তসলিমা তোমাকে

তসলিমা তোমাকে
বাঁয়ে তসলিমা নাসরীন, ডানে ডানা ইশরাত

ডানা ইশরাত : বহুদিন পর আবার তোমার লেখা পড়লাম। পুরুষদের ঘৃণা করো তুমি। কিন্তু কেন? এত যে লিখেছ, সবার আগে কি নিজের দিকে তাকিয়েছ? নিজেকে জিজ্ঞেস করেছ, কোত্থেকে এসেছে ওরা? কেন লেখনি, ওদের কেমন শিক্ষা দিয়েছে সেসব জন্মদাত্রীরা? কেন পুরুষ জাতটাকে বিচার করার আগে নিজের জাতের বিচারে বসোনি?

সমঅধিকার চেয়েছ। তাহলে সংখ্যালঘুর মতো আবার কোটা কেন চাও? অস্তিত্বের লড়াইয়ের ময়দানে যোগ্যতা দিয়ে না টিকে সুবিধাবাদীর মতো প্রিভিলেজ কেন চাও? তাহলে আর কিসের সমানে সমানে লড়াই? সবটাই তো নিজের সাথে নিজের প্রহসন। কেন এরকম আমরা? কোত্থেকে পেয়েছি এই নীচতা? প্রশ্ন করেছ কি নিজেকে কখনো? কোত্থেকে শিখেছি এসব?

আমার মায়েরা রোজা না রাখলে না খেয়ে থাকার ট্রেনিং দিয়েছে। কিন্তু আমাদের ফিলিস্তিনের জন্য লড়তে শেখায়নি। যে নামাজ পড়ে না, বা বিধর্মী, তাকে অপছন্দ করতে শিখিয়েছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী, গডফাদার, কোনো অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক ব্যবসায়ী বা নারী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখায়নি। কেউ উত্যক্ত করলে নীরবে মুখ ফিরিয়ে নিতে শিখিয়েছে। কিন্তু কোনো ঘুষখোর, সুদখোর বা অসৎ ব্যবসায়ীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শেখায়নি।

আমার মায়েরা আমাদের একাত্ম হতে শেখায়নি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়নি, সবাইকে নিয়ে এক সাথে একই পরিবারে বাস করতে শেখায়নি। আমার মায়েরা আমাদের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে লড়াই করে জিততে শেখায়নি। আমার মায়েরা আমাদের ধর্ম এবং শিক্ষার যথার্থতা শেখায়নি।

আমরা পরিবার থেকে আলাদা হতে শিখেছি, অসহায় এবং নিরীহ দেখানোর ছলচাতুরি শিখেছি, লোকের সাথে পাল্লা দিয়ে লোক দেখানো শিখেছি, হিংসায় জ্বলেপুড়ে খুশি হওয়ার অভিনয় শিখেছি, অযোগ্য হয়েও কৌশলে বহুকিছু ছিনিয়ে নিতে শিখেছি। নিজে একটা মেয়ে হয়েও ভণিতা করে অন্য একটা মেয়েকে বদনাম করতে, কূটকচালি করতে এবং সর্বনাশ করতে শিখেছি। সব আমার মায়েদের কৃপা।

মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষা এবং মূল শিক্ষা পরিবার থেকে আসে। আমার মায়েদের কাছ থেকে আমরা বৃদ্ধাশ্রম শিখেছি, একা হতে শিখেছি, একা সংসার করতে, একা বড় হতে শিখেছি। এবং একা একা বিপদে পড়লে মায়েদের অযোগ্যতা আর বদনাম ঢাকার জন্য একা একা মেরুদণ্ডহীন বিবেকহীন সুবিধাবাদী ভীতু হয়ে মুখ ঢাকতে শিখেছি।

আমার মায়েরা আমাদের শিখিয়েছে ধর্মের নামে মুখে কড়া করে মেকাপ দিয়ে সঙ সেজে শরীরের সাথে আঁটো কাপড় পরে শুধু চুলটুকু হিজাবে ঢাকার ফ্যাশন।

ফেসবুকে রঙবেরঙের ফেস দেখিয়ে বডিফিটিং পর্দায় থাকার ফ্যাশন। বছরজুড়ে ইবাদত বা নামাজ নয়, বরং লোক দেখিয়ে রোজার নামে ডায়েটিং করে ওজন কমানোর ট্রিক। শিখেছি ধর্মের নামে মানুষকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির টেকনিক।

আমার মায়েরা শিখিয়েছে শুধু নিজেকে নিয়ে বাঁচতে, দুনিয়া জাহান্নামে যাক, শুধু নিজের স্বার্থটুকু দেখতে। আমার মায়েরা শিখিয়েছে, সংসারে বিপুল টাকার উৎস যতই অসৎ হোক না কেন, সবটাই আমাদের।

আমাদের আরাম-আয়েশ, ভোগ বিলাসের জন্য। এটাই নিয়ম। এটাই ন্যায়। এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়। কোনো মন্তব্য নয়। আমার মায়েরা শিখিয়েছে ধনী এবং ক্ষমতাবানদের মতো হতে, হোক চোর ছ্যাচ্চোর বাটপার ঠগ মাফিয়া, তবু তাদের তেল দিয়ে চলতে।

আমার মায়েরা শিখিয়েছে স্বামীর ঘাড়ে পাড়া দিয়ে বা স্বামীর অপকর্মের উপযুক্ত সঙ্গিনী হয়ে বাড়ি, গাড়ি, অঢেল অর্থ-সম্পদ এবং স্ট্যাটাস মেইনটেইন করতে এবং তারপর সন্তানদের সেসবের উপযুক্ত উত্তরাধিকারী তৈরি করে হজ্ব করে পাপ ধুয়ে নিষ্পাপ হতে। ফ্যামিলি ট্রেন্ড হয়ে গেছে এখন।

তসলিমা, আমার মায়েদের খুন, ধর্ষণ এবং যুদ্ধের বিভীষিকায় পড়তে হয়নি। তাই মুফতে পায়ের তলায় যে মাটিটা পেয়েছি, সেখানে সহমর্মিতা সহনশীলতার বা ন্যায়নীতি ফলানোর ঠ্যাকা তাদের নেই।

আমার মায়েরা এরপরেও অতি ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পেরেছেন। কিন্তু শহীদ জননী জাহানারা ইমামরা পারেননি। তাই মুক্তিযুদ্ধের পর এই মাটিতে আর কোনো বীর সন্তান জন্মায়নি।

আমার এহেন মায়েরা নিজেদের ভেতর এত নোংরামি নিয়ে পুরুষ সন্তান বা সন্তান তুল্য পুরুষদের কোন ভালোটাই বা শেখান? তাদের দিকে আঙুল তোলেন কোন লজ্জায়? এ ব্যর্থতা তো তাদেরই। তবু তারা ছোট হতে চান না। তাই তারা স্বীকার করেন না। এতে বেজন্মাগুলোর বড় সুবিধা হয়। এই সুযোগটাই বেজন্মাগুলো কাজে লাগিয়ে মানুষ খুন করে, বোমাবাজি করে, ধর্ষণ করে, সন্ত্রাস করে।

তসলিমা, এখন তো আমার মায়েরা আরো বহুধাপ এগিয়ে। মক্ষীরানী, ইয়াবা সুন্দরী, মাদক সম্রাজ্ঞী, অস্ত্রের রানী, চোরাচালানি, পরকীয়া প্রেয়সী বা হিংস্র খুনী সবটাতেই বোরকার আড়ালে বা রাতের অন্ধকারে এগিয়ে। যে নারীজাতের মধ্যে এত নীচতা, ভণিতা আর ইতরামি তাদের কি করে সম্মান করবে ওরা!

তাই পুরুষদের নয়, বরং নিজের জাতের বিচার করো। আমি নারী হয়ে বলছি, আমাদের নিয়ে লেখো। আমাদের ভণ্ডামি, ভণিতা, ছলনা, চাতুর্য আর নোংরামির এনাটমি করো। তারপর না হয় পুরুষদের আক্রমণ কোরো।

আর, ধর্মকে দোষ দিও না। যে পিশাচগুলো ধর্মকে ঢাল বানিয়ে এইসব মূর্খদের চোখে পট্টি পরিয়ে অধর্ম করে যাচ্ছে, তুমি তাদের কথা বলো। ওরা থাকলে সমগ্র পৃথিবী ইসলামে ঢেকে দিলেও সমাধান নেই, সহস্রকোটি বোরকাতেও কোনো নিরাপত্তা নেই।

ঐ মূর্খ আর পিশাচের দলে আমরাও যে আছি। তুমি সেই আমাদের কথা বলো। যেদিন আমাদের নিজেদের নিয়ে তুমি সুন্দরভাবে লিখতে পারবে, সেদিন এই আমি তোমাকে ভালোবাসবো।

আপনার মতামত লিখুনঃ