দেশ এগুচ্ছে, সমাজ কি এগুচ্ছে?

অজয় দাশগুপ্ত :

দেশ এগুচ্ছে। সমাজ কি এগুচ্ছে সেভাবে? মানুষকে জাগানোর কাজ করা রাজনীতি আজ নিস্তব্ধ। যে যাই বলুক না কেন মূলত স্থবির। এই অচলায়তন কবে ভাঙবে, কারা ভাঙতে পারবে বলা কঠিন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে দোষারোপ করার ভেতর আত্মতুষ্টি থাকলেও সমাধান নেই। কারণ বিএনপিসহ বাকি দলগুলো মূলত দিশাহারা। তারা উন্নয়নের সঙ্গে চলতে চায় না। এর কারণ দলাদলি আর দেশ শাসনে আসার আগ্রহ কিছু না।

বরং এর নেপথ্য কারণ মূলত বেদনার। এখনো দেশে সর্বজনীন কোনো মনোভাব গড়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু স্বমূর্তিতে বেরিয়ে এলেও তাকে মান্য করার বিষয়ে বিরোধী রাজনীতি ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ। দেশের ইতিহাস বিষয়ে বিভ্রান্তিও কাটেনি। কেউ কেউ এখনো মুক্তিযুদ্ধের মতো মহতী বিষয়কেও তর্কময় করে রেখেছে। যা রীতিমতো দেশবিরোধী। এসবের ডামাডোলে সমাজ আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এখন?

সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ কিছু না। আগেই বলেছি সবাই জানেন সব মানুষই এখন একেকটি মিডিয়া। তাদের হাতের মোবাইল ফোনটি তাদের দিয়েছে অনেক কিছু। কেবল বিনোদন বা জোশ নয়, এর ভেতরে আছে সমাজ ও সামাজিক বিষয়।

যে কারণে সমাজের অনেক জটিল বিষয় প্রথমেই চলে আসে সামাজিক মিডিয়ায়। সেখানে এখন কী দেখি আমরা? সম্প্রতি আলীকদম উপজেলার চেয়ারম্যানের যে ছবিটি আলোড়ন তুলেছে তা নিয়ে বলতে চাই। যে আদিবাসী তরুণীদের তিনি জড়িয়ে ধরে আছেন তাদের চেহারা, তাদের মুখ ও চোখই তো বলে দেয় তারা আসলে কেমন বোধ করছিল। এটা বুঝিবে বলার দরকার পড়ে না সে আলিঙ্গন ছিল কামনা আর লালসার। যে কারণে আদিবাসী মেয়েটির চেহারায় ভয় আর শঙ্কা প্রকাশ্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি বিচ্ছিন্ন কিছু? না এই চেয়ারম্যান নতুন কেউ? আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন তো একে আপনি চেনেন না? সমাজের সব জায়গায়, সব পদে এমন কিছু লোলুপ মানুষ আজ বড় বড় পদে আসীন। যেটা বিস্ময়ের তা হলো এরা নাকি জনপ্রতিনিধি। যেভাবেই হোক এরা ভোটে জিতে যায়।

যেমন জিতে যায় ইয়াবা ব্যবসায়ী। আজ পরিবেশ এতটাই জঘন্য যে ইয়াবা বদিকে সরে যেতে হলেও তার পতœী চলে আসে লাইম লাইটে। ভোট তো এখন প্রহসনের মতো। হলেও কেউ জেতে, না হলেও কেউ জেতে। এই প্রহসন যদি থামানো না যায় তা হলে ভবিষ্যতে লালসার শিকার ধর্ষকরা আর কোন কোন পদে চলে আসে, সেটাই ভয়ের ব্যাপার। বলছিলাম আলীকদমের চেয়ারম্যানের কথা। এই লোকটা রাখঢাক করেনি।

প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে সম্মান জানানোর জন্য ফুলের মালা নিয়ে আসা তরুণীদের বুকে চেপে হাত ধরে অপমান করেছে এই লোক। সহজেই অনুমান করা যায় এই স্পর্ধা, এই ভয়হীন বেপরোয়া মনোভাব কোথা থেকে আসে। এই লোকটি খুব ভালো করেই জানে তার কিছুই হবে না। কারণ? এ দেশ যতই এগোক না কেন এখানে ধর্ষণের বিচার সুদূরপরাহত। সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকা- বছরের পর বছর থেকে যায় অমীমাংসিত।

তাদের শিশুপুত্র মেঘ বালক হয়ে উঠলেও তার বুক থেকে রহস্যের মেঘ সরায় না কেউ। এই জীবন বা এই চলমানতা যে অরাজকতা তৈরি করে তার নাম কি উন্নতি? না অবনতি?

এসব বলাও বারণ এখন। কারণ সরকারি দলে ঢুকে পড়া স্তাবক আর চামচারা সত্যকে ভয় পায়। তাদের স্বার্থহানি আর খাই খাই ভাব বন্ধ হওয়ার ভয়ে তারা বগলের তলায় সূর্য রেখে দিনকে রাত বানাতে ব্যস্ত। আমরা একশ পার্সেন্ট নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব চান না। তিনি নারীবান্ধব সরকারের রোল মডেল। তার আমলে নারী নির্যাতন মানা কষ্টকর হলেও সমানে চলছে তা। আদিবাসী তরুণীদের বিষয় আরো জটিল।

তারা নির্যাতিত হোক আর গায়েব হোক তাতে সমতলে খুব একটা প্রভাব পড়ে না। সমতলের মানুষদের সঙ্গে দুস্তর ব্যবধান তাদের। তারা যে চেয়ারম্যানকে ফুলের মালা দিতে গিয়েছিল সেটাও কতটা আনন্দে আর কতটা ভয়ে তা সবার জানা আছে। না গেলে, গলায় মালা না পরালে হয়তো থাকাই দায় হয়ে যাবে তাদের।

এই যে সামাজিক মিডিয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এ জন্য চেয়ারম্যানের যদি কোনো লোকসান ঘটে তারা ছেড়ে কথা বলবে? আপনি আমি ক’দিন বুদবুদ তুলে সাজা চাই সাজা চাই বলে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করে এসব ভুলে যাব। এসব হতভাগ্য তরুণীকে সেখানে থাকতে হবে। হয়তো এর চেয়ে বেশি আলিঙ্গন বা নির্যাতনে তুষ্ট করাই হবে তাদের নিয়তি। কপাল খারাপ হলে মারা পড়াও বিচিত্র কিছু না। এই হলো সমাজের চালচিত্র।

আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগুলেও সামাজিকভাবে ক্রমেই দুর্বল আর ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। যার একদিকে ধর্মের নামে উল্লাস আরেকদিকে নানা ধরনের অনাচার। একজন সমাজপতি কিংবা চেয়ারম্যান আগে কখনো এমন সব কাজ করতেন না। সে আমলেও মানুষের লোভ-লালসা-যৌনতা ছিল।

কিন্তু সবার ওপরে থাকত চোখের লজ্জা আর শরমবোধ। সেটাই খসে পড়ছে। গন্ডগ্রাম পাহাড়ের শান্ত জনপদেও এখন লোলুপ হায়নাই সমাজপতি। তার পেছনে নিশ্চয়ই রাজনৈতিক দলের বেকিং আছে। তারা কি পারবে এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিতে? পারবে কি এই লোককে বরখাস্ত করতে? পারলেও সেটা প্রয়োগযোগ্য কিনা তার ব্যাপারে দ্বিধা-সংশয় থেকে যাবে। হঠাৎ করে বিগত একদশকে নারী একদিকে যেমন সস্তা আরেকদিকে লোভের বস্তু বলে মনে করা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী স্বনামধন্য কর্তা-ব্যক্তি কেউ বাদ নেই। সবার দুটো বিষয়ে সমান আগ্রহ। টাকা আর নারী। সে খায়েশ আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে যেখানে একজন জনপ্রতিনিধি হায়া-শরম ভুলে এমন করে মেয়েদের জড়িয়ে ধরতেও পিছপা হয় না। এই সামাজিক ভ্রান্তি যে কতটা গভীর রোগ আর ভয়ঙ্কর বিপদ তা সমাজ বিজ্ঞানীরাই ভালো বলতে পারবেন।

কী শিখছে আমাদের তারুণ্য? কী জানছে এ দেশের নবীন প্রজন্ম? শুধু দেশ না আজ বিদেশেও এসব ছবি আর কেচ্ছা পৌঁছে যায় এক মিনিটে। যে কারণে আন্তর্জাতিকভাবেই হেয় করে তুলছি নিজেদের। বিষয়টা সরল, আগে ন্যূনতম রুচিবোধ জ্ঞান আর ভালো মানুষের ভদ্রতা বোধ না থাকলে তাদের মানুষ ভোট দেয়া দূরে থাক কাছেও ঘেঁষতে দিত না। টাকা আর সন্ত্রাসের দাপট সেসব ব্যবধান কেড়ে নিয়েছে।

এখন যে যত বড় শয়তান সে তত বড় পদে আসীন। তার তত গর্জন। মানুষ গিনিপিগের মতো এদের পায়ের তলায় চুপচাপ জীবনযাপন করেই খুশি। আলীকদমের চেয়ারম্যান তার এক নির্লজ্জ উদাহরণ। জানি না এ ঘটনা কোথায় কতটা সাড়া ফেলবে। একে আদিবাসী তাও আবার কোনো এক পাহাড়ের কোণায়। ফলে মনে হয় না এ নিয়ে খুব একটা কিছু হবে। যদিও দুয়েকটি টিভি মিডিয়া সাহসের সঙ্গে তা সামনে নিয়ে আসছে।

যদি এর প্রতিকার ও মেয়েগুলোর ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা না যায় মনে রাখতে হবে আপদ ঘরে ঢুকল বলে। সেদিন নিজের মেয়ের বেলায়ও ঘটনা ঘটলে অবাক হবেন না। বলছিলাম দেশের উন্নতি আর সমাজের উন্নতির কথা। সমাজ এখনো সে তিমিরে। যেখানে মানুষ অসহায় নারীরা অন্যায় আলিঙ্গনে ভীত। এই নাগপাশ থেকে মুক্ত করার রাজনীতি নিজেই অর্ধমৃত। বাকি শুধু মানুষ। হে মানুষ তুমি কি কিছু শুনছ, কিছু দেখতে পাচ্ছ আদৌ?

অজয় দাশগুপ্ত: কলাম লেখক।