ভারতের রাজনীতির তিনটি প্রশ্ন ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

ভারতের রাজনীতির তিনটি প্রশ্ন ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
ভারতের রাজনীতির তিনটি প্রশ্ন ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

 

 

নির্বাচনের পর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রাজনীতিতে এমন তিনটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। প্রথম প্রশ্ন : বিজয়ী ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি কি পারবে সর্বভারতীয় দল হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসকে ‘জিরো’ করে দিতে? দ্বিতীয় প্রশ্ন : ভারতের ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? তৃতীয় প্রশ্ন : একদা বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা কমিউনিস্ট ও বামরা কি ভারতের রাজনীতিতে আর কখনো দাঁড়াতে পারবে? বর্তমানে প্রথম প্রশ্নটা ঠিক উল্টো দিক থেকে আর অন্য দুটি প্রশ্ন প্রায় হুবহু আমাদের দেশেও রয়েছে।

প্রথম প্রশ্নটি আলোচনা করার জন্য শুরুতেই ভারতের রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান ও নেতৃত্বপ্রদানকারী দল কংগ্রেস সেক্যুলার দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রথম থেকেই এই দলের অভ্যন্তরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী একটি ধারা ছিল। এই ধারার ফলে ১৯১৫ সালে হিন্দু মহাসভা, ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) এবং স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা পায়।

স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার পর জাতীয় কংগ্রেস চেয়েছিল আরএসএসকে জিরো বানাতে। সংগঠনটিকে বারবার বেআইনি করা হয়। নতুন সংবিধানের ভিত্তিতে ১৯৫২ সালে ভারতে যে লোকসভা নির্বাচন হয়, তাতে নতুন নামে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল জনসংঘ পায় মাত্র ৩টি আসন। সেই হিসেবে প্রায় ‘জিরো’ থেকেই শুরু হয় স্বাধীন ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারার পথচলা।

তবে দলটি সুকৌশলে নানা ঘাতপ্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে ১৯৫৭ সালে ৪টি, ১৯৬২ সালে ১৪টি, ১৯৬৭ সালে ৩৫টি, ১৯৭১ সালে ২২টি এবং ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টিতে যোগদান করে ৯৪টি আসন লাভ করে এবং ক্ষমতার পার্টনার হয়। তিন বছর পর জনতা পার্টি বিলুপ্ত হলে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ২টি আসন পায়। অর্থাৎ প্রায় জিরো থেকেই আবার শুরু করে দলটি।

এরপর বাবরি মসজিদ ভাঙার ভেতর দিয়ে দলটি ১৯৮৯ সালে ৮৯টি আসন পেয়ে তৃতীয়, ১৯৯১ সালে ১২০টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১৬১টি, ১৯৯৮ সালে ১৮২টি, ১৯৯৯ সালে ১৮২টি আসন পেয়ে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে ক্ষমতাসীন থাকে। পরের দুই নির্বাচন ২০০৪ সালে ১৩৮টি এবং ২০০৯ সালে ১১৬টি পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। তারপর দলটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরপর দুবার ২০১৪ সালে ২৮২টি এবং সর্বশেষ এ বছর নির্বাচনে ৩০৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকছে।

দলটি এককভাবেই এবারে পেয়েছে ৩৪.৩ শতাংশ আসন। আর জাতীয় কংগ্রেস ২০১৪ সালে ৪৪টি থেকে এবারে ৫২টি আসন পেলেও ভোট তেমন বাড়াতে পারেনি। পেয়েছে মাত্র শতকরা ১৯.৫৬ ভাগ। তাই বিজেপিও বলছে এবং প্রশ্নও উঠেছে, জাতীয় কংগ্রেস কি ‘জিরো’ হয়ে যাবে?

