নারী শিক্ষা বিস্তারে রহিম উদ্দিন ভরসার ভূমিকা

নারী শিক্ষা বিস্তারে রহিম উদ্দিন ভরসার ভূমিকা
নারী শিক্ষা বিস্তারে রহিম উদ্দিন ভরসার ভূমিকা

এম এ শোয়েব দুলাল:
সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা, কাল, পাত্র ও ঘটনা নির্বিশেষ বিচিত্র নামে সুপরিচিত হয়েছে। ঠিক এমনি একটি জায়গা ‘হারাগাছ’ রংপুর বিভাগের কাউনিয়া উপজেলাধীন শ্রমিক অধুষ্যিত প্রাচীন জনপদ।

বস্তুতঃ এ জায়গাটির নামকরণ সম্পর্কে কোন সময়কাল নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও জনশ্রুতি অনুযায়ী এ জায়গার নামকরণের কিছুটা ইঙ্গিঁত পাওয়া যায়।

রংপুরের উত্তরে ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রাচীন জনপদ ‘হারাগাছ’ তিস্তানদী ও পশ্চিমে ধুমগড়-ধুমনদী ঘেঁষে অবস্থিত। ‘হর’ শব্দের অর্থ সবুজ। সবুজ জাতীয় তামাক গাছ হারাগাছে উৎপন্ন হতো বলে এই অঞ্চলের নাম হারাগাছ। মতান্তরে দালালহাট ও অধুনালুপ্ত গোলার হাট পেরিয়ে চরচতুরা, কালিদহের ঘাট এলাকায় দু’টি বৃহৎ আকারের অশ্বথ গাছ ‘তিস্তা’ নদীর প্রবল ভাঙ্গঁনে হারিয়ে গিয়েছিল বলে এ জনপদের নাম হারাগাছ। মতান্তরে সবজাতের তামাক গাছ’ই হরিৎ বর্ণের হয়ে থাকে। হতে পারে এই হরিৎ গাছ থেকেই হারাগাছের নামকরণ হয়েছে। হরিৎ গাছ কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে অবশেষে হারাগাছ হয়েছে।

বলাবাহুল্য মোঘল শাসনামলে এ এলাকাটির নাম ‘হরগাছা’ বা ‘হারাগাছা’ ছিল বলে প্রাচীন দলিল দস্তাবেদে প্রমানাদি পাওয়া যায়। এক সময় এখানে ব্যাপক হিন্দুবসতি গড়ে উঠেছিল। হারাগাছের পূর্বে বকুলতলার কুমারটারী, বাংলা বাজারের শাঁখারী পাড়া, চরচতুরা কালিদহের ঘাট, ঠাকুরদাস, চারুভদ্র, গ্রামগুলোর নামকরণ থেকে তা বোঝা যায়। বিগত ১৪ নভেম্বর ১৯৮৯ইং সালে সরকারী সিদ্ধান্ত মোতাবেক হারাগাছ আরবান বা পৌর এলাকায় গেজেট ভুক্ত হয়। ‘হারাগাছ’ এখন হারাগাছ পৌরসভা নামে পরিচিত।

হারাগাছ পৌর এলাকার হক বাজার ও পাইকার বাজারের মধ্যবর্তী স্থান সারাই ডারারপাড় নামক স্থানে সাধারণ ব্যবসায়ী মনের উদ্দিন পাইকার ও নবীজন নেছার কোল জুড়ে রহিম উদ্দিন ভরসা ১৬ জানুয়ারী ১৯৩৫ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মনের উদ্দিন পাইকারও ব্যাপারী নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। মনের উদ্দিন পাইকারও নবীজন নেছা দু’জনেই পরপারে। দু’ভাই ও তিন বোনের মধ্যে রহিম উদ্দিন ভরসা দ্বিতীয়। ভরসার ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় বোন নুরজাহান বেগম।

অন্যান্য ভাইবোনরা হলেন আলহাজ্ব করিম উদ্দিন ভরসা, (সাবেক সংসদ সদস্য), মালেকা বেগম ও ফজিলা বেগম। সকলেই বেঁচে আছেন। বিভিন্ন ভাবে সবাই সমাজ সেবায় লিপ্ত। রহিম উদ্দিন ভরসা একাধারে শিক্ষানুরাগী, শিল্পপতি, রাজনীতিক ও বর্ষিয়ান নেতা। ১৯৭৯ইং সালে (কাউনিয়া-পীরগাছা) রংপুর-৪ আসন থেকে (বি.এন.পি) জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ব্যবসা রাজনীতির পাশাপাশি সমাজে তাঁর অবদান অনেকখানি। বানুপাড়া মৌজায় ‘রহিমিয়া মাদ্রাসা এতিম কমপে¬ক্স প্রতিষ্ঠা, ‘হারাগাছ ৩১ শষ্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জমিদান, হারাগাছ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স প্রতিষ্ঠানের জমিদাতা হিসেবে সামাজিক কাজের স্বাক্ষর বহন করবে যুগ যুগ ধরে। হারাগাছ ডিগ্রী কলেজ সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ভাবনার শহরে বিবেকের মন্দিরে সুখের নিক্কণ তোলে।

রহিম উদ্দিন ভরসা ভাল কর্মের জন্য ১৯৯৩ইং সালে তৎকালীন বি.এন.পি সরকারের আমলে সমাজ সেবায় স্বীকৃতি স্বরূপ স্বর্ণপদক লাভ করেন। পরবর্তীতে অতীস দীপংকর, হিউম্যান, সাউন্ড টার্স, হারাগাছ গুণীজন সংবর্ধনা ইত্যাদি পুরষ্কার অর্জন করেছেন। ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ করদাতা ও ভ্যাটদাতার পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। ডারারপাড়ের মরহুম মনের উদ্দিন পাইকারও মরহুম নবীজন নেছার আদুরে সন্তান রহিম উদ্দিন ভরসা তীক্ষèবুদ্ধি সম্পূর্ণ ও পরিশ্রমী মানুষ। তিনি ডারার পাড়ে অবস্থিত ডারারপাড় মক্তবের ছাত্র ছিলেন। নিজে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও নারী শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বিকার্য।

রহিম উদ্দিন ভরসা নারী জাগরনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার পথ অনুসরণ করে ১৯৮২ইং সালে এক একর পঞ্চাশ শতক জমিতে মায়ের নামানুসারে ডারারপাড়ে প্রতিষ্ঠা করেন “নবীজন নেছা দ্বি-মুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়”। প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন লেখক ইতিহাস গবেষক মোঃ আবুল কাশেম। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন এ.এস.এম নুরুন্নবী চাঁদ। শিক্ষক শিক্ষিকার সংখ্যা এগার জন। ছাত্রী সংখ্যা ৩০০ জন। ছাত্রীদের স্কুল ড্রেস সাদা ফ্রক ও নেভিব্লু সালোয়ার।

বিদ্যালয়টিতে কয়েকটি আম ও কাঁঠাল গাছ অবিরাম ছায়া দিচ্ছে। একাডেমিক হলের সামনে শহীদ মিনার বিদ্যমান। বিশেষ বিশেষ দিবসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। ১৯৮৬ইং সালে ভরসা নবীজন নেছা বিদ্যালয় সংলগ্ন স্থানে নবীজন নেছা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান এটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষকের নাম মমতাজ উদ্দিন। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক শিক্ষিকার সংখ্যা তিন জন। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা একশত পঞ্চাশ জন।

রহিম উদ্দিন ভরসা নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য নবীজন নেছা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে হারাগাছে নারী শিক্ষার প্রদীপ জালিয়েছেন। বিদ্যালয়টি থেকে পাশ করে বেড়িয়ে যাওয়া নারীরা সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। বর্তমানে হারাগাছে বিড়ি শ্রমিকদের বাড়িতেও আই.এ-বি.এ পড়–য়া নারীর সাক্ষাত পাওয়া যায়। যা সত্তর দশকে কল্পনা করা যেত না। নারী শিক্ষার পৃথক প্রতিষ্ঠান নবীজন নেছা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে হারাগাছের নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার প্রয়াস লক্ষনীয়।

স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল হারাগাছে নারী শিক্ষার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলে এখানকার নারীদের কাছে তিনি বেঁঁচে থাকবেন অনন্তকাল। যেমন উনিশ শতকের বেগম রোকেয়ার “সুলতানার স্বপ্ন” গ্রন্থটি আজো নারীকে একুশ শতকে আলো দেখায়। নির্ভীক প্রীতিলতারা নারীকে সাহস যোগায়। অথচ সত্তর দশকে হারাগাছে ৩৫ হাজার বিড়ি শ্রমিকের মজুরী নিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও নারী শিক্ষার ব্যাপারে কেউ অগ্রনী ভূমিকা পালন করেনি। এখন হারাগাছের অর্থনীতি থুবরে পড়েছে। বিড়ি শিল্পের নাজুক অবস্থা বিরাজ করায় এখানকার নারীরা ঢাকা গার্মেন্টস শিল্প সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন। নারী শিক্ষায় ভরসা যেমন ঝলসে উঠেছেন তেমনি নারীদের কর্ম সংস্থানের জন্য তাঁর পুত্র অনুসারীদের ঝলসে উঠা জরুরী প্রয়োজন। নচেৎ হারাগাছে নারীদের জীবন যাত্রার মান থুবড়ে পড়বে। যেমন থুবড়ে পড়েছে বেগম রোকেয়ার ‘পায়রাবন্দ’। আজো পায়রাবন্দের নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। প্রয়াত সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের ভাষায় “পায়রাবন্দে এখন বাতির নীচে অন্ধকার”।

বেগম রোকেয়ার জীবন কষ্ট ক্যাক্টাসে ভরাছিল। সে যুগে বাংলা বিহারে মুসলিম মেয়েরা পর্দার আড়ালে আবৃত ছিল। স্কুল গমন নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময় পর্বত সমান প্রতিকূল সমাজ ব্যবস্থায় অবরোধ প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া। এতদ অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রদীপ জালিয়েছিলেন তিনি। স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর বিধবা রোকেয়া ১৯০৯ সালে বিহারের ভাগলপুরে মাত্র ৫ জন ছাত্রী নিয়ে শশুরালয়ে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।

সামাজিক চাপে তাঁর সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ভেস্তে গেলেও হাল ছাড়েননি। পরে দেন মোহরের ১০ হাজার টাকা নিয়ে কলকাতায় এসে ৮ জন ছাত্রী নিয়ে পুনরায় ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল ওয়ালিউল¬া লেনে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে স্কুলটি স্থানান্তরিত হয়ে আসে লোয়ার সার্কুলার রোডে। স্থায়ী হয় ১৯১১ সালে ১৭ লড্ সিনহা রোডে। ( ১৭ লড্ সিনহা রোডে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের প্রবেশ পথে দেয়ালে শ্বেত পাথরে কালো অক্ষরে লেখা অনুযায়ী। আমি লেখক ১৫-০৯-১৯৯৮ইং তারিখে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি।)

গাছপালায় আচ্ছাদিত চারতলা ভবন বিশিষ্ট সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলটিতে দু’সিপটে ক্লাশ বসে। জানাগেছে এখন ঐ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১৮০০ জন। শিক্ষিকার সংখ্যা ৮৫ জন। বিদ্যালয়টি এখন সরকারী প্রতিষ্ঠান। পশ্চিম বঙ্গঁ সরকারের আদর যতেœ এটি লালিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। বেগম রোকেয়ার চেষ্টা ও আগ্রহে তদানীন্তন বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রতি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে এদেশের অবরোধ বাসীনিরা অবরোধের বোরখা পরিত্যাগ করে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসায় শিক্ষালাভের ব্রতি হয়। নারী জাতির মধ্যে শিক্ষার হার কিছুটা হলে বৃদ্ধি পায়। একথা সত্য যে, নারী জাতির মধ্যে শিক্ষাব্রত, শিক্ষা সচেতনতা সৃষ্টি করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। যার ধারাবাহিকতা আজো চলমান গতানুগতিক পর্যায়ে। নারীরা এখন আর অবরোধ বাসিনী নয়। বাংলাদেশের নারীরা ঘর ও বাহির দু’অঙ্গঁনেই কাজে গতি সঞ্চার করেছে।

এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের ছোট করে দেখা হয়না। মেয়েরা এখন পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। এই বৈপ্ল¬বিক পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই শিক্ষার ভূমিকা অনেক বেশি। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানে ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন’। ২৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কার্য নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’। নারী পুরুষ ভেদাভেদ না রেখে অনুচ্ছেদ ১৭তে সকলের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা গ্রহণে সুযোগের কথা বলা হয়েছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে। সরকারের এই সদিচ্ছার ফলে বাংলাদেশের নারীরা এখন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত।

রাজনীতি থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, সাংবাদিকতা, এমনকি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও নারীরা আজ পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। আশার কথা আমাদের দেশের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয়নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ দু’জনেই নারী। নারী শিক্ষার কারণে সবকিছুই সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়ন ও সমধিকার নিশ্চিত করতে হলে নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। সরকার এ লক্ষ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করলেও এর বড় অন্তরায় আর্থ-সামাজিক অবস্থা। আমাদের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ গ্রামে বাস করে।

শহরের তুলনায় তাদের অধিকাংশের বাস দারিদ্র্যসীমার নীচে। দরিদ্র পরিবারের পিতা-মাতা মনে করেন লেখাপড়া করার পরিবর্তে আমাদের সন্তানরা আয় রোজগার করলে তারা দারিদ্রের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবেন। তাদের এ মানসিকতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্কুলগামী শিশুদের অভিভাবকদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে বেসরকারী সংগঠন ও গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। নারীরাও শিক্ষিত হয়ে পুরুষের সমান হতে পারে এ ধরনের প্রচারণা চালাতে হবে। সনাতনী দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন করতে পারলে বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় পরিবর্তন সাধিত হবে। সুন্দর ও শিক্ষিত জাতি হিসেবে দেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।

পীরগাছা রংপুর বিভাগের একটি উল্লেখযোগ্য উপজেলা। মোঘল শাসনামলে এ স্থানটি চন্ডীপুর পরগনা নামে পরিচিত ছিল। অসংখ্য সুফি, সাধক, ফকির সন্যাসীদের তীর্থক্ষেত্র ছিল পীরগাছা। তৎকালীন যুগে পীর, ফকির, সন্ন্যাসীরা ছিলেন ধর্ম প্রচারক, সমাজ সংস্কারক, বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়। সমাজে এদের প্রভাব ছিল অপরিসিম। পীরগাছা নামে এ উপজেলায় কোন গ্রাম বা মৌজা নাই। সঙ্গঁত কারনে এতদাঞ্চলে পীর, ফকির, সন্ন্যাসী এবং গাউসদের সমাবেশ ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে ‘পীর’ ও ‘গাউস’ থেকে ‘পীরগাছা’ নামের উৎপত্তি। পীরগাছা উপজেলার সাতদরগা, বড়দরগা, মাদারশাহ্ ফকিরের দরগা, চন্ডিপুর, পবিত্রঝাড় আজো পীর গাউসদের স্মৃতি ধারণ করে চলছে। রংপুরের পূর্ব দক্ষিণে পীরগাছার অবস্থান। ১৯৯৫ইং সালে রহিম উদ্দিন ভরসা পীরগাছায় নারী শিক্ষা বিস্তারে নিজ নামে “রহিম উদ্দিন ভরসা মহিলা মহাবিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠা করেন। যার কলেজ কোড নং- ৫৪২৭ এমপিও কোড নং- ৯১০৬০৪৩১০১। প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক হাসান আলী চৌধুরী। বর্তমান অধ্যক্ষের নাম ইয়াকুব আলী। কলেজটিতে জমির পরিমান ১.৮০ একর। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী মিলে ছাত্রীর সংখ্যা ২৬৬ জন। শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ২০ জন। পুরুষ শিক্ষক ১৪ জন। মহিলা শিক্ষক ০৬ জন। অন্যান্য কর্মচারীর ০৯ জন। মহাবিদ্যালয়টিতে একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে। যার আসন সংখ্যা ৪০। ছাত্রী হোস্টেলটির দৈর্ঘ্য ১৪৪র্ প্রস্থ ২৫র্ ছাদ ঢালাই করা। তৃতীয় তলার ভিত্তিসহ একতলা সম্পন্ন। প্রশাসনিক ভবনের দৈর্ঘ্য ৬০র্ ´ প্রস্থ ২৬র্ । বিজ্ঞানাগারসহ ৩টি শ্রেণী কক্ষ রয়েছে। নামাজ ঘর, গ্রন্থাগার, কম্পিউটার ল্যাব কলেজটিতে বিদ্যমান। কলেজে ছাত্রীদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে ভরসা একটি মিনিবাস অনুদান দিয়েছেন। পীরগাছার বিভিন্ন সড়কে বাসটির চলাচল লক্ষ্য করা যায়। অনুরূপ একটি মিনিবাস হারাগাছ ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়েও দেখতে পাওয়া যায়। রহিম ভরসা মহিলা মহাবিদ্যালয়টি গাছ-গাছালীতে ভরা। কলেজটি যেন সবুজ চাদরে আচ্ছাদিত। শিক্ষার্থীরা সাদা ফ্রোক সাদা সালোয়ার পরিধান করে শিক্ষালাভে ব্রতি হয়েছে। ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল মোটামুটি। দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসায় এমনিভাবে তার অনুদান অব্যাহত রয়েছে।

দেশ তথা হারাগাছ, কাউনিয়া, পীরগাছাবাসীদের কাছে প্রবীন ব্যক্তিত্ব রহিম উদ্দিন ভরসা সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি এলাকার উন্নয়নে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। নারী শিক্ষা প্রসারে তাঁর হাতে গড়া “নবীজন নেছা দ্বি-মুখী উচ্চ বালিকা, নবীজন নেছা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়”, “পীরগাছায় রহিম উদ্দিন ভরসা মহিলা মহাবিদ্যালয়” নারীর অধিকার রক্ষায় ভিন্ন এক আলোর দ্যোতি ছড়িয়েছেন। নিজ এলাকাকে সমৃদ্ধ করতে পিছ পা হননি। বলা যায় নারী শিক্ষা বিস্তারে তার ভূমিকা অনেকখানি।

আমি ভরসার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। সমাজে অবদান, সামাজিক আন্দোলনে তাঁর অবাধ পদচারনা, নারী শিক্ষা বিস্তারে প্রশংসনীয় ভূমিকা শরতের আকাশে মেঘে মেঘে চুপি চুপি ভালবাসার কথা কয়। বিশুদ্ধ বাতাসে, ভেজা ভেজা কন্ঠে নূপুর নিক্কণে। আমাদের গ্রামে-শহরে। অতি অসহায় মানুষের একাত্বতায় সুখে এবং দুঃখে। রোদ্দুরে কিংবা ধুমগড়ের সুশীতল ছায়ায় উত্তরাঞ্চল জুড়ে এক উঠোন ভালবাসায়। বার্ধক্যে উপনীত রহিম ভরসার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে প্রার্থনা কামনা করছি কালি কলম এর কবিকাব্যে।

আপনার মতামত লিখুনঃ