পশ্চিমবঙ্গ: নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ দুর্গম

পশ্চিমবঙ্গ: নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ দুর্গম
পশ্চিমবঙ্গ: নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ দুর্গম

এফএনএস ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের ভোট এখনও শুরু হয়নি। কিন্তু এরইমধ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে ঘোষিত ক্রুসেডে জয়লাভ করতে মনুষ্য সামর্থ্যরে পুরোটাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গুটিকয়েক বিশ্লেষক মনে করছেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক যুদ্ধ জেতার জন্য তিনি সামর্থ্যরে চেয়ে বেশি করছেন। প্রায় ৬৬ বছরের মমতার জন্ম তারিখ নিয়ে সংশয় থাকলেও শরীর সুস্থ রাখা নিয়ে তার খামখেয়ালি রয়েছে।

সাত ধাপের নির্বাচন গড়াবে ২৩ মে পর্যন্ত। ফলে শারীরিক ধকল কাটিয়ে ওঠার সময়ও তিনি পাবেন না। অবশ্য এই যুদ্ধে শারীরিক দিকটা তার সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে তার দল অংশগ্রহণ করছে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। এর প্রধান করাণ হলো, ব্যাপক দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ, আর্থিক অনিয়ম, আইন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তৃণমূল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। বেশ কিছু দিন ধরে তৃণমূল নেতা ও রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টে গুরুতর অভিযোগের মামলা চলছে। এদিকে সময়ও ঘনিয়ে আসছে।

সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, আদালতের প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে। শুনানি শিগগিরই শেষ হবে এবং আগামি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হতে পারে। রায়ে তৃণমূলের অনেক নেতার সাজা হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। টেলিভিশনে বহুল প্রচারিত নারদা কেলেঙ্কারির কথা ভুলে যান। ওই সময় তৃণমূলের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা হলো সারদা চিট ফান্ড। ২০১৩ সালে সারদার প্রধান সুদীপ্ত সেন গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে যাচ্ছে ঘটনাটি। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খ- ও উড়িষ্যায় দরিদ্রসহ প্রায় ২০ লাখ মানুষ তাদের সঞ্চয় হারান। সব মিলিয়ে সারদায় জমা হওয়া টাকার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যায়।

এই ধাক্কা সইতে পারেন নি অনেক মানুষ। অন্তত ১২০ জন আত্মহত্যা করেন, যাদের বেশিরভাগই পশ্চিমবঙ্গের। মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক শীর্ষনেতার সারদা কর্মকা-ে জড়িত হওয়ার কথা উঠে আসে। জাতীয়ভাবে বিক্ষোভের ফলে চাপে পড়ে তৃণমূল সরকার রাজ্য পুলিশকে তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দিলেও তা যথেষ্ট ছিল না। উল্টো সারদা তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (সিবিআই) তদন্তের গতি শ্লথ করার জন্য রাজ্য ১২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করেছে। দ্রুতই রাজ্যের মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাসহ বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা গ্রেফতার হন। একটি মামলায় তাদের অনেকেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ভোগ করেছেন। বিচার চলমান থাকায় তারা জামিনে রয়েছেন।

কিন্তু কমিশনার রাজিব কুমারের নেতৃত্বাধীন রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারণে সিবিআই’র তদন্ত এগুতে পারেনি। সিবিআই’কে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সারদা কা-ে তৃণমূল ও রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্টতা ঢাকতে প্রমাণ নষ্ট করেছেন, এমনকি ভুয়া নথিও তৈরি করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ সরবরাহ করতেও গড়িমসি করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাজিব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে কলকাতা পুলিশ সিবিআই কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে। মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা ধরনায় বসেন। অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু করছে। এতে অনেকের মনেই ধারণা জন্মায়, সারদা কা- ও লোপাট হওয়া অর্থের সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

যদিও পরে আদালতের নির্দেশে শিলংয়ে সিবিআই কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হয়েছেন রাজিব কুমার। সেখানেও তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা না করার অভিযোগ উঠেছে। আদালত সহযোগিতা না করার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেছেন। ক্ষমতাসীনদের হয়ে প্রমাণ নষ্টের অভিযোগে রাজিব কুমার ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে।

মজার বিষয় হলো, তৃণমূল নেতা অর্পিতা ঘোষ, শতাব্দী রায় ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের লোকসভায় প্রার্থী হয়েছেন। এই তিনজনই সারদা গ্রুপের সুবিধাভোগী। বিভিন্নভাবে তারা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তদন্তের শেষে এই নেতারা দোষী সাব্যস্ত হলে কী হবে? কোনও সন্দেহ নেই যে তৃণমূল রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে এগুচ্ছেন তাতে এটা তার কাছে সবচেয়ে কম গুরুত্বের।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, এবার কেন্দ্রে আবারও জোট সরকার গঠিত হতে পারে। ফলে লোকসভা নির্বাচনের ফল তৃণমূলকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে স্থান দিতে পারে। বিশেষ করে বিজেপি যদি দুর্বল হয় অথবা কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলের কাছে হেরে যায়। মায়াবতী, অখিলেশ যাদব, লালু প্রসাদ যাদবদের মতোই মমতা ও তৃণমূল নিজেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করতে পারেন, জনগণের চোখে দুর্নীতিবাজ কিন্তু কার্যকর।

তবে যা-ই হোক, তৃণমূল কংগ্রেসের সুবিধা লাভের বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর। কোনও সন্দেহ নেই, সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার প্রক্রিয়ার ওপর পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও প্রশাসনে বড়সড় ধাক্কা লাগবে। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের দিনগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তি প্রয়োগের কৌশল হয়তো প্রকাশ্যে ততটা দেখা যাবে না। কয়েক মাস আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে যেরকম কলঙ্কজনকভাবে শক্তি প্রয়োগ হয়েছিল এবারে ততটা হবে না বলেই মনে হচ্ছে।