বাংলা বর্ষপঞ্জি ও আমাদের অর্থবছর

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ :

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ, প্রশাসনিক কর্মযোজনা, উন্নয়ন অভীপ্সা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন সূচনায় অর্থবছরের মেয়াদ মেরুকরণের প্রসঙ্গটি জাতীয় ভাবনার অংশ হওয়ার অবকাশ দেখা দিয়েছে। পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবর্ষ গণনার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর; মূলত রাজস্ব আহরণ তথা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই।

ইতিপূর্বেকার চান্দ্রমাসের ভিত্তিতে প্রচলিত হিজরি সন এবং সৌরবর্ষ গণনার পদ্ধতি প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় ও সাযুজ্য সাধনের তাৎপর্য ও যৌক্তিকতাকে বিচার-বিশ্লেষণের ভার তার নবরতœ সভার সবচেয়ে বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ সদস্য, মশহুর ইতিহাসবেত্তা আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২) এবং অর্থ ও রাজস্ববিষয়ক সদস্য রাজা তোডরমলকে তিনি অর্পণ করেছিলেন এ বিবেচনায় যে, অর্থনৈতিক কর্মকা-ই রাজ্য কিংবা সরকারের অন্যসব কর্মকা-ের ওপর অধিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবক ভূমিকায় থাকে। তাদের নির্দেশনায় ফতেহউল্লা সিরাজী যে সমন্বিত প্রস্তাব প্রণয়ন করেন, সে ভিত্তিতে ফসলি সন নামে নতুন বর্ষ গণনার রীতি প্রবর্তিত হয় ৫৯৪ হিজরি সনের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার মোতাবেক ১২ এপ্রিল, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মোতাবেক ১৪ এপ্রিল সোমবার।
প্রবর্তনের খ্রিস্টীয় সনটি ১৫৮৪ হলেও ফসলি সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সন ১৫৫৬ থেকে এর ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদান করা হয়। প্রজাদের উৎপাদিত ফসলের ওপর কর রাজস্ব আরোপ, হিসাবায়ন এবং যথা মৌসুমে তা সংগ্রহের সুবিধার্থে মূলত ফসলি সনের প্রবর্তন। এ ফসলি সনই পঞ্জিকা তথা অর্থবছর হিসেবে বিবেচিত হতো। ভারতের দিল্লিতে বসে প্রবর্তিত রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশক এ ফসলি সনই পরবর্তীকালে সুবা বাঙলায় (বর্তমানের বাংলাদেশ) বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে অব্যাহতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

মুঘলদের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রাজস্ব আহরণের উদ্দেশ্য, অভিপ্রায় ও প্রক্রিয়া ছিল মূলত বেনিয়া বাণিজ্যবোধ বিশ্বাসের ভিত্তিতে। সেসময় আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকা-ে ফসলি সনের ব্যবহারিক গুরুত্ব হ্রাস পায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাবধারায় অর্থবছর পৃথকভাবে গণনার রেওয়াজ চালু হয়। বাংলার প্রজাদের শস্য উৎপাদনের মৌসুমের সঙ্গে মিলিয়ে রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে পরিবর্তন। মুনাফা ও রাজস্বলোভী মুৎসুদ্দি মানসিকতার কাছে বাঙালির আবহমানকালের শাশ্বত সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে অর্থবছর হিসেবে বাংলা সন অনুসরণে চিড় ধরে। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষের বিপুল ব্যবহার ফসলি সনের কদরকে ফিকে করে দেয় আর পুরো আর্থ-প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা দান করে। কোম্পানি বাংলার মৌসুমি জলবায়ু তো দূরের কথা, ফসল উৎপাদনের সময়সূচিকে রীতিমতো অবজ্ঞাভরে দেখতে শুরু করে।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতের রাজদণ্ড কোম্পানির হাত থেকে খোদ ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়। ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতে পরিচালিত ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে আইনসভায় পেশ করা হয় ৭ এপ্রিল ১৮৬০। অর্থবছরের ধারণাটা বাংলা সনের অনুগামী রাখার পক্ষপাতী ছিলেন ভারতবর্ষে প্রথম অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০)। স্বনামধন্য ‘ইকনোমিস্ট’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের সচিব, অর্থ সচিব, ব্রিটিশ আইনসভার প্রভাবশালী সদস্য, ফ্রি ট্রেড আন্দোলনের কর্মী, পেপার কারেন্সি প্রবর্তনের প্রবক্তা জেমস উইলসন ভারতে ভাইসরয়ের কাউন্সিলে অর্থ সদস্য (মন্ত্রী সমতুল্য) হিসেবে নিযুক্তি পেয়ে কলকাতায় যোগদান করেন ১৮৫৯-এর ২৯ নভেম্বর।

সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে নতুন ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক সংকটের মোকাবেলায় উইলসনকেই উপযুক্ত ভেবেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী Lord Palmerston। ইতিহাস সচেতন বিচক্ষণ অর্থনীতিবিদ উইলসন ভারতের আর্থ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে ১৮৬০-এর ৭ এপ্রিল উপস্থাপিত ভারত সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতাতেই ভারতে আধুনিক আয়কর পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। প্রাচীন ভারতের মনুসংহিতা থেকে রাজস্ব আদায়ের সূত্র উল্লেখ করলেও তিনি মূলত ব্রিটেনের আয়কর আইনের কাঠামোয় এদেশে আয়কর আরোপের রূপরেখা দেন। এপ্রিল মাস থেকেই তার দেয়া বাজেটটির বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়, প্রচলিত বাংলা সনের সঙ্গে ছিল যার যৌক্তিক সাযুজ্য। পরিতাপের বিষয়, ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী, ভারতে আধুনিক আয়কর পদ্ধতি প্রবর্তনের মাত্র তিন মাসের মাথায় ডিসেন্ট্রিতে ভুগে মারা যান আগস্ট মাসের ১১ তারিখ কলকাতাতেই। পরবর্তী চার বছর বাজেট এপ্রিল-মে, এমনকী জুন মাসে উপস্থাপিত হলেও ১৮৬৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ১ এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরুর বিধানটি কার্যকর হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চকে অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ অব্যাহত রাখে; কিন্তু পাকিস্তান সরকার জুলাই-জুনকে অর্থবছর সাব্যস্ত করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য থাকায় পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমানের বাংলাদেশ প্রাদেশিক বা আঞ্চলিকতায় পর্যবসিত হয়। সুতরাং বাংলার কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মৌসুম অনুগামী বাংলা সন অর্থবছরের সাযুজ্যতায় মর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম অর্থনৈতিক কর্মকা- সবকিছুই ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিন্ন। সে কারণে এপ্রিল-মার্চের স্থলে জুলাই-জুনকে অর্থবছর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তই একচ্ছত্র হয়ে যায়।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থবছরকে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রতিফলক বাংলা সনের অনুগামীকরণের বিষয়টি যৌক্তিক বিবেচনায় এসেও যেন আসেনি। দুঃখজনকভাবে পাকিস্তান আমলে প্রবর্তিত জুলাই-জুন এখনও বাংলাদেশের অর্থবছর হয়ে আছে। উপযুক্ত কারণ পরীক্ষা পর্যালোচনা করে এটি পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতা অনুভূত হয়। বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বার্ষিক কর্মযোজনার নিরিখে এটা খুবই স্পষ্ট যে, জুলাই-জুন অর্থবছর হিসেবে যোগ্যতর নয়, হতে পারে না।

আমাদের দেশে মূলত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর অবধি বর্ষাকাল। বিদ্যমান অর্থবছর শুরু হয়েই প্রথম তিন-চার মাস বর্ষাজনিত কারণে উন্নয়নমূলক কর্মকা- শুরু করা যায় না। আয়কর আইন অনুযায়ী আগের অর্থবছর শেষ হওয়ার তিন মাসের মাথায় ঠিক এ সময়টাতে আয়কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রায়ই বড় বন্যা তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় দুর্গতি বয়ে আনে এবং এ সময়টা ফসল বপনের, ফসল তোলার নয়; ফলে আয়কর হিসাবায়ন, পরিশোধ তথা রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতায় বিব্রতবোধ করে রাজস্ব প্রদানকারীরা, এসব নানা কারণে প্রায় প্রতি বছর আয়কর প্রদানের সময় বাড়ানোর দাবি উঠে আসে।

অর্থবছরের প্রথম তিন-চার মাস এক ধরনের কর্মহীন অতিবাহিত হওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়া হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কার্য কিংবা সরবরাহ ও সেবা কিংবা ভৌত কর্মকা- শুরু যখন হয়, তখন বর্ষা শুরু হয়ে যায়। কাজের, সরবরাহের, সম্পাদনের গুণগতমান বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের বর্ষাকালে। এ সময় মেরামত-সংস্কার কাজে জনভোগান্তি যেমন বাড়ে, কাজের গুণগতমান পরিবীক্ষণেও ঘটে বিপত্তি। অর্থবছরের শেষে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানোর দ্রুততায় নানা অনিয়ম ও অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়াটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ সময়টাতে অপব্যয়-অপচয়ের অবকাশ হয় অবারিত। শুধু কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থবছরের পাঁচ-ছয়টি মাস অর্থনীতির জন্য অনুকূল না হয়ে প্রতিকূল হয়ে ওঠে।

অথচ অর্থবছরের এ ব্যাপ্তিটা জুলাই-জুনের পরিবর্তে যদি এপ্রিল-মার্চ (বাংলা সনের কাছাকাছি) হয়, তাহলে প্রথম মাসেই কাজ শুরু করে পরবর্তী তিন-চার মাস বর্ষাকালে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অক্টোবর-মার্চ এ ছয় মাস পুরোটাই নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ সময়টিই সব কাজের জন্য অনুকূল, সহনশীল ও উৎপাদনমুখী। ব্যক্তি ও ব্যবসা উভয় শ্রেণীর করদাতার জন্যও মে-জুন মাসে করের হিসাবায়ন, কর প্রদান তথা রিটার্ন দাখিলে বিড়ম্বনা স্বাভাবিকভাবে হবে কম।

কৃষিপ্রধান অর্থনীতির এ দেশে উৎপাদন মৌসুম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা- ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও আবহমান সংস্কৃতির সুসময়কে শনাক্ত করেই অর্থবছরের ব্যাপ্তিকাল নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আমাদের প্রতিবেশী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অর্থবছর মুঘল যুগ ও ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এপ্রিল-মার্চ হলেও পাকিস্তানি আমলে প্রবর্তিত জুলাই-জুন অর্থবছর বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বিদ্যমান। প্রধান দেশওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মার্কিন মুল্লুকের দেশগুলো (তবে থাইল্যান্ডসহ) অক্টোবর-সেপ্টেম্বর, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো জুলাই-জুনের (তবে ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, হংকং ব্যতিক্রম) মৌসুমিবলয় ও এশীয় দেশগুলোয় (ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, হংকংসহ) এপ্রিল-মার্চের প্রাধান্য। সার্কভুক্ত ৭টি দেশের ৪টি (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান) দেশে জুলাই-জুন, ২টি (শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ) দেশে পঞ্জিকাবর্ষ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) এবং একমাত্র ভারত এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করে।

উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীন এবং মালয়েশিয়া উভয়ই পঞ্জিকাবর্ষকে অর্থবছর মানে। কোনো কোনো দেশ যেমন নেপাল (১৬ জুলাই-১৫ জুলাই), ইরান (২১ মার্চ-২০ মার্চ), ইথিওপিয়া (৮ জুলাই-৭ জুলাই) মাসের মধ্যবর্তী তারিখ থেকে অর্থবছর শুরু করে থাকে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। বাংলা সনকে হুবহু সাযুজ্যকরণে বাংলাদেশের অর্থবছর ১৪ এপ্রিল-১৩ এপ্রিল সাব্যস্ত হতে পারে। এর সঙ্গে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষকে বাংলাদেশের অর্থবছর করার প্রস্তাবটি তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু, জীবনযাপনের সময়চক্র, আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকা-ের আবহমান সংস্কৃতিকে যথাবিচেনায় আনলে অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হওয়াটা অধিকতর যুক্তিযুক্ত প্রতীয়মান হয়।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : অবসরপ্রাপ্ত সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান