যে কারণে নারী নির্যাতন থামছে না

মাহমুদা আক্তার : স্বীকার করতেই হবে, নারীর অগ্রগতি শনৈঃ শনৈঃ বাড়ছে। বর্তমানে নারী শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। নারীর ক্ষমতায়নে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম।
সবকিছুই ঠিক আছে, তবু বাঁশিটি ঠিক সুরে বাজছে না। তার প্রমাণ প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই পাওয়া যায়। একটি, দুটি নয়- প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের খবর থাকছেই পত্রিকাতে। এই তো সোমবার টাঙ্গাইলে কী লোমহর্ষক ঘটনাই না ঘটে গেল!

টাঙ্গাইলের সখীপুরে খেলার মাঠে বসে গল্প করছিলেন একজোড় তরুণ-তরুণী। তিনটা মোটরসাইকেলে পাঁচ যুবক এসে তাদের তুলে নিয়ে গেলেন কাছের একটা বনে।
তরুণটিকে আটকে রেখে তার সামনেই তরুণীকে ধর্ষণ করলেন তিনজন, সেই দৃশ্যের ভিডিওচিত্র তুললেন অন্য দু’জন। এ ঘটনা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণ কত সহজ ও সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
এরকম রক্ত হিমকরা ঘটনা মার্চে আরও ঘটেছে। নরসিংদীতে মা-মেয়ে ধর্ষণ ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ধর্ষণের খবর মার্চেই আমরা পত্রিকার পাতায় পড়েছি।
মানবাধিকার সংস্থা- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৮ দিনে ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তাদের মধ্য ১৫ জনই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকারও হয় এরাই বেশি। বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। কী ভয়ংকর উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, অথচ এ নিয়ে কারো কোনো হেলদোল আছে কি?

নেই। নেই, কারণ আমাদের দেখার চোখ বদল হয়নি। আজ থেকে একশ কুড়ি বছর আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সময়ে আমাদের চোখ, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র যে চোখে নারীকে দেখত, এখনও সেই চোখেই দেখে। ১৮৪২ সালে মাইকেল যখন হিন্দু কলেজের ছাত্র, বয়স আঠারো, তখন নারী শিক্ষা নিয়ে যে প্রবন্ধ লিখে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন- ‘ভারতীয় নারীরা যেন বস্তুসামগ্রী- তারা আসবাবপত্রের মতো। তারা শুধু ভোগের উপকরণ মাত্র’। বলাবাহুল্য, তখন বাংলাদেশ অবিভক্ত ভারতবর্ষেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তারপর সেই নারীসমাজ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের মতো মনীষী-বিদূষীদের হাত ধরে অন্ধকার ঘরের কোণ ছেড়ে মুক্তির পথ খুঁজেছে। কিন্তু যথার্থ মুক্তির পথ আজও মেলেনি।

না মেলার পেছনে মস্ত এক গলদ রয়ে গেছে- রাষ্ট্র্রব্যবস্থার সদিচ্ছার ভেতরেই। সেই গলদের নাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
সখিপুরের ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামি পুলিশকে বলেছেন, ‘ধর্ষণের শিকার মেয়েটি ধর্ষণকারীদের তিনজনের প্রতিবেশী। কিন্তু তরুণীটি অন্য এক গ্রামের ছেলের সঙ্গে ‘প্রেম করে’ বলে তাকে প্রেমিকসহ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
এমন একটি তুচ্ছ কারণে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটনের সাহস একজন মানুষ তখনই পায়, যখন রাষ্ট্রে বিচারহীনতার পরিবেশ বিদ্যমান থাকে।

সমস্যাটি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে এ কারণে যে, এই দেশে ধর্ষণের বিচার করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অত্যন্ত প্রকট।
আইন প্রয়োগকারীদের একটি অংশ ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি বিরূপ ধারণা প্রকাশ করেন, তারা নারীটির ব্যক্তিগত ‘চরিত্র’ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন। ফলে ধর্ষণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে- এটা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার জন্য যতটা আন্তরিক তাগিদের সঙ্গে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, বাস্তবে তা ঘটতে দেখা যায় না।

শুধু আইন প্রয়োগকারীদের মধ্যে নয়, অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ফলে অত্যন্ত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জরিপে যে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে সেই একই সময়ে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি; গড়ে প্রতিদিন ১১টি মামলা হচ্ছে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম।
গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১৫ বছরে (২০০২-১৬) আসা ধর্ষণসংক্রান্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে।
এই প্রায় বিচারহীনতার পরিবেশের অবসান জরুরি। পাশাপাশি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন দরকার। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন, সিনেমা, টেলিভিশনের ধারাবাহিক- সব ক্ষেত্রেই এখনও জারি রয়েছে পুরনো পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

এই একুশ শতকের চরম উতকর্ষতার যুগেও ‘বিউটি’ বা ‘ফেয়ারনেস’ ক্রিমের বিজ্ঞাপনে গায়ের রং ফরসা না হলে মেয়ের বিয়ে বারবার ভেঙে যাচ্ছে। এখনও বিজ্ঞাপনের মেয়েটি নজর কাড়ার জন্য ফর্সা হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এখনও বাসন মাজার সাবানের বিজ্ঞাপনে গৃহিণীদেরই উপস্থিতি।
দিনভর সংসারে কাজ করে বাড়ির বউ ক্লান্ত হয়ে ব্যথা উপশমকারী মলমের শরণাপন্ন হচ্ছেন। কখনও আবার বিশেষ মশলা ব্যবহার করে বাড়ির জন্য রান্না করে শ্বশুরের মন জিতে নিচ্ছেন বউমা। পুরুষরা বিশেষ ‘ডিওডোরেন্ট’ ব্যবহার করার ফলে নারীরা তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে যাচ্ছেন।
চিন্তা-ভাবনার এই একমাত্রিকতাই প্রমাণ করে যে, নারীরা এখনও ভোগের সামগ্রী মাত্র। অন্তত সেভাবেই তাকে তুলে ধরা হচ্ছে বিজ্ঞাপনে।

সুতরাং, উন্নয়নের অগ্রযাত্রার প্রদীপের আলোর নিচেই রয়েছে গভীর অন্ধকার। সেখানে নারীরা এখনও আলোর পথ খুঁজছেন। এখনও নারী মানে কারও কন্যা, কারও স্ত্রী, কারও মা। এর বাইরে নিজের পথ খুঁজতে হবে নারীদের নিজেদেরই। আর সেই পথকে কণ্টকমুক্ত করবে রাষ্ট্র। দায়িত্বটা রাষ্ট্রেরই।

মাহমুদা আক্তার কণা : প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

আপনার মতামত লিখুনঃ