কল্যাণমুখী জীবনবোধ ও নৈতিকতা

বিমল সরকার :

কথায় আছে, ‘মায়ের শিক্ষা আগে হলে শিশু শেখে মায়ের কোলে’। তবে শিক্ষিত হোক বা না হোক মা’কেই বলা হয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। বাবা, শিক্ষক, পরিবার, নিকটজন, প্রতিষ্ঠান-পরিবেশ, জগৎ-জীবন ও সময়- এমন অনেকের কাছ থেকে বা অনেক কিছু থেকেই শিক্ষালাভ করতে পারে মানুষ। কিন্তু প্রথম শিক্ষক তার মা। মা-ই তাকে প্রথমে শেখান কোনটি চাঁদ আর কোনটি সূর্য।

আগুন ও পানি, দিন ও রাত, ঠান্ডা ও গরম থেকে শুরু করে সাদা-কালো, ভালো-মন্দ এ সবকিছু সম্পর্কে শিশু তার মায়ের কাছ থেকেই প্রথম ধারণাটি পেয়ে থাকে। মায়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বাবা ও পরিবারের শিক্ষাটাও। মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বা অন্যকিছুর ভূমিকা মা-বাবা, পরিবার ও শিক্ষকের আরও পরে। জীবন গঠনের শুরুতে এভাবেই গড়ে ওঠে একেকজন ব্যক্তির জীবনবোধ। ঘুরেফিরে আসে পরিবার, পরিবারের দেয়া শিক্ষা। এ কারণে পরিবারকে বলা হয়ে থাকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

মানুষ একা থাকতে পারে না। তার সঙ্গ দরকার। মা-বাবা ও পরিবারের গন্ডির বাইরে তাকে যেতে হয়। কারণ পৃথিবীতে কেউই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। তাকে যেতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা আরও বড় ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র ও পরিসরে। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে তাকে বেড়ে উঠতে হয়, যা মা-বাবার দেয়া শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে কখনও কখনও সাংঘর্ষিকও হয়ে যেতে পারে।
এখানে ছোট্ট একটি গল্প : একটি ছেলে স্কুলে টিফিন করার সময় টিফিনবক্সের খাবার এমনভাবে চেটেপুটে খেত যে, খাবারের একটুও বক্সে লেগে থাকত না। প্রতিদিন ব্যাপারটা দেখার পর তার এক বন্ধু একদিন বলল, ‘আচ্ছা, তুই রোজ এভাবে টিফিন করিস কেন? এভাবে এত চেটেপুটে খাবার কী আছে?’

জবাবে ছেলেটি বলল, ‘দেখ, এটা আমার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, যিনি কঠিন পরিশ্রমের পয়সা দিয়ে খাবারটা কিনে আনেন; মায়ের প্রতি ভালোবাসা, যিনি ভোরে উঠে এটা রান্না করে আমাকে দেন এবং সেই কৃষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যারা অনেক পরিশ্রম করে এটি আমাদের জন্য ফলিয়েছেন।’

এ গল্পটি ভিন্ন রকমের। এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ বই থেকে নেয়া : একবার একটি বালক স্কুল থেকে অন্য এক বালকের একটি বই চুরি করে নিয়ে আসে। অতি শৈশবকালেই ওই বালকের বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়। তার মাসি তাকে লালন-পালন করেন। তিনি তার হাতে বইটি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভুবন, তুমি এ বই কোথায় পেলে?’ সে বলল, ‘স্কুলের এক বালকের বই।’ তিনি বুঝতে পারলেন, ভুবন এই বইটি চুরি করে এনেছে; কিন্তু তিনি বইটি ওই বালককে ফিরিয়ে দিতে বললেন না এবং ভুবনকে শাসন বা চুরি করতে নিষেধও করলেন না।

এতে ভুবনের সাহস বেড়ে গেল। যতদিন সে স্কুলে ছিল, সুযোগ পেলেই চুরি করত। ক্রমে সে দক্ষ চোর হয়ে ওঠে। সবাই জেনে যায় ভুবন বড় চোর হয়েছে। কারও কোনো জিনিস হারালে সবাই তাকেই সন্দেহ করত। যদি ভুবন অন্য লোকের বাড়িতে যেত, পাছে সে কিছু চুরি করে এই ভয়ে সবাই সদা-সতর্ক থাকত এবং যথোচিত তিরস্কার ও মারধর পর্যন্ত করে তাকে তাড়িয়ে দিত।

কিছুদিন পর ভুবন চোর বলে ধরা পড়ল। সে অনেকের অনেক জিনিস চুরি করেছে তা প্রমাণ হল। বিচারক ভুবনের ফাঁসির আদেশ দিলেন। তখন ভুবনের হুঁশ হল। যেখানে অপরাধীদের ফাঁসি হয় সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর ভুবন উপস্থিত কর্মচারীদের বলল, ‘তোমরা দয়া করে এ জন্মের মতো একবার আমার মাসির সঙ্গে দেখা করাও।’

ভুবনের মাসি আনীত হলেন এবং ভুবনকে দেখে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে গেলেন। ভুবন বলল, ‘মাসি, এখন আর কাঁদলে কী হবে। কাছে এসো, কানে কানে তোমায় একটি কথা বলব।’ মাসি কাছে গেলে ভুবন কানের কাছাকাছি মুখ নিয়ে দাঁত দিয়ে জোরে কামড়িয়ে তার একটি কান কেটে নিল। পরে ধিক্কার জানিয়ে বলল, ‘মাসি, তুমিই আমার এ ফাঁসির কারণ। যখন আমি প্রথম চুরি করেছিলাম, তুমি জানতে পেরেছিলে। সে সময়ে তুমি যদি শাসন ও নিবারণ করতে, তাহলে আমার আজ এমন দশা হতো না। তা তুমি করোনি, এজন্য তোমার এ পুরস্কার।’ গল্পটির শেষ এখানেই।

এটি অবশ্য গল্প নয়, অনেক আগে সংঘটিত একটি বাস্তব ঘটনা। ১৯৭৭ সাল। ঢাকা তখনও সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়নি। ঢাকা ছাড়া দেশের বাকি ৭৭টি পৌরসভায় একযোগে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নির্বাচন চলছে। ‘পুত্রস্নেহে অন্ধ’ এক মা তার পুত্রকে জয়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। পুত্রকে তার জয়ী করাতেই হবে। তাই মা তার কেন্দ্রে একে একে মোট ১৭ বার ‘ভুয়া’ ভোট দিয়ে অবশেষে ধরা পড়লেন।

ঘটনাটি ঘটে রংপুর পৌরসভা নির্বাচনে। সেখানকার ১নং ওয়ার্ডে জনৈক তরুণ কমিশনার পদপ্রার্থী হন। ভোটগ্রহণকালে বিভিন্ন বেশে তার মা নিজের ভোট এবং একের পর এক আরও ১৭ বার ভোট দেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না তার। জাল ভোট দিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আটক করে রাখে বেশ কিছুক্ষণ। সে কী নাজেহাল অবস্থা! লজ্জায় মাথা হেঁট হল তার। ওই মায়ের জন্য পরিতাপের বিষয় হল এই যে, তার তরুণ পুত্রটি জয়ী হতে না পারায় তার সাধ আর পূরণ হয়নি শেষ পর্যন্ত।

আসল কথা হল জীবনবোধ। সবার মাঝেই কল্যাণমুখী একটি জীবনবোধ থাকা দরকার। ব্যক্তির ভেতরে জীবনবোধ আপনাআপনি গড়ে ওঠে না। গড়ে তুলতে হয়। ধৈর্য, সাধনা ও চর্চার মাধ্যমে একে গড়ে তুলতে হয়। শুরু করতে হয় পরিবার থেকে, মায়ের কাছ থেকে। দার্শনিক রুশো বলেছেন, ‘মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে; কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলাবদ্ধ’। মায়ের কোল থেকে প্রথমে পরিবার ও পরবর্তী সময়ে তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হতেই হবে। আর এভাবেই একেকজনের জীবনবোধ একেক রকম হয়ে থাকে।

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক