যে সাহাবি ইসলামে প্রথম চিকিৎসক ছিলেন

যে সাহাবি ইসলামে প্রথম চিকিৎসক ছিলেন

সাহাবি আল-হারিস ইবনে কালদাহ (রা.)। অনেক ইতিহাসবিদ তাকে ‘তাবিবুল আরব’ বা ‘আরবের চিকিৎসক’ বলেন। তার পুরো নাম আবু ওয়ায়েল আল-হারিস ইবনে কালদাহ ইবনু আমর ইবনু আলাজ আস-সাক্বাফি।
সৌদি আরবের তায়েফে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ইয়েমেনে তৎকালীন চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। এছাড়াও ইরানের গুন্দেশাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রের তালিম নেন। জাহেলি যুগে জীবন-যৌবন কাটালেও সবশেষে ইসলামের পরশে ধন্য হন। জীবনসায়াহ্নে রাসুল (সা.), চার খলিফা ও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের সান্নিধ্য-সৌরভে দিন গুজরান করেন।

রোগের রকমফের নির্ণয় করে তিনি চিকিৎসার পথ বের করেছিলেন। ইরানের গুন্দেশাপুরে চিকিৎসাবিদ্যায় বিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি বাদ্য-যন্ত্র বাজানোর ক্ষেত্রেও পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

ইসলাম গ্রহণের আগে আল-হারিস ইবনে কালদাহ
ভিটে-বাড়ি তায়েফ হলেও ইয়েমেন ও ইরানে তার যাতায়াত ছিল নিয়মিত। চিকিৎসা ও বাদ্য-যন্ত্র চালানোর বিভিন্ন শিক্ষা নিতেই তিনি ছুটে যেতেন এই দুই দেশে। এতে করে তিনি তার সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যান। এমনকি তার চিকিৎসার ধরন দেখে অন্যরা অভিভূত হয়ে যেত। ইরানের লোকজন তার জ্ঞান-অভিজ্ঞান ও দক্ষতা-পারঙ্গমতার কথা সে কালেই স্বীকৃতি দেন। এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের আগেই আরব ব-দ্বীপে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানের থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন মানুষের চিকিৎসা করতেন। সে সূত্রে এক ধনাঢ্যশালীর চিকিৎসার বিনিময়ে অঢেল অর্থ-সম্পদ লাভ করেন। এরপর জন্মভূমিতে ফিরে চিকিৎসাচর্চা অব্যাহত রাখেন। ফলে তিনি এমন দক্ষতা ও পারদর্শীতার পরিচয় দেন, যার নজির খুব একটা পাওয়া যায় না। ফলে খুব অল্প সময়ে চারিদিকে তার পরিচয়-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি
মক্কায় ইসলামের আবির্ভাব ও তায়েফে আল-হারিসের উত্থান একই সময়ে হয়েছিল। তবে আল-হারিস কখন ইসলাম গ্রহণ করেন, এ সম্পর্কে ইতিহাস-উৎসে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রে তার অবদান ও দক্ষতার কারণে তিনি আলোচিত হন বেশ।

এক বর্ণনায় আছে, সাহাবি সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) মক্কায় খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন রাসুল (সা.) সাহাবি আল-হারিস (রা.)-কে তার শশ্রুষায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

কিসরার সঙ্গে তার কথোপকথন
পারস্যের রাজা কিসরার সঙ্গে আল-হারিস (রা.) এর দারুণ এক মৌন বাকযুদ্ধ রয়েছে। একবার কিসরা অসুস্থ হয়ে আল-হারিস (রা.)-কে তার দরবারে ডেকে পাঠান। আল-হারিস (রা.) যখন কিসরার দরবারে পৌঁছেন, তখন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে প্রবেশের পর কিসরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তুমি? তিনি বললেন, আমি আল-হারিস ইবনে কালদাহ আস-সাকাফি। কিসরা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পেশা কী? বললেন, চিকিৎসা। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আরবি? বললেন, হ্যাঁ আমি কৌলিন ও পুরোদুস্তর আরবি।

তখন কিসরা বললেন- মূর্খতা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি ও নিম্ন মানের খাবার খেয়ে আরবরা আবার চিকিৎসাক্ষেত্রে কী করবে? আল-হারিস (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠলেন, মহামান্য বাদশাহ! আরবদের যদি এতোই দুর্বলতা থাকে, তাহলে দরকার ছিলো এমন একজনের যে মূর্খতা দূর করবে, বক্রতা শুধরাবে, শরীর সোজা করবে ও মগজ-মস্তিষ্ক সুস্থির করবে। কেননা জ্ঞানী ব্যক্তি এগুলো নিজের পক্ষ থেকেই বুঝতে পারে।

তার এ বক্তব্য শোনে কিসরা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আরবদের কোন চরিত্রে প্রশংসা করতে চাচ্ছো? তাদের কোন মতাদর্শ ও গুণ তোমাকে অবাক করেছে? বললেন- মহামান্য বাদশাহ! তাদের উদার-প্রশস্ত হৃদয়, উন্নত মানের বংশ-মর্যাদা, বিশুদ্ধ ভাষা ও উৎকৃষ্ট বাচনভঙ্গি রয়েছে। ধনুক থেকে তীর যেভাবে বের হয়, তাদের মুখ থেকে বাক্যবাণও সেভাবে নিঃসৃত হয়। তাদের ভাষা বসন্তের নির্মল বায়ুর চেয়েও স্বচ্ছ-স্বাদু। জলপ্রপাতের ¯্রােতধারার চেয়েও নরোম-কোমল।

কিসরা ও তার মাঝে আরো বহুক্ষণ আলাপ-আলোচনা হয়। কথার জাদুতে তিনি কিসরাকে বিমুগ্ধ ও অভিভূত করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত কিসরা তার কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

আল-হারিস (রা.)-এর মৃত্যু
আল-হারিস (রা.) এর মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিন-তারিখের ক্ষেত্রে ইতিহাসবেত্তাদের মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) এর যেদিন মৃত্যু হয়, সেদিনই তিনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। জনৈক ইহুদি নারী তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) এর যুগে মৃত্যু বরণ করেন। তারা দলিল দেন, হজরত মুআবিয়া (রা.) তাকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু প্রথম পক্ষ বলেন, হজরত মুআবিয়া (রা.) তাকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) এর যুগে প্রশ্নগুলো করেছিলেন।

আপনার মতামত লিখুনঃ