জাতীয়তাবাদের রথে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আশায় মোদী

জাতীয়তাবাদের রথে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আশায় মোদী
জাতীয়তাবাদের রথে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আশায় মোদী

এনএনবি : ভারতের লোকসভা নির্বাচন ধারণার চেয়েও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করেই তা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স ।
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া যাওয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ নির্বাচনী যজ্ঞ কয়েক মাস আগে যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে বার্তা সংস্থাটি।

ভারতীয় কৃষকদের পড়তি আয় ও বেকারত্ব ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জনসমর্থনে লাগাম টেনে ধরতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।
তবে ভোটের আগে হওয়া সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি জোটই ফের ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ভারতকে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচ বছর আগে দলটি যে অভাবনীয় জয় পেয়েছিল, এবার তেমনটি না হলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় আসন তারা অর্জন করতে পারবে বলে জরিপগুলোতে আভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতি মাসে চাকরির বাজারে প্রবেশ করা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছেন না ভারতের ক্ষমতাসীন দলটি। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকদের আশ্বস্ত করতে না পারায় দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশটির ঔজ্জ্বল্য অনেকখানিই মিইয়ে গেছে।

লোকসংখ্যায় সবচেয়ে বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম পাচ্ছেন না; অন্যদিকে নতুন ও সমন্বিত একটি জাতীয় করের চাপে দক্ষিণের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। মাসের পর মাস ধরে চলা এসব অসন্তোষ ভোটে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা জরিপকারীদের।
গত বছরের ডিসেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাজ্যে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে ধরাশায়ী হওয়ার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি চাপে পড়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ উন্মাদনা দলটিকে ফের এগিয়ে দিয়েছে।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রাণঘাতী গাড়িবোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনী।
এরপর থেকেই মোদী নিজেকে জাতীয় নিরাপত্তায় প্রহরী হিসেবে চিত্রিত করে যাচ্ছেন, বিরোধীদের বলছেন ‘দুর্বল’, কখনো কখনো তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন।
“মোদী লম্বা লম্বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ না করায় মানুষ খুবই অসন্তুষ্ট, ক্রুদ্ধ,” বলেছেন মুম্বাইয়ের উবার চালক শিব চন্দ্র রায়।

উত্তর প্রদেশের গ্রামে থাকা তার বেকার ভাইরা দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
“সবাই বলছে- কোনো চাকরি নেই, সবখানেই কৃষকরা ধুঁকছে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে এই ব্যাপারটি আমাদের দ্বিধান্বিত করে তুলেছে। কেউ কেউ ভাবছেন, যেহেতু এটি জাতীয় সমস্যা, সুতরাং আমাদের মোদীকেই ভোট দেওয়া উচিত,” বলেছেন শিব।
কাশ্মীরে গাড়িবোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় মোদী পাকিস্তানের ভেতর জইশ-ই-মোহাম্মদের সন্দেহভাজন একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হামলার নির্দেশ দেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এবারই নয়া দিল্লি প্রতিবেশী দেশটিতে বিমান হামলা চালায়।

ভারতীয় বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও ভারতের ভেতর যুদ্ধবিমান পাঠায়; পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশে একে অপরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ারও হুমকি দেয়। যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়।
এ পাল্টাপাল্টিতে ‘ভারতই জয়ী হয়েছে’ বলে দাবি করেন মোদী। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলা অব্যাহত থাকলে বালাকোটের মতো হামলা আরও হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে ভারতীয় বিমান হামলায় জঙ্গিদের ক্ষয়ক্ষতি ও পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা বিরোধীদেরও একহাত নিয়েছেন এ বিজেপি নেতা।
“ভারত যখন সন্ত্রাসী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তখন এরা (বিরোধী) উদ্বিগ্ন হয় কেন? মোদীর প্রতি তাদের ঘৃণা কি এতই বেশি যে তারা এমনকী জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও এক হতে পারে না?,” পশ্চিম ভারতে এক নির্বাচনী সমাবেশে উৎফুল্ল লাখো গেরুয়া সমর্থকের উদ্দেশ্যে মোদী এসব বলেন।
বিজেপি নিরাপত্তা ইস্যুকে হাতিয়ার করে নির্বাচনী রথে চড়লেও রাহুল এবং জানুয়ারিতে দলের দায়িত্ব নেওয়া তার বোন প্রিয়াংকার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ভোটারদের দৃষ্টি ফেরাতে চাইছেন মোদীর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দিকে।
‘দারিদ্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানতে’ ক্ষমতায় গেলে ভারতের দরিদ্র পরিবারগুলোকে মাসে ৬ হাজার রুপি ভর্তুকি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাহুল-প্রিয়ংকা।

এ কর্মসূচি ১৩০ কোটি জনসংখ্যার ভারতের ২৫ কোটি নাগরিককে সরাসরি সুবিধা দেবে।
“বিজেপির প্রচারণার বেশিরভাগ অংশ জুড়েই রয়েছে জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা। তাদের ইশতেহারেও এগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস চাইছে কৃষকদের দুশ্চিন্তা, গ্রামীণ সংকট ও বেকারত্বকে সামনে নিয়ে আসতে,” বলেছেন নয়া দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপমেন্ট সোসাইটিজের পরিচালক সঞ্জয় কুমার।

আঞ্চলিক বিভিন্ন দলগুলোর সঙ্গে জোট করে ভোটবিভক্তি কমিয়ে বিজেপিকে হটাতেও চেষ্টা করেছিলেন রাহুল। কংগ্রেসের অন্য নেতারা ছোট পার্টিগুলোর দাবির কাছে মাথা না নোয়ানোয় এবং আঞ্চলিক নেতাদের উচ্চাকাক্সক্ষায় এ প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে।
সংখ্যালঘু মুসলমানদের আতঙ্কিত করে, হিন্দুর ভারত বানানোর উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হওয়া গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী মোদী সকল বিরোধী অংশের জন্যই হুমকি বলে কংগ্রেস অভিযোগ করলেও বিজেপি তা অস্বীকার করে আসছে।

নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার এ কৌশল মোদী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকেই ধার করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন রাহুল গান্ধীর উপদেষ্টা স্যাম পিত্রোদা।
“কৌশলটা হচ্ছে, সীমান্তে শত্রু আছে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে মেক্সিকো, দেশের ভেতরও শত্রু আছে, এরা হলো অভিবাসীরা। একই রকমভাবে, মোদীও বলছেন সীমান্তে শত্রু আছে। এর বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই সবাই আপনার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে,” বলেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুনঃ