তবুও কেন অপরাধের মাত্রা ক্রমবর্ধমান

রণেশ মৈত্র :

বয়সটা আমার ৮৮ ছুঁই ছুঁই। বাংলাদেশের নয় শুধু, সমগ্র পৃথিবীরই সব মহাদেশের সব দেশেরই সর্বোচ্চ গড় আয়ু যা, তা আমার বর্তমান বয়সের অনেক নিচে। সে অর্থে যারা সর্বাপেক্ষা বেশিদিন বেঁচেছিলেন বা সর্বোচ্চ বেশিদিন বেঁচে আছেন সমগ্র পৃথিবীতে তাদের কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়।

এটি আমার এক সৌভাগ্য এবং অতিশয় আনন্দের ব্যাপার বটে। শুধু আমার নিজের নয়, আমার পরিবারের সব সদস্য, সব আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত-অপরিচিত সব শুভাকাক্সক্ষীর জন্যই তা আনন্দের। আরো বেশি আনন্দের এ কারণে যে, আমি এখনো লাঠির ভর ছাড়াই হাঁটাচলা করতে পারি, বাজার-ঘাট করতে পারি, মানুষের জন্য কথাবার্তা, আদান-প্রদান করতে পারি, মঞ্চে দাঁড়িয়ে অল্প-স্বল্প বক্তৃতাও করতে পারি আর পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টাব্যাপী লিখতে। যা আমার বয়সী পাবনাতে আর যারা বেঁচে আছেন তারা অনেকে পারেন না।

সেই ১৯৩৩ সালে ইংরেজ আমলে জন্ম। সেই সূত্রে অর্থাৎ জন্মসূত্রে আমি অবিভক্ত ভারত বর্ষের নাগরিক। অতঃপর এল পাকিস্তান। যে মাটিতে জন্মেছিলাম তা পাকিস্তানের ভাগে পড়ায় জন্মসূত্রে আপনা-আপনি পাকিস্তানের নাগরিকও।

১৯৭১-এ পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশেরও জন্মসূত্রে নাগরিক বনে গেলাম। দুই দফায় নাগরিকত্ব ত্যাগ বা গ্রহণের জন্য কারো কাছে কোনো দরখাস্ত করতে হয়নি। মোদ্দা কথা, এই আটটি দশক ধরে তিন তিনটি দেশ, তিনটি দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, মানুষের আচার-আচরণ, সমাজ ও অর্থনীতিতে ঘটে যাওয়া সব পরিবর্তনকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ ঘটেছে। আর দেখার অভিজ্ঞতাগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করাই বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য।

শৈশবে স্পষ্ট না বুঝতে পারলেও আমাদের গ্রাম ভুলবাড়ীয়া (পাবনা জেলার তৎকালীন সাঁথিয়া থানাধীন) গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুল ব্যতিরেকে ৩-৪ বর্গমাইল এলাকার কোনো গ্রামেই কোনো প্রাইমারি স্কুলের অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। তাই আশপাশের সব গ্রাম থেকেই শিক্ষার্থী শিশুরা (তখন প্রাইমারি স্কুলগুলোতে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো) ভুলবাড়ীয়ার প্রাইমারি স্কুলেই পড়তে আসত, আশপাশে গ্রামগুলো থেকে পড়তে আশা শিশুদের সংখ্যাও বেশি ছিল না।

শিশু, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি মিলে সাকুল্যে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ ছেলেমেয়েকে। কিন্তু বলা হতো ভুলবাড়ীয়া প্রাইমারি স্কুলেই গোটা থানার মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু স্কুলটিতে শিক্ষক ছিলেন মাত্র দুজন। পাঁচটি ক্লাসে তারাই পড়াতেন। কারো অসুখ-বিসুখ হলে একজন সুস্থ শিক্ষকই সব ক্লাসে পড়াতেন। অসুস্থ শিক্ষকের অনুপস্থিতির সুযোগে ক্লাসগুলোকে ছুটি দেয়ার রেওয়াজ ছিল না।

কোনো শিক্ষকই না পড়ানোর কোনো অজুহাত একদিনের জন্যও খুঁজতেন না। তারা ভাবতেন, শিক্ষাদানই তাদের ব্রত, ধ্যান, জ্ঞান। তাই তাতে বিরতির সুযোগ নেই। তা হলে তখনকার মারাত্মকভাবে শিক্ষার সুযোগ নিয়ে যে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষকতাকে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিতেন শিক্ষক স্বল্পতার সুবাদে ফাঁকি দেয়ার অবাধ এবং অজগ্র সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করার বিন্দুমাত্র মানসিকতা তাদের দেখিনি।

আবার পাঠদানের মানও ছিল উচ্চ এবং নিষ্ঠার কারণেই তারা তা করতে পারতেন-করতেন গভীর মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে। পাঠ্য বইগুলোর মানও ছিল উঁচু। সরকার তখন বিনামূল্যে বই সরবরাহ করত না। কিন্তু কম করে হলেও অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের বই, খাতা-পেন্সিলসহ তাবৎ উপকরণ কিনে দিতেন, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া।

এত কিছু সত্ত্বেও কোনো কোচিং সেন্টার কোনো পর্যায়েই তখন দেখিনি। অর্ধ-বার্ষিক, বার্ষিক এবং বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষার তিন মাস আগে থেকেই শিক্ষকরা স্কুলের সব ছাত্রছাত্রীকেই স্কুলের অভ্যন্তরেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ওই স্কুল ঘরেই কোচিং করাতেন। তার জন্য বাড়তি কোনো টাকা অভিভাবকদের গুনতে হতো না।

আবার অতিশয় ভালো ছাত্রছাত্রী হলে তাদের নিজ বাড়িতে বা ছাত্রছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে কিছুকাল পড়িয়ে আসতেন অবসর মুহূর্তে। তার জন্য বিত্তবান অভিভাবকরাই শুধু টাকা দিতেন মাসে মাসে, অন্যরা নন। আর এটা শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের কথা নয়, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করত। লেখাপড়ার মান ছিল উঁচু। জনপ্রতিনিধি, সরকারি উচ্চ ও নিম্ন কর্মকর্তারাও শিক্ষকদের প্রতি অনুরূপ সম্মান প্রদর্শন করতেন। অর্থাৎ সমাজে সর্বোচ্চ সম্মান শিক্ষকরাই পেতেন।

কিন্তু এখন? শিক্ষকদের বড় অংশই সে সম্মান আর পান না। বলতে শুনেছি শিক্ষকের মর্যাদা না দেয়ার সমাজটা দিন দিন গোল্লায় যাচ্ছে। বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সত্য। তবে এ আলোচনায় পরে আসছি। বস্তুতই সব কিছু জীবনভর দেখেশুনে আজ বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না যে, আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ বস্তুতই ‘সব সম্ভবের দেশ’-এ পরিণতও হয়েছে। আগের যুগেও কখনো যখন এই কথা শুনেছি তবে একটি প্রবাদ বাক্য হিসেবে। কিন্তু তা ছিল কথার কথা মাত্র।

তখন শিক্ষকদের বেতন ছিল অত্যন্ত নগণ্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তা ছিল নামমাত্র। কিন্তু তবু তারা সবাই পড়াতেন, গভীর আন্তরিকতা ও দায়িত্ব বোধ নিয়েই ক্লাসরুমেই পাঠদান করতেন- দেশে একটিও কোচিং সেন্টার ছিল না- কোনো ছাত্রছাত্রীই বা কোনো অভিভাবকই তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে না- শিক্ষকদের তো প্রশ্ন উঠে না।

নৈতিকতার মান কত উঁচুতে থাকলে তা সম্ভব হয় আজ তা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। নৈতিকতার অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নারীর সম্ভ্রম রক্ষার ক্ষেত্রে। তখনকার দিনে ছেলেদের-মেয়েদের পৃথক পৃথক স্কুল-কলেজ যেমন থাকত তেমনই সেগুলোতে সহশিক্ষার ব্যবস্থাও থাকত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্ক ছিল ভাইবোনের মতো।

দু-একটি ক্ষেত্রে যে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠত না তা নয়, কিন্তু সে সম্পর্ক যৌন সম্পর্ক পর্যন্ত গড়াত না। আজ যৌনতা একটি ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ইদানীংকালের ঘটনাগুলো সর্বাধিক ভয়াবহ। মাদ্রাসাগুলো আরো ভয়াবহ।

বোরকা-হেজাবেও ঠেকে না বরং তাকে আবরণ হিসেবে দেখিয়ে কুকর্ম আরো বেশি করা হয় বলে দিব্যি অভিযোগ। দ্রুতই সমাজ একে প্রতিরোধে এগিয়ে না এলে সমাজ সভ্যতা ধ্বংসের দিকে নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে যাবে। আইন-আদালত এ ব্যাপারে সর্বাধিক এগিয়ে না এলে সমাজ ও স্থবিরতামুক্ত হবে এমনটা অন্তত এ মুহূর্তে ভাবা যাচ্ছে না।

বেতন বেড়েছে সবারই। কি সরকারি, কি বেসরকারি। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে। সামান্য একটি পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগেও লাখ লাখ টাকা ঘুষের কাহিনী সবারই জানা। থানার মামলা নিতে টাকা, চার্জশিট দিতে টাকা, না দিতেও টাকা। কী ভয়াবহ ব্যাপার।

বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাও আর এক দুর্নীতি। আর বিচার বিলম্বিত হওয়ার ফলে যৌন সংক্রান্তসহ সব অপরাধই বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘুষ, দুর্নীতি, যৌনতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে যেন। আর এই ঘুষ নিম্ন পর্যায়ে থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত একটা চেইয়ের মতো প্রসারিত হয়েছে যেন।

ইদানীংকালে ব্যাংক খাতের দুর্নীতিও ভয়াবহ রূপ পেয়েছে। হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সমাজের ধনিকগোষ্ঠী সেই টাকা দিব্যি বিদেশি ব্যাংকে জমা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে ফতুর করে দিচ্ছে। এরা সবাই সমাজের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও সম্মানিত। চিহ্নিত হলেও এই ঋণখেলাপি নামক অর্থনীতি ধ্বংসকারী অপরাধীরা যেন আইন-আদালতের ঊর্ধ্বে।

রাষ্ট্রীয় মদদেরও অভাব নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের সুরক্ষা দিয়ে চলেছে- সামান্য কিছু জমা দিয়ে বৃহদাকার লোন যাতে তারা পান তার জন্য তারা আইনও প্রণয়ন করে ছেড়েছেন। কিন্তু গরিব কৃষকদের হাতে হাতকড়ি, সামান্য লোন নিয়ে যৌক্তিক কারণে তা পরিশোধে সক্ষম না হওয়ার কারণে। শ্রমিকদের জন্য লোনের কোনো ব্যবস্থাই নেই অথচ এই কৃষক শ্রমিকরাই জমিতে ও কলকারখানার ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে বহুমাত্রিক।

উৎপাদন করে দেশকে বাঁচিয়ে রাখছেন, যেটুকু অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হচ্ছে তাও তাদেরই কল্যাণে। অথচ সরকার ক্রেডিট নিচ্ছে ওই অর্থনৈতিক উন্নয়নের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে। এ ক্রেডিট তাদের নয় ক্রেডিটের পুরোটাই হতদরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের প্রাপ্য।

বিশাল বিশাল বহুতলবিশিষ্ট দালানকোঠা গড়ে তুলছেন মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণি, তারাই গড়ে তুলছেন চোখ ধাঁধানো ব্যবসা-বিপণি। তা দেখেও ক্রেডিটা সরকার নিচ্ছেন, উন্নয়নের জোয়ার দেখছেন তাতেও। আর শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ যে দারিদ্র্যে ভুগছেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য যে আকাশচুম্বী হয়ে উঠে সব নৈতিকতার অবসান ঘটাচ্ছে তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যাবে না কোথাও।

যাদের কারণে এমনটি ঘটছে তারা কিন্তু ‘উচ্চ শিক্ষিত’ ও ‘সম্মানিত’ এবং সে কারণে আইনের হাত তাদের প্রতি সম্প্রসারিত হয় না। সংবিধান বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের নিশ্চয়তা দিলেও রাষ্ট্র বিপরীতমুখী, আইন-আদালতও তাই।

নিবন্ধটির ব্যাপ্তি আর বাড়িয়ে লাভ নেই। আজকের শিক্ষিত সমাজের অপরাধের ব্যাপকতা যে ভয়াবহ এবং তার জন্য দায়ী যে তথাকথিত সমাজ তার প্রতিই জোর দিতে চাই। মন্ত্রীরা শিক্ষিত, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শিক্ষিত, শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিক্ষিত, ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ যারা দেন তারা শিক্ষিত- যারা নেন তারাও শিক্ষিত।

তবুও কেন অপরাধের মাত্রা ক্রমবর্ধমান? শিক্ষা তবে কী শেখাচ্ছে? না, শিক্ষার বিরোধী আমি নই বরং তার আরো প্রসার দাবি করি। কিন্তু আজ গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে, কী শিক্ষায় আমরা ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তুলছি যে শিক্ষিতরাই সমাজে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধসমূহের সংগঠকে পরিণত হয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রটিকে দিন দিন যেন অকার্যকর করে তুলছে, একাত্তরের বীর শহীদদের স্বপ্নকে ব্যর্থতায় পরিণত করছে। এ ব্যাপারে নজর দেয়া কোনো প্রকার কালবিলম্বের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

রণেশ মৈত্র : প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতিক।

আপনার মতামত লিখুনঃ