জঙ্গিবাদ, বিশ্বশান্তি ও বাংলাদেশ

ড. রাশিদ আসকারী :

এ কথা সম্ভবত আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখছে না যে, একুশ শতকের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে জঙ্গিবাদ। বিভিন্ন সহিংস দলীয়/গোষ্ঠীগত জিঘাংসা থেকে উত্সজাত জঙ্গিবাদ ক্রমশ বিশ্বশান্তির এক নম্বর হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে প্রার্থনারত মুসলমানদের হত্যাকা-ের রক্তের দাগ না শুকাতেই আবার শ্রীলঙ্কার চার্চে ঘটলো আরেক পৈশাচিক হত্যাকা-। সহিংসতার বিভীষিকা/বর্বরতা একই কিন্তু হত্যাকারী এবং নিহতেরা জাতিগত পরিচয় আলাদা। নিউজিল্যান্ডে খ্রিষ্টান এক শ্বেতাঙ্গ ঠান্ডা মাথায় পাখির মতো ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছে মুসলমানদের; অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার মুসলিম উগ্রবাদীরা ভয়াবহ বোমা হামলায় হত্যা করেছে খ্রিষ্টানদের। প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে নিউজিল্যান্ডে মুসলিম নিধন তত্পরতার নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। উভয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে উপাসনালয়ে। অনেকটা চোখের বদলে চোখ কিংবা দাঁতের বদলে দাঁত-এর মতো চরম প্রতিশোধাত্মক কিংবা তার চাইতেও ভয়াবহ।

কিন্তু আদতে কী তাই হচ্ছে? নিউজিল্যান্ড যে নিরীহ মুসলমানেরা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন তারা নিজেরাও বেঁচে থাকলে শ্রীলঙ্কার খ্রিষ্টান হত্যাকান্ডকে কোনোভাবেই মেনে নিতেন না কিংবা শ্রীলঙ্কার নিহত খ্রিষ্টানেরা কোনোভাবেই নিউজিল্যান্ডের মুসলিম হত্যাকা-কে সমর্থন করেন নাই। কিংবা সেই হত্যাকা-ের খলনায়ক ব্রিন্টন ট্যারেন্টের শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যবাদী তত্ত্বের সমর্থক ছিলেন না। তাহলে কী দাঁড়াল। ট্যারেন্ট কিংবা আইএসআইএস কিংবা শ্রীলঙ্কার জাতীয় তাওহীদ জামাত-এর মনস্তাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই। উগ্রবাদ। একদল দিনক্ষণ স্থান বেছে নিয়েছে—শুক্রবার জুমার নামাজ, মসজিদ। আরেক দল বেছে নিয়েছে ইস্টার ডে, স্থান গির্জা।

তবে বিভিন্ন ধর্মীয় উন্মাদরা উন্মত্ত হয়ে ওয়েস্টার্ন গল্পের চরিত্রের মতো পরস্পরকে ধ্বংসলীলায় মেতে উঠলে হয়তো কারুর কিছু বলার থাকে না; কিন্তু তাদের এই জিঘাংসার বিস্তার যখন নিষ্পাপ শিশুকেও রেহাই দেয় না তখন তো বলার অনেক কিছুই থাকে। গোটা বিশ্বের জন্য করার অনেক কিছুই থাকে।
এসবের কারণ কী? ধর্মীয় উগ্রবাদ। ক্রস ক্রিসেন্ট কিংবা ত্রিশূল ধর্মচক্রের দ্বন্দ্ব আজকের নয়। ইতিহাসের পাতা ভরে আছে ধর্মীয় উন্মাদনা এবং তজ্জনিত ধ্বংসযজ্ঞের বিভীষিকাময় কাহিনি। নতুন সহ¯্রাব্দের শুরুতেই সেই কুখ্যাত নাইন ইলেভেনের মধ্য দিয়ে ধর্মান্ধতার রাজনীতি জঙ্গিবাদ নামে এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।

দৃশ্যপটে আসে আল কায়েদা আইএসআইএস-এর মতো উগ্রপন্থি ইসলামী নিষিদ্ধ সংগঠন। বিশ্বকে সন্ত্রস্ত তটস্ত করে তোলে তারা। সৃষ্টি হয় ইসলাম-ফোবিয়া। সেই জুজুকে মোকাবিলার নামে আবার সৃষ্টি হয় অন্যান্য রিএকটিভ কোর্যাডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া। গ্রুপ ডিনামিক্স মনস্তত্ত্বের মধ্য দিয়ে বিকশিত এধরনের চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির এক নাম শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যবাদ—যার কথা নিউজিল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি ব্রিন্টন ট্যারেন্টের ৭৪ পৃষ্ঠার অনলাইন ইশতেহারে পাওয়া যায়। ট্যারেন্ট তার দীর্ঘ ইশতেহারে চরম তিক্ততার সঙ্গে প্রকাশ করে তার তীব্র অভিবাসী/অশ্বেতাঙ্গ বিদ্বেষ এবং বিবমিষা এবং শ্বেতাঙ্গবাদের প্রতি পরম আনুগত্য। সে সদম্ভে প্রকাশ করে You will not find the truth anywhere else (অর্থাৎ সত্য শ্বেতাঙ্গবাদ ছাড়া আর কোথাও মিলবে না)। সম্ভবত এটাকেই বলে উগ্র মৌলবাদ। এ ধরনের ইসলাম-ফোবিয়া থেকেই ২০০৯ সালে সুইজারল্যান্ডে মসজিদের ওপরে মিনার নির্মাণবিরোধী গণভোটে নির্মাণবিরোধী খ্রিষ্টান শ্বেতাঙ্গেরা জয়ী হয়েছিল।

২০১১ সালে অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের মতো আরেক চরমপন্থি শ্বেতাঙ্গবাদীর দ্বারা নরওয়েতে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। ২০১৫ সালে আরেক কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গবাদী খুনী ডিলান রুফ সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে চার্চে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টর্চাচ হত্যাকা- বস্তুত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী প্রতিক্রিয়াশীল কোর্যাডিক্যালাইজেশনের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ইসলাম-ফোবিয়ার ধারণা যে কেবল উগ্রপন্থি শ্বেতাঙ্গরাই প্রকাশ করেছেন তা নয়, ভদ্রবেশী অনেক শ্বেতাঙ্গ লিজেন্ডও তা পোষণ করতেন। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ঞযব জরাবৎ ডধৎ গ্রন্থে উইস্টন চার্চিলও এন্তার মুসলিম বিশোদগার করেছেন। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তো শ্বেতাঙ্গ অহংবাদী এবং অভিবাসী বিদ্বেষীদের আইডল জ্ঞান করা হয়। এমনকি নিউজিল্যান্ড হত্যাযজ্ঞের খলনায়ক ট্যার্যান্টও তার ইশতেহারে ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।

The Great Replacement: -শীর্ষক চুরি করা ইশতেহারে ট্যার্যান্ট আরো উল্লেখ করে যে, ২০১৭ সালে সুইডেনের স্টকহোমে মুসলিম উগ্রপন্থিদের সন্ত্রাসী হামলায় যে শ্বেতাঙ্গ ১১ বছরের মেয়েটি মারা যায় তার বদলা নিতেই সে ক্রাইস্টচার্চে হামলার পরিকল্পনা নিয়েছে। কি অদ্ভুত যুক্তি। এক নিরীহ-এর হত্যার বদলা নিতে অন্য নিরীহদের হত্যা করা! এই যুক্তি হাস্যকর এবং বিকৃত মস্তিষ্কপ্রসূত। স্টকহোমে নিহত মেয়েটির মাও ট্যার্যান্টের এই যুক্তি সমর্থন করেননি। এবং নিউজিল্যান্ডে মুসলিম নিধনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এমনকি টের্যান্টের পরিবারের সদস্যরাওতার এই অমানবিক কর্মকান্ডের শাস্তি দাবি করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় বিষয়টি শ্বেতাঙ্গ অশ্বেতাঙ্গ নয়।

মানবিক এবং অমানবিক। জাতি-গোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণের অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান মানবতার। সেই মানবতা রক্ষার জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদ কিংবা শ্বেতাঙ্গ জাত্যাভিমান কোনো মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। সমর্থনযোগ্য হলো সাম্প্রদায়িক/ ধর্মীয় সম্প্রীতি।
জঙ্গিবাদ মোকাবিলার সবচাইতে বড় সংকট হলো এটি কোনো বিশেষ দেশ ও সমাজে সীমাবদ্ধ থাকছে না। উগ্রবাদী মুসলমানেরা চেষ্টা করছে কথিত ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠা করতে; উগ্রবাদী হিন্দুরা চাচ্ছে রামরাজ্য স্থাপন করতে; উগ্রবাদী খ্রিষ্টানরা চাচ্ছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ; উগ্রবাদী বৌদ্ধরাও এথনিক ক্লিংজিং-এ কম যাচ্ছে না। বস্তুত সকল উগ্রবাদের শেকড় একই বিন্দুতে—তাদের ডালপালা কেবল ভিন্ন ভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়। এই প্রবণতা দেশ থেকে দেশান্তরে, সমাজ থেকে সমাজান্তরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

আর তার শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। নাইন ইলেভেনে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আল কায়েদার আত্মঘাতী বিমান হামলায় খেলনার মতো ভেঙে পড়া যমজ টাওয়ারে সহগ্র মানুষের মধ্যে সন্ত্রস্ত কিশোরটি যখন অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিলেন ওরা (হত্যাকারীরা) কী চায়, সেই প্রশ্নের জবাব চলমান সমাজ ও সভ্যতার ওপরই রইল। জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো পৈশাচিক প্রক্রিয়ায় কী কোনো মতাদর্শের পক্ষে জনসমর্থন অর্জন করা সম্ভব? আল কায়েদা, আইএসআইএস, বোকো হারাম, মুসলিম ব্রাদারহুড কিংবা তাদের কাউন্টারপার্ট ইসলাম-ফোবিয়া আক্রান্ত শ্বেতাঙ্গ অহংবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলো শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের কাছে কিলিং এজেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আতঙ্ক ও ঘৃণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন হলো কীভাবে এর থেকে পরিত্রাণ মিলবে? এর কি কোনো সহজ উপায় আছে? মনে হয় না, কারণ এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

বিশ্ব জঙ্গিবাদ এবং ধারক সংগঠনগুলো কোনা না কোনোভাবে পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট। আল কায়েদা কিংবা আইএসআইএস প্রকারান্তরে পরাশক্তিদেরই সৃষ্টি। এদের সৃষ্টি করা হয়েছিল মূলত তৈল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত করে ইরানের ক্রমবর্ধিষ্ণু আঞ্চলিক প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্য। সন্ত্রাসী গ্রুপকে মদদদানের ঐতিহ্য পরাশক্তিদের দীর্ঘদিনের। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে সিআইএ সর্বপ্রথম চরমপন্থি ইসলামী গ্রুপগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে এবং বিশ্বকে দুভাগে ভাগ করে ফেলে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তৃতীয় বিশ্ব জাতীয়তাবাদ যাকে আমেরিকা সোভিয়েত যন্ত্র হিসেবে জ্ঞান করে এবং অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো এবং রাজনৈতিক ইসলাম যাকে আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৭০-এর দশকে সিআইএ আবার বিশ্বে সোভিয়েত আধিপত্য বিস্তার রোধে এবং মার্কসবাদী আদর্শের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মিসরের মুসলিক ব্রাদারহুডকে ব্যবহার করে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণের বিরুদ্ধে সারেকাত ইসলাম এবং পাকিস্তানে ভুট্টোর বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলাম ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮০-এর দশকে বিশ্ব জঙ্গি সম্রাট ওসামা বিন লাদেনকে জন্ম দেয় এই যুক্তরাষ্ট্রই। অতএব পরাশক্তিগুলোর বোধোদয় না হলে কিংবা-তাদের পরাক্রমের দিন শেষ না হলে বিশ্ব জঙ্গিবাদের প্রাণ ভোমরা মারা পড়বে না।

তাই বলে প্রাণভোমরার মৃত্যুর দিন গুণে বসে থাকাও কাজের কথা নয়। বিশ্ব জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে টিম ওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। নানা দিক বিবেচনায় একুশ শতকে মানবজাতির টেকসই উন্নয়নের ইশতেহার সাসটেইনএবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (ঝউএং-এর সতের নম্বরে টিম ওয়ার্কের কথাই বলা হয়েছে। বিশ্ব জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বাংলাদেশের মতো সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। মেজরিটি মাইনোরিটি কিংবা সাদা-কালো বিবেচনায় না এনে বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে ‘বাঁচো এবং এক সাথে বাঁচো’ (Live and co-exist) কিংবা ‘পিঁপড়ে তত্ত্ব’ অনুসরণ করতে হবে। সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করতে হবে। আন্তঃব্যক্তিক এবং আন্তঃসামাজিক যোগাযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে মাদক-সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায়-জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নবজাগরণ সূচিত হয়েছে। বস্তুত, হোলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গিদমনে যেভাবে কাউন্টার টেররিজম কৌশল এবং সামাজিক জাগরণ সৃষ্টির চেষ্ট করা হয়েছে তা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো রাষ্ট্রযন্ত্র যখন জঙ্গিবাদ দমনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তখন বাংলাদেশ তার সুবিশাল অসাম্প্রদায়িক জনশক্তি নিয়ে সফলভাবে মোকাবিলা করে চলেছে।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার অভিঘাত যাতে বাংলাদেশে না পড়ে সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার একান্ত আপনজন পরম আদরের নাতি-নিষ্পাপ শিশু জায়ান-এর মৃত্যু শোক দেশীয় জঙ্গিবাদ এবং বিশ্বজঙ্গিবাদ দমনে প্রধানমন্ত্রীকে আরো শক্তিশালী, আরো প্রত্যয়ী করবে, এমনটি ধারণা সবারই।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক