বেআইনিভাবে জমির মালিকানা দাবি রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষের

বেআইনিভাবে জমির মালিকানা দাবি রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষের
বেআইনিভাবে জমির মালিকানা দাবি রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষের

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
বৈধ মালিকানা থাকার পরেও রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষুখামারের জমি জবর দখলকরে রেখেছে। অথচ এ জমির প্রকৃত মালিক ইক্ষুখামার এলাকার আদিবাসী সাঁওতালরা।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের রামপুরা, চকরহিমাপুর, নরেঙ্গাবাদ, সাপমারা ও মাদারপুর মৌজায় ব্রিটিশ আমল থেকে সাঁওতালদের বসবাস। তখন থেকেই সাঁওতালরা উল্লেখিত মৌজার বেশিরভাগ জমির মালিক। সেখানে তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো।

কিন্তু ১৯৫৫ সালে রংপুর চিনিকল প্রতিষ্ঠার পর সাঁওতালদের জমিতে শর্ত সাপেক্ষে ইক্ষুখামার প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকেই সাঁওতালদের জমি বেহাত হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৫ সালে সাওতালদের সাথে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পূর্ব পাকিস্তান) সরকারের যে শর্তে চুক্তিপত্র হয় সে চুক্তি ভঙ্গ করে চিনিকল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জমি লিজ দেয়।

এ কারণে ২০১৫ সালে ৬ই আগস্ট সাঁওতালরা চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন দেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তের জন্য দেন। তদন্তকারী দল সাঁওতালদের অভিযোগের সত্যতা রয়েছে মর্মে তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করেন।

জমিলিজ: শর্ত ও সুবিধার লোভেশর্ত ভঙ্গের ফল
সাঁওতাল ও পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন চুক্তিপত্রে দেখা গেছে, রংপুর চিনিকলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন সময়ে আখ সরবরাহের উদ্দেশ্যে চিনিকল থেকে ১৯ কি: মি: দূরে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষুখামারের জন্য পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পূর্বপাকিস্তান) শর্ত সাপেক্ষে ১৮৩২.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে আখ চাষ শুরু করে।

শর্তে উল্লেখ ছিল শুধু আখ চাষের জন্যই এ জমি অধিগ্রহণ করা হলো। সেই থেকে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন আখ চাষ করে আসলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দূর্নীতি ও স্থানীয় টাউট-বাটপারদের তৎপরতায় বছরের পর বছর লোকসানের কারণ হয়ে দাড়ায়।

সাথে সাথে ইক্ষু খামারের আখ চাষও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর খামারটির জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট লিজ দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। যা সাঁওতালেদের সাথে করা চুক্তি বিরোধী। এ সময় থেকেই ইক্ষুখামারের মূল মালিকরা শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করে তাদের জমি ফেরত পাওয়ার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে।

প্রথমে তারা তাদের জমি ফেরত পাওয়ার যুক্তি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করে। আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক তদন্ত টিম গঠন করে দেয়। তদন্তে ভূমি মালিকদের অভিযোগ প্রমাণিতও হয়। তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রানালয়ে প্রেরণও করা হয়। এরপরেও সাওতালরা তাদের জমি ফেরত পায়নি।

জোরালো হলো আন্দোলন
জমি বুঝে না পেয়ে জমির মালিকরা আন্দোলন আরো শক্তিশালী করে। গঠিত হয় সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমিউদ্ধার সংগ্রাম কমিটি। কমিটির নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন ছাত্রলীগের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি শাকিল আহম্মেদ বুলবুল ও মরহুম শাহজাহান আলী প্রধান।

তাদের নেতৃত্বে জমির মালিকরা একাট্টা হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচির মধ্যেছিল বিক্ষোভ সমাবেশ স্মারকলিপি পেশ, মিছিল, পথসভা ইত্যাদি। আন্দোলন সংগ্রাম চলাকালীন সময়ে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সাঁওতাল ও পুলিশের সাথে ঘটে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

সংঘর্ষে পুলিশ নিরীহ সাঁওতালদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ সহ হত্যা করে রমেশ টুডু, মঙ্গল মার্ডি ও শ্যামল হেমব্রম নামের ৩ সাঁওতালকে। সেই থেকে সাঁওতালরা তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত হলেও তাদের আন্দোলন থেমে থাকেনি।

ভূমি পুনরুদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম জানালেন, রংপুরচিনিকল এ জমি অধিগ্রহণ করেনি। অধিগ্রহণ করেছিল পাকিস্তান ইন্ডাট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট (পূর্বপাকিস্তান) করপোরেশন। চিনিকল কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে জমিগুলো দখলে রাখে।

এলাকার মানুষ দেশের স্বার্থে তখন কিছু বলেনি। যখন চিনিকলটি জনগণের কোন উপকারে আসছেনা সেই সাথে সরকারেরও কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে সর্বপরি শর্ত ভঙ্গ করেই ক্ষুখামারের জমিতে অন্য আবাদ হচ্ছে সেখানে সর্বস্ব হারা মালিকরা তাদের জমির দাবী ন্যায় সঙ্গত।

তাই জমির মালিকরা তাদের জমি ফেরত নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুকুরে মাছচাষাবাদ করছে। আর চিনিকল কর্তৃপক্ষ তাদের অবৈধ দাবী বাস্তবায়নের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আমাদের ন্যায় সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন সরকার।

কর্তৃপক্ষ যা বলছে
এ ব্যাপারে রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার রংপুর চিনিকলকে জাতীয়করণ করেন। ইক্ষুখামারের জমি এখন সরকারী সম্পত্তি। এ জমি কাউকে ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই। কতিপয় ভূমিদস্যু ইক্ষুখামারের জমি অবৈধভাবে দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে।

যেহেতু এগুলো সরকারি সম্পত্তি এ বিষয়ে সরকারই সিদ্ধান্ত নিবেন। আমাদের এখানে কিছুই বলার নেই। জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কাগজপত্র আমাদের কাছে নেই, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সব কাগজপত্র থাকতেপারে। জমিগুলো তো সাধারণ জনগণেরই ছিল। কিন্তু জমির ন্যায্য মূল্য দিয়ে সেগুলা অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ সরেজমিনে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের জমিগুলো রংপুর চিনিকলের অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত। এরপরেও চিনিকল কর্তৃপক্ষ কিভাবে জমিগুলো নিজেদের দখলে রাখতে চায়, এমন প্রশ্নের জবাবে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, জমিগুলো রংপুর চিনিকলের অব্যবহৃত হলেও তা সরকারের। এ বিষয়ে সরকারকে অবগত করা হয়েছে।

সরকার সিদ্ধান্ত নিবেন ইক্ষুখামারের জমিগুলো কি করবেন। একটি গোষ্ঠি আদিবাসী সাঁওতালদের উস্কে দিয়ে জমিগুলো দখলের চেষ্টা করছে। জমি সরকারের, আদিবাসী সাঁওতালদের ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে সাঁওতালরা উল্লেখিত বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের দাবী ইক্ষুখামারের বৈধ মালিক তারা।

যে কোনো মূল্যে তাদের জমি তারা ফেরত চায়। জমি ফেরত পেতে তারা তাদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। প্রয়োজনে তারা তাদের আন্দেলন আরো বেগবান করবে। রক্ত দিয়ে হলেও তারা তাদের ন্যায়্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।

এদিকে চলমান সমস্যা সমাধানে সরকার দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিলে আবারো এ এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।