কুড়িগ্রামের চিলমারীতে অষ্টমীর স্নান সম্পন্ন

কুড়িগ্রামে অগ্নিকান্ড ও ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা
কুড়িগ্রামে অগ্নিকান্ড ও ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা

হুমায়ুন কবীর চিলমারী :
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী অষ্টমী স্নান সম্পন্ন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র স্নান উপলক্ষ্যে গত তিন দিন পূর্ব থেকেই চিলমারীতে শুরু হয় সাজ সাজ রব। চিলমারী নৌ-বন্দর থেকে শুরু হয়ে প্রায় ৩ কি.মি. ব্যাপি ব্রহ্মপুত্র নদে এই ¯œানের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন ও পূঁজা উদযাপন কমিটি। স্নান শুরু হয় শনিবার ভোর ৫টা ৫২মিনিট থেকে ৯টা ২১মিঃ ৫৩সেকেন্ড পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পূঁজা উদযাপন পরিষদ, চিলমারী উপজেলা শাখার সভাপতি ডাঃ সলিল কুমার বর্মন জানান, প্রতি বছরের ন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীনসহ অন্যান্য দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী পূণ্যার্থীগণ অষ্টমী ¯œান মেলায় আসেন। এবছর প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক পূন্যার্থীর সমাগম ঘটে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা জানান, সরকারী ভাবে অষ্টমী ¯œান মেলা স্থলে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য নলকুপ স্থাপন, মহিলাদের কাপড় বদলানোর জন্য দু’শতাধিক তাবু টাঙ্গানো হয়। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও ভিডিপির পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করাসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থান গুলোতে পুলিশী পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এছাড়াও জানাযায়,১৯৪৫ সালে মনতলা নামক স্থানে নদীর উপকুল ঘেঁসে এই মেলাটি হতো। এ সময় এখানে ছিল চিলমারীর প্রাচীনতম নৌ বন্দর। চিলমারীর অষ্টমীর মেলাতে স্নান করার জন্য যারা আসতেন তাদের বিরাট অংশটি আসতো আসামের বিভিন্ন এলাকা থেকে। ওই এলাকা থেকে পুন্যার্থী তো আসতোই, তাছাড়াও আসতো প্রচুর জটাধারী সাধু সন্ন্যাসীরা। এছাড়াও তদানীন্তন পুর্ব বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পুন্যার্থীরা জীপ, মটর গাড়ী যোগে আসত চিলমারীতে। তবে দূর দূরান্তের পুন্যার্থীরা বেশীর ভাগ ট্রেন যোগে মহুকুমা শহর কুড়িগ্রামে আসার পর গরুর গাড়ীতে করে চিলমারীতে আসতো। আর সে কারণে গরুর গাড়ীর বিরাট বহর (৩ থেকে ৪ মাইল দীর্ঘ) দেখা যেত রাস্তায়। অষ্টমীর মেলার কোন পার্শ্বে ৫/৬ একর জমির মধ্যে এ সকল গরুর গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হতো। মনতলা জায়গাটি বর্তমান যে জায়গায় রমনা রেল ষ্টেশন সেখান থেকে অনেক দুরে ছিল। যা ইতোমধ্যে নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।

যে কারণে অষ্টমীর স্নান
প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুল্ক পক্ষের অষ্টমী দিনে এই মেলাটি হয় বলে এই মেলাটির নামকরণ করা হয়েছে “অষ্টমীর মেলা”। জমদগ্নি ঋষির পুত্র ছিল ভূন্ডুরাম। হিন্দু শাস্ত্র ‘চৈতন্যম্মৃত’ মতে জানা যায়, এই জমদগ্নি ঋষির নিবাস স্থল ছিল বগুড়ার মহাস্থান গড়ে। তিনি খুব গুণী ঋষি ছিলেন। এক দিন জন্মদগ্নি ঋষি তার পুত্র ভূন্ডুরাম কে ডেকে বললেন ‘পুত্র, আমি কি তোমার পিতা? প্রশ্ন শুনে ভূন্ডুরাম অবাক হলেন এবং মাথা ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই তুমি আমার পিতা। তখন জমদগ্নি ঋষী পুত্রের নিকট এসে অত্যন্ত সোহাগের সাথে সূধালো ‘আমি যদি তোমাকে কোন কঠোর নির্দেশ প্রদান করি, তা কি তুমি পালন করবে?’ পূর্বের মতো এবারেও ভূন্ডুরাম মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করলে জমদগ্নি ঋষী পুত্রকে নির্দেশ দিলেন ‘যাও, এই মুহূর্তে কুঠার দিয়ে তোমার মাতা ও চার ভ্রাতাকে হত্যা কর’।

