খরকুটোর আগুনে নিভছে জীবন প্রদীপ

খরকুটোর আগুনে নিভছে জীবন প্রদীপ
খরকুটোর আগুনে নিভছে জীবন প্রদীপ

মেরিনা লাভলী : আগুন মোর জেবন শ্যাষ করি দেইল, শীতোত গরম পাবার জন্তে খ্যাড় দিয়া আগুন তাপাইতেছিনু, কোন বেলা যে কাপড়োত আগুন ধরি গেইল, মুই কবার পাও না।

আগুন দিয়া মোর কাপড়-গাও জ্বলি গেইল।

মুই চিল্লায় জ্ঞান হারি ফেলাছনু। জ্ঞান ফিরি দেখোও মেডিকেলোত। ডাক্তার মোর গাত গজগুলা দিয়া পল্টাইল। জান মোর বেরে গেইল।

প্রতিদিন ডাক্তারগুলা ব্যান্ডেজ খোলে আর নাাগায়। এই কষ্ট মোর আর সহ্য হয় না। আল্লাহ্ মোক নিয়া গেইলে ভালো করিল হয়। মোক নিয়া যাও আল্লাহ।’

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারী ইউনিটে অশ্রুসিক্ত নয়নে এসব কথা বলছিল চিকিৎসাধীন আনজুমা (৩৫)।

লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার বাসিন্দা দিনমজুর মোশাররফের স্ত্রী আনজুমা’র শরীরের শতকরা ৬০ ভাগ অংশ পুড়ে গেছে।

রংপুরে প্রচন্ড শীত অনুভূত হওয়ায় গত ২৪ ডিসেম্বর সকালে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে মগ্ন ছিল আনজুমা।

অসচেতনতার কারণে খড়কুটোর আগুন কাপড়ে লেগে যায় পরে তা চুল ও সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

পরনের কাপড়ের মাধ্যমে শরীরে আগুন লাগার পর চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। গায়ে পানি ঢেলে আগুন নেভার পর বাড়ির মানুষজন তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসে।

বার্ণ ইউনিটের বেডে তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। প্রতিদিনকার ড্রেসিংয়ে অসম্ভব যন্ত্রণায় তার দিন-রাত কাটছে।

বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন বেগম রোকেয়ার (৫৫) মেয়ে রোকসানা জাকারিয়া বলেন, শীতের কারণে ১৯ ডিসেম্বর আমার মা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছিলো।

কখন গায়ে আগুন লেগে গিয়েছিল তিনি টের পাননি। কাপড়সহ শরীরের অনেক অংশ পুড়ে গেলে আমরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি।

প্রথমে সাজারী বিভাগে চিকিৎসা নিলে সেখানে অবস্থার অবনতি হলে বার্ণ ইউনিটে স্থানান্তর করে চিকিৎসকরা। এখন এখানে চিকিৎসা চলছে। কখনো স্বাস্থ্য উন্নতির দিকে যাচ্ছে, কখনো আবার অবনতিও হচ্ছে।

আবহাওয়া পরিবর্তন জনিত কারণে উত্তরাঞ্চলের শীত দিন দিন বেড়েই চলছে। সেই সাথে হিমালয় থেকে বয়ে আসা শৈত্যপ্রবাহের কারণে প্রচন্ড শীত অনুভূত হয় এ অঞ্চলে।

উত্তরের হতদরিদ্র মানুষের কাছে শীত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় খড়কুটো জ্বালিয়ে তারা শীত নিবারণের চেষ্টা চালায়। আর এতেই বাড়ে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা।

বিশেষ করে নারী ও শিশুরাই আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে বেশি। প্রতি বছর অর্ধ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে আগুন পোহানোর ঘটনায়। কেউ হাসপাতালে কেউ বা কবিরাজের স্মরণাপন্ন হয়ে অকালে প্রাণ হারায়।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, এবার পৌষের শুরুতেই প্রচন্ড শীত অনুভূত হওয়ায় আগুন পোহাতে গিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ২৮ জন রোগী ভর্তি হয়।

এদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে ঠাকুরগাঁয়ের ইব্রাহিমের স্ত্রী হালিমা খাতুন (৫০), শতকরা ২৫ ভাগ পোড়া নিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি চানপাড়া এলাকার মৃত লাবলুর স্ত্রী ফজিলা বেগম (৫০), শতকরা ৩৫ ভাগ পোড়া নিয়ে দিনাজপুর জেলার পাবর্তী দূর্গাপুর এলাকার হামিদুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নি (৩০), শতকরা ৪০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধা জেলার সাদুল্ল্যাপুর আলিনগর এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী হাজেরা বেগম (৪০), শতকরা ২৫ ভাগ পোড়া নিয়ে মিঠাপুকুর উপজেলার লতিপুর ইউনিয়নের মতলেবের স্ত্রী জোস্না (৫০), শতকরা ৩৫ ভাগ পোড়া নিয়ে দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আব্দুল জালালের স্ত্রী ছামসুন্নাহার (৪৫), শতকরা ২৮ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার মৃত পুলিন চন্দ্রের স্ত্রী মুন্নিবালা (৮০), শতকরা ৬০ ভাগ পোড়া নিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মোশাররফের স্ত্রী আনজুমা (৩৫), শতকরা ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধার সাদুল্ল্যাপুর ইদিলপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের কন্যা সাবিহা (৩), রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলার বুজরুক মহদীপুর গ্রামের আব্দুল হালিমের স্ত্রী রুবিনা (৩২), শতকরা ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুর নগরীর ধাপ পাশারীপাড়ার ওবাদ আলীর স্ত্রী বেগম রোকেয়া (৫৫), শতকরা ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ নতুন কোটারী গ্রামের আব্দুল হামীদের স্ত্রী ছকিনা বেগম (৩৫), শতকরা ৩০ ভাগ পোড়া নিয়ে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার পাঠানপাড়া মীরগঞ্জের আব্দুল খালেকের স্ত্রী বেগম (৪৫), শতকরা ৬৫ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধা সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বাছহাটা গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আলম মিয়া (৩৫), শতকরা ১৮ ভাগ পোড়া নিয়ে রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার লালমিয়ার ছেলে রায়হান (৭), শতকরা ৫০ ভাগ পোড়া নিয়ে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ তিশামত সদরের মোজাক্কর রহমানের মেয়ে মিতু (৫), নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নওতারা গ্রামের মোস্তাফিজার রহমানের মেয়ে মোনালিসা (৩), রংপুরের হারাগাছ মধ্যপাড়া চিলমন এলাকার আবু তাহেরের ছেলে মোরসালিন (৭), শতকরা ৬০ ভাগ পোড়া নিয়ে মিঠাপুকুরের রোজিনা বেগম (৩৫), নীলফামারী জেলার বড়ভিটা কিশোরগঞ্জের জিল্লুর রহমানের ছেলে নওশাদসহ (২) ২৬ জন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারী বিভাগে ভর্তি হয়েছে।

এদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সাবিহা ও আলম এবং গতকাল শনিবার মিঠাপুকুরের রোজিনা (৩৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ইতোমধ্যে ৩ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারী বিভাগের প্রধান ডাঃ এমএ হামিদ বলেন, খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

এদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ। গ্রামের অসচেতন মানুষ শীত নিবারণ করতে গিয়ে এ ধরনের দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সচেতনতা তৈরী করতে হবে।

খড়কুটো জ্বালিয়ে নয়, শীত নিবারণে বেশি বেশি শীতবস্ত্র পড়তে হবে। কেউ আগুনে পোড়া গেলে কোন কবিরাজের কাছে নয়, সরাসরি হাসপাতালে রোগীদের আনলে রোগীদের মৃত্যুর ঝুকি অনেকটা কমে যায়।