে এনে আরেকটি আইন করা হল, যার নাম ‘রাউলাট্ অ্যাক্ট’, আসল নাম ‘অ্যানার্কিক্যাল অ্যান্ড রেভ্যুলিউশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট’। ফলে যা দাঁড়াল, তা জনৈক পাঠান যুবকের কথায়, ‘ন ভকিল, ন অপিল, ন আদালত’।

তোমাকে ব্রিটিশরাজ যখন খুশি তুলে নিয়ে যাবে, জেলে আটক রাখবে, রাস্তায় বুকে হাঁটাবে, পেটাবে, বেয়োনেট দিয়ে বিদ্ধ করবে, আর সামনে বা পেছন থেকে, কিংবা প্লেন থেকে গুলি করে মারবে। কারও কিচ্ছু বলার বা করার থাকবে না।

অমৃতসরের দুই জননেতা- সইফুদ্দিন কিচলু আর ড. সত্যপালকে এই আইনেই তারা গ্রেফতার করল, আর তারই প্রতিবাদে আগে দুটি হরতালের সঙ্গে ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ পার্কে বৈশাখী মেলার আয়োজন। তাতে শুধু শিখেরা ছিল না। শিখ ছিল ৩০ শতাংশ, হিন্দু ৫৫ শতাংশ, আর মুসলমান ১৫ শতাংশ।

মাইকেল ডায়ারের মেশিনগান ধর্ম, বয়স, নারী, শিশু কাউকে রেয়াত করেনি। কেন? না, পাঞ্জাবের সহকারী লেফটেন্যান্ট গভর্নর আরভিন তার একটা কারণ বলেছিল- হিন্দু, মুসলমান, শিখেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে এক ঘটি থেকে জল খাচ্ছে, এ আমাদের সহ্য হয়নি। অন্য কারণ তো ছিলই।

তাই জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটল। অনেক পরে খবর পেলেন রবীন্দ্রনাথ, সম্ভবত ২২ মে পুরো ঘটনার নৃশংসতা বুঝতে পারলেন অ্যান্ড্রুজের কাছ থেকে। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির সঙ্গে অমৃতসর যেতে চাইলেন, কিন্তু গান্ধীজি রাজি হলেন না। কেন? না, তিনি সরকারকে ‘embarrass’ করতে বা অস্বস্তিতে ফেলতে চান না।

চিত্তরঞ্জনের কাছে গিয়ে প্রতিবাদ-সভা করার অনুরোধ করলেন রবীন্দ্রনাথ, চিত্তরঞ্জন উৎসাহ দেখালেন না। তাই ২৯ মে রাত জেগে সেই অবিস্মরণীয় চিঠি লিখলেন বড়লাট লর্ড চেম্সফোর্ডকে, নাইটহুড বা ‘স্যার’ উপাধি ত্যাগ করে, যে চিঠির অগ্নিময় ভাষা আজও আমাদের বিস্ময় জাগায়, প্রতিবাদের এক চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে যা নিয়ে চর্চা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। ওই চিঠি অত্যাচারিত মানুষের হয়ে সব প্রতিবাদকে চিরকালের জন্য এক প্রবল বৈধতা দেয়।

গান্ধীজি পরে শ্রীনিবাস শাস্ত্রীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের এই burning letter টিকে বলেছেন premature, অর্থাৎ আগেভাগে লিখে ফেলা, এবং তার পরে, যেন একটু অনুকম্পার সুরে বললেন, but he cannot be blamed. তাকে দোষ দেয়া যায় না। মানে যেন, ‘আহা, কবি তো, কবিরা এ রকম করেই থাকেন।’

কিন্তু মজার কথা হল, তিনি নিজে এর দু’মাস পর, ১ আগস্ট ১৯১৯ তারিখে তার দুটি পদক ব্রিটিশ সরকারকে ফিরিয়ে দিলেন। পদক দুটি কীসের? না, উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে তিনি যখন আফ্রিকাতে ছিলেন, তখন তিনি বুয়োর যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের অ্যাম্বুলেন্স জুগিয়ে সাহায্য করেছিলেন, তার জন্য পাওয়া একটা মেডেল, আর প্রথম মহাযুদ্ধে ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের সেনাসংগ্রহে সাহায্য করার জন্য।

দুটোই ‘রাজভক্তি’র নিদর্শন, গান্ধীজি যে রাজার ভক্ত ছিলেন ওই সময় এবং তাকে বিব্রত করার চেষ্টা না করে সাহায্যই করতে চেয়েছেন, তা ঐতিহাসিকেরা গোপন করেননি। দুটোই পেয়েছিলেন, রাখঢাক না করেই বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী হিসেবে। তিনি দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের স্বাধীনতার এক অগ্রগণ্য সেনাপতি, তা সত্ত্বেও তার জীবনের এই পর্যায়টিকে মুছে ফেলা যায় না।

এখন যে প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা তত হয়নি, অন্তত আমাদের তেমন চোখে পড়েনি, তার একটা হল, ৩০ মে রবীন্দ্রনাথের চিঠি premature বলে মনে হল গান্ধীজির, আর দু’মাস পরে মেডেল ফেরত দেয়ার সময় সেটা একেবারে মাহেন্দ্র-মুহূর্ত বলে মনে হল কী কারণে?

দু’মাসে এমন কী ঘটল যাতে রবীন্দ্রনাথের কাজ হঠকারিতা আর গান্ধীজির কাজ ‘যথাসাময়িক’ বলে মনে করা যায়? তার কোনো উত্তর গান্ধীজি দেননি, অন্যরাও খুঁজেছেন বলে আমরা জানি না। দু’নম্বর, রবীন্দ্রনাথের ‘স্যার’ পদবি বর্জন, আর গান্ধীজির মেডেল দুটি ফিরিয়ে দেয়ার ওজন কি এক হবে?

এ রকমই যেন মুড়ি-মিছরির মতো করে দেখা হয়েছে, গান্ধীজির জীবনের ষাট বছর বয়সে তৈরি এক বইয়ে, যেখানে খুব নিঃস্পৃহভাবে জানানো হয়েছে : ১ আগস্ট, ১৯১৯ (৫১ বছর) গান্ধীজি তার কাইজার-ই-হিন্দ্ আর বুয়োর যুদ্ধের পদক (প্রথমটা সোনার) প্রত্যর্পণ করেন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাইটহুড ফেরত দেন।

এই সংবাদে যেটা ছলনার দিক সেটা হল, মনে হয় রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির মেডেল ফেরত দেয়ার পর নাইটহুড ত্যাগ করার চিঠি লেখেন, যদিও তিনি চিঠিটি লিখেছিলেন দু’মাস আগে। এখানে যেন রবীন্দ্রনাথই গান্ধীজির সদ্দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছেন, এই রকম মনে হয়। এটা সচেতনভাবে করা কিনা জানি না।

কিন্তু আবার ফিরে আসি ওই প্রশ্নে। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৫ সালে নাইট পদবি পেয়েছিলেন তার কবিত্বের জন্য, রাজভক্তির কারণে নয়। সাম্রাজ্যের একজন কবি দু’বছর আগে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেছেন, কাজেই সাম্রাজ্যের দিক থেকে একটা কিছু না করলে খারাপ দেখায়, তাই ওই নাইটহুড। আর গান্ধীজির মেডেল দুটি এসেছিল সাম্রাজ্যকে সহায়তার পুরস্কার হিসেবে। দুয়ের মূল্য কি ইতিহাসের কাছে এক হবে?

এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। আবার এ কথাও সত্য যে, রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির নানা কাজ আর বিশ্বাসের প্রচুর সমালোচনা করেছেন, তা সত্ত্বেও তাদের সৌহার্দ অটুট ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে তা এক শুভ সংঘটন।

এই জালিয়ানওয়ালাবাগেই শুধু গান্ধীজি রবীন্দ্রনাথকে হতাশ করেছিলেন তা-ই নয়, দু’বছর পর অসহযোগ উপলক্ষে বিলেতি পণ্য বয়কট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে ইংরেজের গোলামখানা নাম দিয়ে ছাত্রদের তা বর্জন করার আন্দোলন (আন্দোলনের পর সবাই আবার সেই স্কুল-কলেজেই ফিরে যায়), পশ্চিমের বিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি অনাস্থা, চরকা কাটলেই দু’দিনে ‘স্বরাজ’ আসবে এই আশ্বাস, এবং ১৯৩ সালে বিহারে ভূমিকম্প হয়েছিল উঁচু জাতের হিন্দুদের হরিজনদের ওপর অত্যাচারের ‘পাপের’ ফলে- এসব কর্মকাণ্ড আর উচ্চারণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কোনো মিলই ছিল না। ফলে তিনি ব্যাকুলভাবে নানা প্রবন্ধে আর বক্তৃতায় এর তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ঐতিহাসিকেরা এ দুই ‘বন্ধু’র বন্ধুত্বের মহত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছেন, আমরা এই বন্ধুত্বকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তার আড়ালে কিছু প্রশ্নও চাপা পড়ে যায়। সেই প্রশ্নগুলোই, যদি আমাদের আগে কেউ তুলে থাকেনও, আরেকবার সামনে আনা দরকার। উত্তরগুলো, যত অপ্রিয়ই হোক, ইতিহাসের সত্য নির্ধারণের জন্যই হয়তো জানতে হবে।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

আপনার মতামত লিখুনঃ