পিতার এহেন অমানবিক নির্দেশ শুনে ভূন্ডুরাম কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেল। জমদগ্নি ঋষী পুত্রকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবারও বলেন ‘যাও পিত্রাদেশ পালন কর, নচেৎ তুমি আমার কঠিন অভিশাপে অভিশপ্ত হবে’। উপায় অন্ত খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ভূন্ডুরাম কুঠারের আঘাতে মা ও অপর চার ভাইকে হত্যা করল। কিন্তু একি কুঠার তো আর হাত থেকে পড়ছে না। ভূন্ডুরাম তখন ঐ অবস্থায় পিতৃচরণে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো এবং বলতে লাগলো ‘পিতা আমি তো পিত্রাদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি, এবার তুমি তোমার গুণের বলে আমার মা ও চার ভ্রাতাকে জীবিত করে দাও। পুত্রের কান্না দেখে পিতার মন অবশেষে শীতল হল, ঋষী মৃত তার স্ত্রী ও চার পুত্রের জীবন দান করলেন। একটি সমস্যার সমাধান তো হলো বটে, কিন্তু ভূন্ডুরামের হাত থেকে কুঠার তো আর খুলছে না। আবার ভূন্ডুরাম পিতার চরণে মাথা রাখলেন, বলনে ‘পিতা আমার হাত থেকে কুঠার পড়ছে না’? তুমি মাতৃহত্যা করার পাপে অভিশপ্ত। অভিশাপ মোচন না হওয়া পর্যন্ত কুঠার তোমার পড়বে না বৎস।

পুত্র ভূগুরাম পিতার চরণে পুনরায় মাথা ঠুকতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন ‘ হে পিতাঃ এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবো কিভাবে তুমি বলে দাও‘। অবশেষে জমদগ্নি ঋষী বললেন, তুমি যদি এ অভিশাপ থেকে ত্রাণ পেতে চাও, তাহলে তোমাকে ওই কুঠার হাতে নিয়ে সমস্ত পীঠস্থান ভ্রমণ করতে হবে এবং সমস্ত পীঠস্থান ভ্রমণ শেষে যেতে হবে কোশলের বিষ্ণুদশা নামে পরিচিত দ্বিজের নিকট। তবেই তিনি তোমার এ অভিশাপ মোচনের পথ দেখিয়ে দিবেন। কি আর করা? অবশেষে ভূন্ডুরাম পিতার পরামর্শ মত নিজ শরীরের সাথে আটকে যাওয়া অভিশপ্ত কুঠারটি নিয়ে চষে বেড়াতে লাগল গোটা ভারতবর্ষে যতগুলো পীঠস্থান আছে সর্বত্র। বিষ্ণুদশা ভূন্ডুরামের অভিশপ্ত হবার সমস্ত কাহিনী মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং বললেন, যাও মানস্ সরবরে। সেখানে গিয়ে পর্বত কেটে হ্রদ সৃষ্টি কর। যে দিন তুমি হ্রদ কেটে সেই জলে স্নান করতে পারবে। ঐদিনই হবে তোমার মুক্তি।

ভূন্ডুরাম ছুটে চললো মানস সরবরে এবং সেখানে পৌঁছে পর্বত কাটতে লাগলো। এভাবেই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিরামহীনভাবে পর্বত কাটতে কাটতে একদিন ব্রহ্মপুত্র হ্রদ সৃষ্টি হলো, জলের স্রোতে ডুবে গেল ভূন্ডুরাম। কথিত আছে যে, ভূন্ডুরাম পর্বতের পাদদেশে ডুবে যাবার পর চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ত্রি-স্রোতের মাঝে ভেসে উঠেন এবং তার হাত থেকে কুঠার পড়ে যায়। ভূন্ডুরাম মাতৃহত্যার অভিশাপ থেকে মুক্তি পান। ঐদিনটি ছিল চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি। সেই থেকে এই ধর্মের অনুসারীগণ জীবনের সকল পাপ মোচনের জন্য প্রতি বছর নির্দিষ্ট এই দিনটিতে স্নানের জন্য ছুটে আসেন চিলমারীতে।