দেশ ভেদে ঘটনার গতিধারায় পার্থক্য সত্ত্বেও একইভাবে স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের রাজনীতিতেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ধারা, যা মূলত দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেসব দল বেআইনি হওয়ার কারণে থাকে খবরে। কিন্তু জাতির পিতার হত্যার ভেতর দিয়ে পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তথা সেক্যুলার রাজনীতির ধারা ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর ওই ধারা আবারো ক্ষমতাসীন হয়। তখন কথা ওঠে, সেক্যুলার রাজনীতির প্রধান দল আওয়ামী লীগের অবস্থা হবে মুসলিম লীগের মতো।

কিন্তু পরিবর্তিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এখন আবারো প্রায় ১১ বছর ধরে সেক্যুলার ধারার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। এখন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধান দল বিএনপির সংসদে সদস্য সংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৪টি। স্বাভাবিকভাবেই তাই আবারো প্রশ্ন উঠছে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনৈতিক দল কি বাংলাদেশে ভ্যানিস হয়ে যাবে?

অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ধারা আর ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির অবিরাম লড়াই চলছে। এই লড়াই হচ্ছে নীতির প্রশ্নে, আইডোলজিক্যাল বা আদর্শিক। কখনো এক ধারা ক্ষমতাসীন হয়ে অপর ধারাকে ভ্যানিস করে দিতে চাইছে। বর্তমান বিবেচনায় ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা চাইছে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদীকে নিশ্চিহ্ন করতে আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেউ কি পারবে অপরকে ‘জিরো’ করতে? ইতিহাস পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনায় মনে হয় এমনটা করা অসম্ভব।

কেননা দুই ধারারই শিকড় আমাদের দুই দেশের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে। তাই শেষ হয়েও যেন কোনো ধারাই শেষ হয় না! এ যেন রক্তবীজ! কবে কখন এই উপমহাদেশের দেশগুলোতে দুই ধারার লড়াই শেষ হবে, তা অনুমান করা অসম্ভব। এদিক বিবেচনায় বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ধর্মনিরপেক্ষ দল আওয়ামী লীগের আত্মসন্তুষ্টির কোনো অবকাশ নেই।

নিরন্তন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ধারার পক্ষে রাজনৈতিক সংগ্রাম, জনগণের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে ভালো কাজ প্রভৃতিই কেবল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী ধারাকে পদানত করে রাখতে পারে। জনগণের মন জয় করাটাই এখানে মুখ্য। আগামী দিনে কী করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ, তার ওপরই নির্ভর করবে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী ধারার ভবিষ্যৎ।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ক্ষমতার রাজনীতিতে রয়েছে পরিবারতন্ত্র। এখানে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভারতে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দল পরিবারতন্ত্রের ধারায় পড়েনি। দলকে ক্ষমতাসীন করেছে, বিজেপির এমন দুই নেতা প্রয়াত অটল বিহারি বাজপেয়ি চিরকুমার আর বর্তমান নেতা নরেন্দ্র মোদির বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর অবস্থান যেমন, তেমনি কোনো সন্তান নেই। তাই বিজেপির ঘাড়ে পরিবারতন্ত্র চেপে বসার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে তা রয়ে যাচ্ছে।

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর রাজীব গান্ধী, তারপর ধারাবাহিকভাবে সোনিয়া গান্ধী এবং সবশেষে রাহুল গান্ধীর জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে কথাটি ভারতীয় রাজনীতিতে জোরালোভাবে উঠে আসে যে, পরিবারতন্ত্র ছাড়া কংগ্রেসের উপায় নেই।

এতদিন এটা ছিল বাইরের সমালোচনা কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনায় রাহুল গান্ধীই পরিবারতন্ত্রকে বাতিল করতে চাইছেন। কংগ্রেস সভাপতি পদে তিনি থাকতে চাইছেন না। কী হবে কংগ্রেস রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের ভাগ্য তা আগামী দিনগুলোতেই বলা যাবে। ভারতের রাজনীতির এই দিকটি বিবেচনায় নিয়ে যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই তবে দেখা যাবে, দুই ধারার দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই পরিবারতন্ত্রের ধারা রয়ে যাচ্ছে।

