বিপদ সমাগত, একতাবদ্ধ হয়েই ঠেকাতে হবে

ড. এম এ মাননান :

১৭ কোটি মানুষের ছোট্ট দেশটি প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১২০০ জনকে অসীম মমতায় বুকে ধারণ করে আছে বটে, কিন্তু শান্তিতে থাকতে পারে না কখনও। প্রতিনিয়ত বহু রকমের গুজবে, রটনায়, প্রকৃতির ছোবলে, মানবসৃষ্ট দুর্যোগে তটস্থ হয়ে থাকতে হয়। এ মুহূর্তে দেশজুড়ে চলছে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা।

এটি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। ঘরে ঘরে সন্ত্রস্ত অবস্থা। আগলে রাখছে প্রিয় বাচ্চাটিকে কিংবা অন্য কোনো প্রিয়জনকে। না জানি কখন এডিস মশা কামড় দিয়ে বসে। আতঙ্ক সৃষ্টি এমনিতে হয়নি। এডিস মশা শুধু কামড় দিচ্ছে না, সঙ্গে সঙ্গে কামড়ের কারণে সৃষ্ট ডেঙ্গু জ্বর নামক রোগটির মতিগতিও বদলে দিচ্ছে।

গতবারের তুলনায় ডেঙ্গুর রূপ অনেকটা বদলে যাওয়ার কারণে ডাক্তাররাও হিমশিম খাচ্ছেন। ডেঙ্গুর বর্ণচোরা ভাবটা টেনশনে ফেলে দিয়েছে সবাইকে। কোনো কোনো ডাক্তারের মতে, চার প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে। বর্ণচোরা হওয়ার কারণে ল্যাবটেস্টে অনেক সময় ধরা যাচ্ছে না ঠিকমতো।

ডেঙ্গুর লক্ষণ, ক্ষমতা, আক্রমণ কৌশল আর আক্রমণস্থল সবই পাল্টে গেছে। ডাক্তার ইকবাল আনোয়ারের একটি প্রবন্ধ থেকে জানা গেলো, শুধু ডেঙ্গু নয়, যেকোনো ভাইরাসেরই এ রকম চরিত্র পরিবর্তন হয়। সত্যিকার অর্থে, ভাইরাসের কাছে মানুষ আজো অসহায়, যদিও অনেক সরল প্রকৃতির ভাইরাসের টিকা বানাতে পেরেছে মানুষ। তার মতে, বেশির ভাগ ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোনো টিকা বা ওষুধ নেই। ডেঙ্গুর এ রকম বিচিত্র স্বভাবের কারণে চিকিৎসা জানা সত্ত্বেও একাধিক চিকিত্সকও ইতিমধ্যে করুণ পরিণতির শিকার হয়েছেন।

তবে আতঙ্কের কিছু নেই। আতঙ্ক মানুষকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ চিরকাল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য যুদ্ধ করেছে, কখনো হেরেছে আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জয়ী হয়েছে। যেমনটা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কিছুটা জয়ী হয়েছে চীনের গুয়াংজু প্রদেশ। এ বিষয়ে পরে আসছি।

ডেঙ্গু এ গ্রহে নতুন নয়। একটি তথ্যসূত্র মতে, ১৭৭৯ সালে প্রথম ডেঙ্গুর সন্ধান পাওয়া যায়, যদিও মশার বিচরণ এ গ্রহে ১০ হাজার কোটি বছরেরও আগে থেকে। গত চার দশকে একমাত্র বরফের রাজ্য এন্টার্কটিকা আর সুমেরু বৃত্তের গ্রিনল্যান্ড ছাড়া সব মহাদেশে এডিস মশা ছড়িয়ে পড়েছে। আকারে ক্ষুদ্র এসব মশা মানবদেহে ভয়ঙ্কর রোগের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বের প্রায় ১১০টি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়, প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায়। আমাদের এ অঞ্চলের অনেক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রয়েছে। ফিলিপিন্সের মতো দেশ তো একেবারে নাজেহাল অবস্থায়। ভারতেও ডেঙ্গুর মাতম চলছে। থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, ভিয়েতনামসহ পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই হচ্ছে এডিস মশার আক্রমণ।

খুবই সহজ কথা যে, প্রজনন রোধ করতে হলে তো লার্ভাই ‘মারতে’ হবে, মশা নয়। একবার লার্ভা নির্মূল হলে আর মশা মারার কথা ওঠারই তো সুযোগ নেই। আর লার্ভা নির্মূলের জন্য ওষুধ ছিটাতে হয় আকাশে না মাটিতে তা নিশ্চয় কর্তাব্যক্তিরা জানেন। এটা জানেন না বলার মধ্যে অনেক লজ্জার ব্যাপার জড়িত। আসলে প্রয়োজন প্র্যাকটিক্যাল হওয়া, বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানো।

চীন সরকার ডেঙ্গুকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ডেঙ্গু বিতাড়নের জন্য এডিস মশা নির্মূলের লক্ষ্যে চীনের গুয়াংজু প্রদেশে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল? ‘দ্য নেচার’ নামক একটি প্রকৃতিবিষয়ক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকা এডিস নির্মূলের বিষয়টি তুলে ধরেছে। মূলত সেখানে যা করা হয়েছিল, তা হলো এমন কিছু পদক্ষেপ যা এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করতে পারে এবং মশার রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা হ্রাস পায়।

তারা এডিস মশাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কাজটি করেছে মূলত এ কারণে যে, এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশাই ডেঙ্গু, জিকা আর চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ ঘটাচ্ছে সারা দুনিয়াতে। চীনের বিজ্ঞানীরা দুই বছর সাধনা করে দুটি বিদ্যমান পদ্ধতির সমন্বয় করে গুয়াংজুর দুটি দ্বীপপুঞ্জ থেকে এ মশার পরিমাণ ৯৪ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার আর্মব্রাস্টার তাদের উদ্ভাবিত দুই স্তরের পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালিয়ে সফল হয়েছেন বলেও খবরটিতে প্রকাশ পেয়েছে। একটি স্তর হলো বিকিরণের মাধ্যমে মশাকে নির্গত করা এবং আরেকটি স্তর হলো ওলবাখিয়া প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেনের মাধ্যমে ডিম থেকে মশার উৎপাদন রোধ করা।

আমাদের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী কৌশল উদ্ভাবন করতে পারে কি না, ভেবে দেখতে পারে। ইতিমধ্যে সারাদেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু যাতে মহামারি আকার ধারণ করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ গ্রহণও জরুরি।

নিতে হবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ঝটপট মাঠে নেমে যাওয়া। মাঠে নামবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সঙ্গে থাকবে সিটি করপোরেশন আর পৌরসভাগুলো। তাৎক্ষণিক উদ্যোগ না নিলে মহামারি লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যেমন লেগেছিল ১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দে সারা ইংল্যান্ডে এবং ফলশ্রুতিতে সারা ব্রিটেনে ইঁদুরজনিত প্ল্যাগের মহামারিতে প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছিল, যা ব্ল্যাক ডেথ নামে ইতিহাসে সুপ্রসিদ্ধ।

১৩৬১-৬২তে আবারও একই মহামারির কারণে ২০ শতাংশ ব্রিটেনবাসী মারা যায়। ডেঙ্গু মহামারির রূপ নেওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া জরুরি। সাত বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবার্তা দিয়ে বৈশ্বিক কৌশলপত্রে (২০১২-২০২০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্পর্কিত) ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছিল, সেখানে বাংলাদেশ কি কান দিয়েছিল? সংস্থাটি ডেঙ্গুঝুঁকি মানচিত্রে উল্লেখ করেছিল যে, ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা ঘরেবাইরে দিনে-রাতে কামড়াতে পারে এবং সারা দক্ষিণ এশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ডেঙ্গু এখন অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছড়াচ্ছে অনেক দেশে ভারত, নেপাল, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, চীন, সিঙ্গাপুর, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার, ব্রাজিল ইত্যাদি। নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বাংলাদেশে বড়ো আকারে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দপ্তরও (সূত্র :কালের কণ্ঠ, ৩১ জুলাই ২০১৯ পৃ:১, ২)।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে তা বুঝেও দিনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাজের সময় শেষ করে দিয়ে রাতে সজাগ থাকার দিন শেষ। বিলম্ব না করে আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। নগদ ব্যবস্থা নিতে হবে অনেক রকমের। মশা নিধনের ওষুধ কেনার সিন্ডিকেটগুলো পুরোপুরি জনস্বার্থে ভেঙে দিতে হবে শক্ত হাতে। সবগুলো সিটি করপোরেশন আর পৌরসভায় মশা নিধন কর্মীদের কাজকর্ম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

ডেঙ্গু টেস্টের মূল্য তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; সম্ভব হলে টেস্ট ফি-র খরচ সরকার থেকে বহন করা হলে সেটি হবে একটি গণমুখী পদক্ষেপ। সচেতনতা বাড়ানোর জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে শহরে, গ্রামে, গঞ্জে সর্বত্র। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, স্কুল-মাদ্রাসা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানগণ এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। এগিয়ে আসবেন দলমতনির্বিশেষে সবাই। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন নিজ নিজ এলাকায়। কথা কম বলে আর তর্কবিতর্ক ছেড়ে দিয়ে নজর দিতে হবে কাজের দিকে।

জনগণ কথার তুবড়ি ছোটানো নেতাকর্মীদের পছন্দ করেন না, চিরকালের এই সত্য কথাটিকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। নজর দিতে হবে এডিশ মশার উত্পত্তিস্থল পরিষ্কারের দিকে। মারতে হবে লার্ভা, একইসঙ্গে ইতিমধ্যে জন্ম নেওয়া মশা। এডিসের ডিম ধ্বংসের ব্যবস্থা নিতে হবে। না নিলে বিপর্যয় অনিবার্য। কারণ, এডিশ মশার ডিম শুকনো পরিবেশে ৯ মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, নষ্ট হয় না।

যখনই স্বচ্ছ পানির সংস্পর্শে আসে, তখন তা লার্ভা হয় এবং পরিপূর্ণ মশায় রূপ নেয় (আলোকিত বাংলাদেশ, ৩০ জুলাই ২০১৯, পৃ ৩)। শহরের সব ড্রেনে ছেড়ে দিতে হবে শতে শতে কাতল-রুই মাছের পোনা, যারা খেয়ে সাবাড় করবে মশার লার্ভা (মশার ওষুধের ব্যবসায়ীরা হয়তো একে হাস্যকর বলে গুজব ছড়াবেন তাদের ব্যবসার অকল্যাণ হওয়ার ভয়ে)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির একজন গবেষক এরূপ পরামর্শ দিয়েছিলেন অনেক বছর আগে, কিন্তু শুনেছি, কোনো একটি বহুজাতিক কোম্পানি এর বিরোধিতা করায় পরামর্শটি মাঠে মারা যায়।

আসুন, সবাই মিলে একজোটে দলমতনির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়ি এডিসের বিরুদ্ধে, সব মশা নির্মূল করার যুদ্ধে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে এই যুদ্ধে আমরা জিতবই ইনশাআল্লাহ। অদম্য বাঙালি জাতি কখনো কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে হতোদ্যম হয়নি। বিশ্বে আমরা আজ জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বস্বীকৃত রোল মডেল। আসুন না, আবার রোল মডেল হই ডেঙ্গু বিতাড়নের যুদ্ধে, সমগ্র বিশ্বে।

লেখক : ভিসি, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুনঃ