কল্পনা নয়, আগামীর বাস্তবতা

শেখ আনোয়ার :

কেমন হবে আগামীর প্রযুক্তিমানুষ? রেকর্জওয়েল কৃত্রিম বোধশক্তি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, চলতি সহগ্রাব্দের মাঝামাঝিতেই মানুষ তৈরি করবে তার মতো অবিকল ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ প্রযুক্তি নির্ভর যন্ত্রমানুষ।

এই মানুষ কি শুধুই কল্পনার মানুষ? অথবা এটি কি সায়েন্স ফিকশন?
জি না। হুবহু মানুষের মতোই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হবে আগামী দিনের প্রযুক্তি নির্ভর যন্ত্রমানুষ। ওরাই আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হবে। শিক্ষক হবে। আমাদের ভালো-মন্দ সবকিছুই সামাল দেবে।

শুধু কি তাই? ওদের সঙ্গেই মানুষের গভীর প্রেম হবে। এসব যে সত্যি সত্যিই হবে, তা কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল ব্লুটুথ ওয়াইফাই দুনিয়ার পরিধির দিকে একটু ভালো করে খেয়াল করলেই স্পষ্ট দেখা যায়।

মানুষের মতোই নির্ভরযোগ্য স্মরণশক্তি থাকবে এসব যান্ত্রিক ব্যক্তিত্বের। থাকবে সুনির্দিষ্ট প্রাত্যহিক কার্যক্রম। আর এই কার্যক্রম বিস্তৃত হতে চলেছে চলতি সহ¯্রাব্দেই। বিজ্ঞানী রেকর্জওয়েল তাঁর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসহ এসব তথ্য বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘দ্য এজ অব স্পিরিচুয়াল মেশিন’ নামক লিখিত গ্রন্থে।

কে না জানে ডিজিটাল দুনিয়ায় বর্তমানে ‘অ্যান্ড্রয়েড’ পিসি মোবাইল ফোন, ঘড়ি, গেজেট ইত্যাদি আকারে ইতোমধ্যেই হাজির হয়েছে হাতে হাতে। ঠিক তেমনি চলতি দশকেই পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি, বিশেষ করে হাই সলিউশন ভিজুয়াল ডিসপ্লেযুক্ত পিসি একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষুদ্র আকৃতিতে অর্থাত্ জুয়েলারি সামগ্রী, আংটি, কানের দুল, ঘড়ি ইত্যাদি নিত্য ব্যবহার্য্য সামগ্রীতে স্থান করে নেবে। এই পিসিগুলো এতটাই ক্ষুদ্র সাইজের হবে যে, পরিধেয় পোশাকের মধ্যেই এগুলো জড়িয়ে রাখা যাবে।

প্রশ্ন হলো— তাহলে সাধারণ কম্পিউটারের অবস্থা কী হবে? উত্তর, ওটা বড়জোর একটি চটি বই বা ক্ষুদ্র মোবাইল ফোনের আকৃতি পেতে পারে। ব্যস। পানির দামে কেনা ওই পার্সোনাল কম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে সম্পন্ন করবে ট্রিলিয়ন (দশ লাখের ত্রিঘাত অর্থাত্ ১০,০০০০০৩) সংখ্যক ক্যালকুলেশন সলিউশন।

তারের প্রচলন একদম বাদ হয়ে যাবে। শক্তিশালী, ব্লুটুথ, ওয়াইফাই ওয়্যারলেস প্রযুক্তি গোটা বিশ্ব ব্যাপক আকারে দখল করবে। অফিস-আদালত, বাসা-বাড়ি থেকে বর্তমানে প্রচলিত ডিজিটাল সামগ্রীর বিশাল পাহাড় উঠে যাবে। তার বদলে সেখানে স্থান করে নেবে সফটওয়্যার ডাটা ব্যাসিস ডকুমেন্টস, মিউজিক, মুভি সবকিছু।

সবখানেই কল্পনার বাস্তব পরিবেশ বিরাজ করবে। কম্পিউটার ডিসপ্লে সর্ব সাধারণের ব্যবহৃত চশমার মামুলি কাচের মধ্যে স্থান করে নেবে। এই চশমা দিয়ে দুনিয়ার স্বাভাবিক পরিবেশটাও দেখা যাবে। কেবলই কাচের মধ্যে ব্যবহৃত হবে অতি সূক্ষ্ম লেজার। এই সূক্ষ্ম লেজারই তৈরি করবে ভার্চুয়াল ইমেজ। দর্শকের সামনে যেটা আসবে, সেটাই তখন শূন্যে ভেসে বেড়াবে।

মানুষের মুখ নিঃসৃত বক্তব্য শনাক্ত করতে এবং মূল পাঠ পুনরায় আরম্ভ করতে পারবে। বর্তমানের সব কাগুজে দলিলপত্র, পেপার-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বই-পুস্তক এ সংক্রান্ত জিনিস অতীত ঐতিহ্য হিসেবে কেবল পিডিএফ স্ক্যান করে ডিজিটাল সংরক্ষণ করে রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না। গতানুগতিক ব্যবসায়িক লেনদেনে কাগুজে টাকা-ডলারের প্রয়োজন ইতোমধ্যেই প্রায় উঠে গেছে।

আগামী দিনে ক্রয়, ভ্রমণ, সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ-কর্মগুলো করবে একজন ভার্চুয়াল মানুষ। এই মানুষগুলো কখনো কখনো হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে অবিকল মানুষের চেহারায় আবির্ভূত হবে। অন্ধ কিংবা দৃষ্টি অক্ষম মানুষের জন্য পকেট সাইজ রিডিং মেশিন বেরুবে। বধিরদের জন্য বেরুবে শ্রবণ যন্ত্র। এই যন্ত্রই মানুষের বক্তব্যের লিখিত রূপান্তর চোখের সামনে উপস্থাপন করবে। বোবা, প্রতিবন্ধী লোকদের জন্য মুখ দিয়ে কথা বলার যন্ত্রও বেরুবে। বিকলাঙ্গদের জন্য ওয়াকিং মেশিন তো থাকবেই।

এমনকি অন্য ভাষাভাষীদের সুবিধার্থে অনুবাদকারী যন্ত্র পকেটে পকেটে থাকবে। ধরা যাক, আপনি বাংলায় কথা বলবেন। আপনার জাপানি বন্ধু আপনার বক্তব্য কিন্তু জাপানি ভাষাতেই শুনতে পাবেন। ঠিক তেমনি আপনিও জাপানি বন্ধুর জাপানি ভাষার কথা বাংলায় শুনতে পাবেন। অতি মামুলি যন্ত্রের মতোই এগুলো অহরহ ব্যবহৃত হবে। কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলাফল কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতিতেও বিস্তৃত হবে।

ব্যাপক হারে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটবে। সামান্য রাজনৈতিক ইস্যুতেও একান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। এক মানুষ অন্য মানুষকে খুঁজে বের করতে সার্বক্ষণিকভাবে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির আশ্রয় নেবে। মানুষ শিল্পী, গায়কদের স্থান দখল করে নেবে সাইবারনেটিক গায়ক বা শিল্পী।

প্রাণীদেহের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যেই এই গায়করা সার্বক্ষণিক অবস্থান করবে। মানুষের চলাফেরা, হাত-পা নড়াচড়া বা শরীরের দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে, যখন-তখন ঝংকৃত হবে আকাঙ্ক্ষিত সংগীত। তবে আগামী দিনেও যুদ্ধবিগ্রহ হবে; কিন্তু যুদ্ধের মাঠে মানুষের উপস্থিতি নজরে আসবে না।

গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে; কিন্তু কোনো ভোটারকেই আর সেন্টারে শরীর নিয়ে হাজির হয়ে ভোট দিতে হবে না। ভোট হবে মোবাইল ফোনে। আর মানুষবিহীন এই যুদ্ধ হবে বায়ূচালিত। হাতিয়ার বা সমরাস্ত্রের আকার-আকৃতি হবে ছোট্ট পাখি হামিং বার্ড কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র আকারের। ক্যান্সার, লিভার, হূদরোগ, কিডনি ইত্যাদি চিকিত্সায় এই প্রাণ-প্রকৌশল বিদ্যা ব্যাপক হারে প্রয়োগ করা হবে। এসব মামুলি রোগে মানুষের আর কখনো মৃত্যু হবে না।

আসছে ২০২৫ সাল। সর্বত্রই ব্যাপক পরিমাণে অদৃশ্য অবস্থায় কম্পিউটার ছড়িয়ে থাকবে। ঘরের দেওয়াল, টেবিল-চেয়ার, ডেস্ক, কাপড়-চোপড় এমনকি জুয়েলারি সামগ্রীতে অদৃশ্য কম্পিউটার ব্যবহৃত হবে। এমনকি মানুষের শরীরের চামড়ার ভিতরে এখানে-ওখানেও বসানো থাকবে কম্পিউটার। একদম স্বল্প দামে কেনা এসব কম্পিউটার মানুষের মস্তিষ্কের মতো পাক্কা হিসাব-কিতাব দেবে।

আর ত্রিমাত্রিক ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সাধারণ সার্বক্ষণিক ব্যবহূত চোখের গ্লাস, এমনকি কন্ট্রাক্ট লেন্সেও লেপ্টে থাকবে। আর এসবের মাধ্যমে একজন অন্যজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে। কম্পিউটার পরিচালনায় কি-বোর্ডের প্রচলন একদম বাদ হয়ে যাবে। মানুষের অঙ্গভঙ্গি এবং সব ধরনের প্রাকৃতিক ভাষা বুঝবে কম্পিউটার। তা দিয়েই তাবত্ বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হবে।

আর কারখানা এবং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ কাজে ন্যানো টেকনোলজি (পারমাণবিক বা আণবিক স্কেলে অতিক্ষুদ্র ডিভাইস তৈরি করার জন্য ধাতব বস্তুকে সুনিপুণভাবে কাজে লাগানোর বিজ্ঞান) ন্যানো ইঞ্জিনিয়ারিং মেশিন বা পরমাণু দিয়ে পরমাণু তৈরির যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহূত হবে। গোটা দুনিয়ার বায়বীয় পরিবেশে ছেয়ে থাকবে ত্রিমাত্রিক অডিও, ভিডিও এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিভাজন। মানুষ ইচ্ছে করলেই যে কোনো সময় যে কোনো লোকের কাছে চোখের পলকে বাস্তবের মতো পৌঁছে যেতে পারবে। এখানে শারীরিক সাক্ষাতের কোনো দরকার পড়বে না।

আগামীর মানুষ তার একান্ত ব্যক্তিগত নিরাপত্তামূলক কাজে অভঙ্গুর গোপন প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োগ ঘটাবে। আর ব্যক্তিগত এই নিরাপত্তার বিষয়টিই সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে।
২০৩০ সাল। এ সময় অতি সাধারণ কম্পিউটারের ক্যালকুলেশন করার ক্ষমতা হবে এক হাজার মানুষের মস্তিষ্কের সমান। যা বসানো হবে একদম চোখের সামনের কন্ট্রাক্ট লেন্সের মতো।

সবখানেই এটি ব্যবহূত হবে। চোখে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে লেজার বসানো যাবে। এই লেন্স লেজারটিই গোটা দুনিয়ার কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে। বিশেষ প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের সঙ্গে কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্রের সংযোজন ঘটানো হবে।
আগামী দিনের পৃথিবীতে জনসংখ্যার বিশাল অংশ কার্বনভিত্তিক মানুষে ছেয়ে যাবে। পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করতে আর রক্ত-মাংসের মানুষ লাগবে না। কৃষি, সামরিক নিরাপত্তা, কলকারখানা, পরিবহন— সবখানেই দেখা যাবে যন্ত্রমানুষের জয়-জয়কার।

শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে ওই যন্ত্রমানুষ। আর তখন এই যন্ত্রমানুষদের আইনত অধিকার নিয়ে পলিসি মেকার, ডিসিশন মেকারদেরদের মধ্যে বিতর্ক উঠবে। এসময় মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ১২০ বছর। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষ করে চোখ, কান, হূিপণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক বার বার ব্যবহৃত হতে থাকবে। ন্যানো টেকনোলজির মাধ্যমে এক রোবট মানুষ আরেক রোবট মানুষ তৈরি করবে।

২০৩৯ মানুষের দৈনন্দিন খাবার-দাবার পরিবর্তন হয়ে যাবে। ন্যানো প্রযুক্তির খাবার প্রচলিত হবে সর্বত্র, সবখানে। সেসব খাদ্য-দ্রব্যের স্বাদ, গন্ধ এবং পুষ্টিমান অরিজিনাল খাবারের মতোই সঠিকভাবে অক্ষুণ্ন থাকবে। আর তাই কৃষি কাজে আবহাওয়ার কোনরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে না।

আর ২০৪৯ সালে কী হবে? এ সময় মানুষের মস্তিষ্কের অনুরূপ মস্তিষ্ক তৈরি হবে। এই মস্তিষ্কধারী কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রমানুষ আর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাত্ থাকবে না। এই যান্ত্রিক বুদ্ধিদীপ্ত সম্প্রদায়ই নিয়ন্ত্রণ করবে আগামীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল দুনিয়া!

লেখক : গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুনঃ