বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ (স.)

লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী:গবেষক, প্রাবন্ধিক : বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ (স.)। মানবজাতির কান্ডারী রাহমাতুল্লিল আলামিন। আচ্ছালাতু আচ্ছালামু মুআলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ, ইয়া হাবিবাল্লাহ। যিনি না হলে আমি আপনি গোটা পৃথিবীর কিছুই সৃষ্টি হতো না, তিনি মহানবী মুহাম্মদ (স.)।

সমগ্র পৃথিবী যখন অন্যায় অবিচার জুলুম নির্যাতনে নিমজ্জিত ছিল তখন আল্লাহর সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (স.)-কে মানবতার মুক্তি, শান্তি, শৃঙ্খলা আর কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেন। মানব জাতি যখন পথ হারা দিশেহারা আশ্রয়হীন ও নেতৃত্বহীন জাতিতে পরিণত হয়েছিল ঠিক সেসময় বিশ্বনবীর আগমন। রাহমাতুল্লিল আলামিনের আগমনের সংবাদে পৃথিবীর কূলকায়েনাত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। পূর্বের সমস্ত নবী রসূলদের কাছে বার্তা ছিল এই যে সর্বশেষ যিনি শেষ নবী হয়ে এ ধারায় তশরিফ আনবেন তিনিই মহানবী (স.)।

পবিত্র মক্কা নগরীর ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল্লাহ ও মাতার নাম মা আমেনা। তার চাচার নাম আবু তালিব। তার দাদার নাম আবদুল মুত্তালিব। তিনি ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদেকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। তখন কূলকায়েনাত নিরব নিস্তব্ধ ছিল। আকাশ, বাতাস, আসমান জমিন গোটা সৃষ্টিজগত তার আগমনের সংবাদে স্বাগত জানাচ্ছিল। তিনি ছিলেন সকলের নিকট আল আমিন বা বিশ্বাসী। তার কাছে সকলেই সম্পদ গচ্ছিত রাখত। অমুসলিমরাও তাকে বিশ্বাস করে তার কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখত।

সামাজিক ন্যায়নীতি প্রতিষ্টায় সকলেই মহানবীকে অনুসরণ করতো। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে তিনি পবিত্র মক্কা নগরীতে ছিলেন। তখন মক্কায় মুর্তি পূজা আর তাওহীদ বিরোধী কর্মকান্ড ছিল প্রকাশ্য। তখন তিনি তাদের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করলেন। তিনি বললেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস করো তাহলে এক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। লা ইলাহা ইল্লালাহু, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ(স.)-এর উপর তোমাদেরকে ঈমান, একীন ও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত বন্দেগী করা যাবে না। কারো কাছে মাথা নত করা যাবে না। ইলাহ ছাড়া কারো উপাস্য করা যাবে না। মূর্তি পূজা তথা স্রষ্টার কোনো সৃষ্টিকে পূজা করা যাবে না। আর সর্বশেষ নবী হিসেবে মুহাম্মদ (স.) কে বিশ্বাস করতে হবে। এ দাওয়াত তিনি কুরাইশ বংশের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন। তখন মহানবীর পরিবার পরিজন প্রতিবেশীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।

তিনি যখন একমাত্র প্রভু প্রতিপালক রাব্বুল আলামিনের উপর বিশ্বাস ও ঈমান আনতে বললেন তখন তার উপর নেমে আসল অত্যাচার আর নির্যাতনের স্টিম রোলার। মহানবীর দাওয়াতে যারা এগিয়ে আসলেন তাদের উপর নানা নির্যাতন অত্যাচার শুরু হলো। কাফের মুশরিকদের স্টিম রোলার নির্যাতনের মধ্যেও একদল তাওহীদে বিশ্বাসী সাহাবায়ে কেরাম নবীর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে প্রিয় নবীকে আর্থিক, মানসিক সব দিকে সাহায্যে এগিয়ে আসলেন। নবী প্রেমিক সাহাবায়ে কেরাম ও তাওহীদে বিশ্বাসীদের দৃঢ় মনোবলে আল্লাহর নবী দ্বীনের প্রচার প্রসার বৃদ্ধি করলেন। নবীর আগমনে মরুভূমি নব যৌবন ফিরে পেল। ধীরে ধীরে সমগ্র আরব বিশ্বে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হলো। রাহমাতুল্লিল আলামিন মহানবী সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত। তাঁর রহমত ছাড়া কোনো সৃষ্টির কূলকিনারা হবে না। মহান বিশ্বনবী ঠিক যে উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন ঠিক সে অবস্থা পৃথিবীতে এখনো বিরাজ করছে। আজ গোটা দুনিয়ায় মজলুম মানবতা আশ্রয়হীন।

ক্ষমতাধর জালিম শাসকের হাতে মজলুম মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্তরে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত নির্যাতিত হচ্ছে। দুনিয়ার মানুষ সৃষ্টিজগতে নানাভাবে শান্তির আশা পোষণ করলেও কাঙ্খিত শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না। শান্তির দূত ও মন্ত্র আজ সবকিছু তার গুণাগুণ হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীর যাবতীয় শাসকগোষ্ঠী সে অঞ্চলের জনগণের শান্তি প্রতিষ্টা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও শান্তির পরিবেশ নেই। জালিম শাসক শোসক শ্রেণী মানবতাকে আজ করুণ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। মুক্তির অন্বেষায় মজলুম মানুষের আহাজারি আকাশ বাতাসকে ভারি করে তুলছে। রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছু আজ জালিমের হাতে বন্দি। ক্ষমতা আর অর্থনীতির কালো থাবায় পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষকে বন্দি করে রেখেছে। ন্যায়, মানবতা মানবাধিকার ভুলন্ঠিত। দুনিয়ার কোটি কোটি মজলুম মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার কোনো অধিকার নেই। পৃথিবীর অসংখ্য অঞ্চলে দিক বিদিক হারা মানুষ আশ্রয়ের জন্য আহাজারি করছে।

পৃথিবীর শাসক শ্রেণী সে আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। খাদ্যাভাব, অনাহার আর দুর্ভিক্ষে বহু অঞ্চল জলে পুড়ে ছারকার হচ্ছে। অপর দিকে সভ্য জাতির নামে অনেক দেশ তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্য নষ্ট করছে। সভ্যতা আর সভ্য জাতির নামে একশ্রেণীর মোড়ল শাসক পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ক্রমেই ধাবিত করছে। আজকের পৃথিবীতে যেটায় সংকট সেটা হচ্ছে আদর্শিক নেতৃত্বের সংকট। সুষম বন্ঠন, ন্যায় নীতি আদর্শিক পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের সংকট। রাজনৈতিক সংকটের সাথে ধর্মীয় বিভাজন হানাহানি আর মত বিরোধ ঘন্টায় ঘন্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবগুলো ধর্ম গোষ্ঠী আজ বিভাজনের মধ্যে ধাবিত। ধর্মীয় সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্ব সংকোচিত হচ্ছে।

ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এক ধরনের অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। সঠিক আদর্শ লালন পালন আর অনুশীলন সমাজ হতে বিলুপ্ত হচ্ছে। নীতি আদর্শ আর চরিত্র বলা যায় এখন সোনার হরিণ। তাই আজকের এ সময় পৃথিবীর জন্য একজন মহা মানবের প্রয়োজন ছিল! যিনি ঝ্ঞ্জা বিক্ষুদ্ধ পৃথিবীকে শান্তির পথে নিয়ে যেতে আসতেন। তাহলে এ পৃথিবী হয়তো আবার একটি স্বস্তি শান্তির নিশ্বাস ফেলতে পারতো। পৃথিবীতে বহু ধর্ম, অনেক গোত্র অসংখ্য জাতি থাকলেও বাস্তবে কেউ কোনো আদর্শের অনুসরণ অনুকরণ করছে না। মহা সংকট হলো আদর্শের অনুসরণ বাস্তবায়ন না করা। তবে বাস্তবায়ন যোগ্য অনুসরনীয় আদর্শ পৃথিবীতে বিরল। সেক্ষেত্রে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.) এর কালজয়ী আদর্শের অনুসরণ ছাড়া পৃথিবীর মানবতার মুক্তির আশা করা যায় না।

পৃথিবীকে আদর্শের আলোকে পরিচালিত করতে হলে কর্মী থেকে নেতা পর্যন্ত আর প্রজা থেকে রাজা পর্যন্ত মহানবীর চিরকাল জয়ী আদর্শ অনুসরণ বাস্তবায়ন হলেই আজকের সমাজ আলোকিত সমাজে পরিণত হবে। মহান এ মাস ও আজকের দিনে বিশ্বনবীর প্রতি হাজারো দরূদ সালাম জানাই। তাঁর প্রতি অকৃত্রিম গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা না থাকলে কোনো মুসলমান পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। পৃথিবীর সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স.) উপর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও অনুশীলন থাকতে হবে তাঁর উম্মতের। তবেই উম্মতে মুহাম্মদী ইহ ও পরকালীন মুক্তি পেতে পারে। আসুন, আমরা মহানবীর চির কালজয়ী উত্তম আদর্শ ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনুসরণ অনুকরণ করি। তবেই প্রকৃতভাবে নবী মুহাম্মদ (স.) এর প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটবে।

 

আপনার মতামত লিখুনঃ