দেশে উৎপাদিত দুধে কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই: কৃষিমন্ত্রী

দেশে উৎপাদিত দুধে কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই: কৃষিমন্ত্রী

দেশে উৎপাদিত পাস্তুরিত-অপাস্তুরিত দুধের মধ্যে লিড, ক্রোমিয়াম কিংবা সালফা ড্রাগের মতো ভারী কোনও ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, এসব দুধে কোনও স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই।

তিনি বলেন, মোট ১৬টি নমুনার মধ্যে মিল্কভিটায় সহনীয় মাত্রায় ১০ মাইক্রোগ্রামের নিচে স্ট্রেপ্টোমাইসিন ও প্রাণের দুধে সহনীয় মাত্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৬ মাইক্রোগ্রাম ক্লোরামফেনিকল পাওয়া গেছে। অন্য কোনও দুধেই অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

ভারতের চেন্নাইয়ের আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন এসজিএস (এক্রিডিটেট ) ল্যাবরেটরি থেকে দুধের নমুনা পরীক্ষা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুধ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক, সালফা ড্রাগ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি বিশ্লেষণ ফলাফল প্রকাশ করে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পুষ্টি ইউনিটের এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কৃষিমন্ত্রী।

এর আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্রাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পাওয়ার কথা বলা হয়। গত ২০ জুলাই পাস্তুরিত দুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে দুধের মান বাড়াতে পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম ফারুক।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, গবেষণালদ্ধ ফল বিশ্লেষণে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত দুধে কোনও প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নেই। তিনি বলেন, জনমনে অস্থিরতা দূর করতে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক, সালফা ড্রাগের মতো ভারী ধাতুর অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য পুষ্টি ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল উদ্যোগ নেয়।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মিল্কভিটা, আড়ং, ফার্ম ফ্রেস, ইগলু, আরডি, সাভার ডেইরি, প্রাণ দুধ ও অপাস্তুরিত দুধের ১৬টি নমুনা সংগ্রহ করে তাতে কোনও প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়। বাজারজাত করা প্রাস্তুরিত দুধ রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, গুলশান ও ফার্মগেট এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অপ্রাস্তুরিত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় সাভারের রাজাসন খামারিদের কাছ থেকে।

মিল্কভিটায় সহনীয় মাত্রায় ১০ মাইক্রোগ্রামের নিচে স্ট্রেপ্টোমাইসিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, স্টেপ্টোমাইসনের সহনীয় মাত্রা প্রতি কেজিতে ২০০ মাইক্রোগ্রাম। আর প্রাণ কোম্পানির প্রাণ দুধে শূন্য দশমিক শূন্য ৬ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে।

দুধের ক্ষেত্রে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর প্রকার কিছু মাত্রা পাওয়া যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্লেষণ করা নমুনায় কোনও প্রকার অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।খাদ্য বিষয়ক যে কোনও ধরনের আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা ও ফল প্রাপ্তির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানসম্পন্ন এক্রিডিটেট ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি বলেও কৃষিমন্ত্রী মনে করেন।

মিল্ক ভিটা, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, ইগলু, আরডি, সাভার ডেইরি ও প্রাণ এবং অপাস্তুরিত (কাঁচা তরল দুধ) দুধের ১৬টি নমুনা সংগ্রহ করে ভারতের চেন্নাইয়ের এসজিএস গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয় বলে জানান কৃষিমন্ত্রী। আবদুর রাজ্জাকের উপস্থিতিতে বিএআরসির পুষ্টি ইউনিটের পরিচালক ড. মো. মনিরুল ইসলাম গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন।

তিনি বলেন, পাস্তরিত ও অপাস্তরিত দুধে কোনো প্রকার ভারী ধাতু ও সালফা ড্রাগ পাওয়া যায়নি। দেশে উৎপাদিত দুধে কোনো প্রকার স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই। এ নিয়ে উদ্বেগ বা কোনো উৎকণ্ঠা নেই। মনিরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে পাস্তুরিত ও কাঁচা তরল দুধের নমুনা সংগ্রহ করে স্থানীয় কয়েকটি ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করে।

পরবর্তীতে এসব রিপোর্ট হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। খাদ্যপণ্যের গুণগত মান বিশ্লেষণে আমাদের দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো ল্যাবরেটরি নেই জানিয়ে মনিরুল বলেন, স্থানীয় এসব গবেষণাগারের বিশ্লেষণ সক্ষমতা বা মান কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা প্রশ্নবিদ্ধ।

কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এক শ্রেণির সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা কোন প্রকার বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত বা কোন প্রকার মান সম্পন্ন গবেষণা ফলাফল ছাড়াই অনেকটা দায়সারা রিপোর্ট তৈরি করে ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন পণ্যের মান নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে চলেছে।

বিগত বছরগুলোতেও এসব তথাকথিত শ্রেণির লোকেরা ফল, সবজি, মাছসহ খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন প্রয়োগ করা হয় বলে ব্যাপকভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে; ফলে মানুষ শুধু ফল খাওয়াই ছেড়ে দেয়নি, এতে আর্থিক ক্ষতিসহ বৈদেশিক বাজারেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে এবং হচ্ছে।

জনমনের অস্থিরতা দূরীকরণে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক, সালফা ড্রাগ ও ভারী ধাতুর অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য বিএআরসি দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বাজারজাতকৃত পাস্তুরিত দুধসহ কাঁচা তরল দুধ সংগ্রহ করে। এসব নমুনায় কোনো প্রকার অ্যান্টিয়োটিক, সালফা ড্রাগ ও ভারী ধাতুর রেসিডিউ/অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। ঢাকার মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, গুলশান ও ফার্মগেট এলাকা থেকে পাস্তুরিত দুধ এবং অপাস্তুরিত দুধের নমুনা সাভারের রাজাসনের খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়।

প্রতিটি পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধের নমুনা সরাসরি বিশ্লেষণসহ একই সঙ্গে এসব দুধের প্রতিটি নমুনা নয় মিনিট সিদ্ধ করে অ্যান্টিবায়োটিক, সালফা ড্রাগ ও ভারী ধাতুর অবশিষ্টংশের উপস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণ ফলাফলে পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে কোনো প্রকার ভারী ধাতু যেমন- লিড ও ক্রোমিয়ামের রেসিডিউ (অবশিষ্টাংশ) পাওয়া যায়নি।

ফলাফলে পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে কোনো প্রকার সালফা ড্রাগের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। মোট ১৬টি নমুনায় মধ্যে শুধু একটি নমুনায় (মিল্কভিটা) অ্যান্টিবায়োটিক স্ট্রেপটোমাইসিন এর উপস্থিতি প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রামের নিচে পাওয়া গেছে; তবে তা মানবদেহের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রার অনেক নিচে (সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ২০০/মাইক্রোগ্রাম/কেজি)।

প্রাণের একটি নমুনায় ক্লোরাফেনিকলের উপস্থিতি প্রতি কেজিতে ০.০৬ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে, দুধের ক্ষেত্রে এটির কোনো নির্ধারিত মাত্রা পাওয়া যায়নি, তবে কারও কারও মতে ০.১ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। এছাড়া বিশ্লেষণ করা (১০টি) নমুনায় অন্য কোনো প্রকার অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি বা অবশিষ্টাংশের অস্তিত্ব মেলেনি।

মনিরুল ইসলাম বলেন, গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণে নিশ্চিতভাবে বলা যায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত বাজারজাত করা দুধ পানে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। তিনি বলেন, খাদ্য বিষয়ক যে কোনো ধরনের আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা এবং একদল প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল তৈরি জরুরি।

আপনার মতামত লিখুনঃ