দুটি দলই যখন হত্যা-ক্যুয়ের রাজনীতির ভেতর দিয়ে বিপদে এবং ক্রম বিভক্তির মধ্যে পড়ে, তখন বাধ্য হয়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রথমে শেখ হাসিনা এবং পরে খালেদা জিয়া নেতৃত্বে আসীন হন। দলকে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং বারবার ক্ষমতাসীন করে দুজনই প্রমাণ করেছেন, এটা ছিল দল দুটির জন্য প্রয়োজন। একই পন্থা তারেক জিয়ার ক্ষেত্রে নিতে গিয়ে বিএনপির বারোটা বেজেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে এখনো তেমন কোনো প্রচেষ্টার মধ্যে যায়নি। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই ধারা বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে দলীয় চিন্তা কাজ প্রভৃতি। তবে কেন্দ্রে ওই ধারায় দলকে নিয়ে যাওয়া না হলেও তৃণমূলে প্রয়াত কিংবা জীবিত নেতাদের পুত্র-কন্যা-স্ত্রীরা হঠাৎ করে নেতা ও সংসদ সদস্য হয়ে যাচ্ছেন। যেন ক্রেন দিয়ে ওপরে তুলে নেতা বাসানো হচ্ছে। নেতা হওয়ার আগে গুণাবলি অর্জনের ধারা মাঠে মারা যাচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে এটা ভালো ফল বয়ে আনবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

তবে এ ক্ষেত্রে ভারতের অতীত অভিজ্ঞতা তথা জওহরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধী আমাদের পথ দেখাতে পারে। বলাই বাহুল্য, আওয়ামী নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছাত্র রাজনীতির অতীত ছিল আর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হওয়ার পর থেকে বিরূপ পরিস্থিতিতে জীবন-মৃত্যুর পরোয়া না করে যেভাবে কাজ করেছেন, তাতে বলা যায় ভারতের ওই দুই প্রয়াত নেতার মতোই তিনি নিজ যোগ্যতা প্রমাণ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এটা আজ মনে করার সময় এসেছে যে, পরিবারতন্ত্র কোনো সমাধান নয়, ব্যক্তির শ্রম-মেধা-দূরদৃষ্টি-পরিশ্রম-সাহস প্রভৃতিই রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাপকাঠি।

তৃতীয় প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা যেতে প্রথমেই বলতে হয়, ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যথাক্রমে মাত্র ১৬, ২৭ ও ২৯ আসন পেলেও (শতকরা ৩.২৯, ৮.৯২ ও ৯.৯৪) ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়। রুশ-চীন ভাঙনের পর ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হতে পারেনি। ১৯৭১ সালে সিপিএম ২৫টি ও সিপিআই ২৩টি আসন লাভ করে এবং দুয়ে মিলে সর্বমোট শতকরা প্রায় ১০ ভাগ ভোট পায়। ১৯৭৭, ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালে সিপিএম যথাক্রমে ২২, ৩৭ ও ২২ আসন পেয়ে তৃতীয় হয়। পরে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে তৃতীয় দল হিসেবে স্থান করে নিতে না পারলেও ১৯৯৮, ১৯৯৯ ও ২০০৪ সালে আবারো তৃতীয় দল হিসেবে ৩২, ৩৩ ও ৪৩ আসন পায়। তারপর থেকে শুরু হয় কেবলই নিচে নামার প্রক্রিয়া। এবারে গতবারের চেয়ে কম সিপিএম ৩টি ও সিপিআই ২টি আসন পেয়েছে।

১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিনিয়ত মতাদর্শগত প্রশ্নে ভাঙনের ভেতর দিয়ে একটি দলের এমন অবস্থা কি প্রমাণ করে তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবে মতাদর্শ বিবেচনায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সাচ্চা পার্টি গড়া এবং শত্রু-মিত্র নিয়ে ঠিক করাসহ নানা বিতর্ক করতে করতে কমিউনিস্ট রাজনীতি ভারতে আজ এই দশায় উপনীত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট ও বামরা নির্বাচনের রাজনীতিতে কখনো

স্বতন্ত্রভাবে আসনই পায়নি। এ থেকেই অনুধাবন করা যায়, বাংলাদেশে কমিউনিস্ট ও বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ! জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন তথা ধর্মনিরপেক্ষ নাকি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রশ্নই যেখানে সমাধান হয়নি, সেখানে বিপ্লবের লক্ষ্যে সেখানে বাম ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোনো ভবিষ্যৎ থাকছে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সবশেষে প্রশ্ন হলো, অভিজ্ঞতা থেকে কে কতটুকু শিক্ষা নেবে?

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

আপনার মতামত লিখুনঃ