কত কারিগরের নিপুন ছোঁয়া – সেলিম সিকদার

যখন মাটির তৈরি তৈজসপত্র দেখি, তখন মনে মনে ভাবি ;এটা কিভাবে তারা হাতের নিপুন ছোঁয়া দিয়ে তৈরি করেছে ? দেখার বড় শখ জাগে তাই কৌতূহলবশত একদিন ঠিক করি কুমোরদের পাড়ায় যাব। পাশের গ্রামের নামটি পাল পাড়া। গ্রামটি নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে। ওই গ্রামে যেতে হলে নদী পার হয়ে,যেতে হবে। তাই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে পালপাড়া গেলাম। সারাদিন কুমোরদের মাটির তৈরি কাজ দেখলাম।

তারা মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সরা ও বিভিন্ন জীবজন্তুর নিপুন ছোঁয়ায় তৈরি করছে। আরো বেশি কৌতুহল নিয়ে দেখি যখন কুমোররা, কাঠের তৈরি চাকার উপর কিভাবে কাজ করে? তাই দেখে আশ্চর্য হইলাম । তাতে, আছে বিভিন্ন ফুলের নকশা, চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের নববধূ কিভাবে বাপের বাড়ি নাইওর যায় তার ছবি, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রা নদীর দৃশ্য, চোখ বুজে নজরুল ইসলাম কিভাবে বাঁশি বাজাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথের বেণিবন্ধনরত যুবতীর চিত্র, যাকে চিত্রশিল্পীর গুরু বলা হয় সে জয়নুলের আঁকা গরুর চাকা ঠেলে তোলার প্রতিলিপি, উড়ন্ত পরী,বৈশাখের সাজে নারী, ময়ূরপঙ্খী নৌকা, রাখাল ছেলে বাঁশি বাজাচ্ছেন।

এইসব, দেখে মনে হয় কোন ফটোগ্রাফারের তোলা ছবিকে কুমোররা নকল করেছেন। পালপাড়া গ্রামটা ছিল বট পাকুড়ের আসন্ন শীতল একটি গ্রাম। অবিশ্বাস্য ঝিম ধরা নীরবতা। ভিতরে রাতের বেলায় মনে হয় ওই বট পাকুড় গাছের নিচে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে, দিনের বেলায় চারপাশে সবুজ ফসলের দোলা এবং বর্ষা ঋতুতে মনে হয় শাপলা ফুল পানিতে দোল খাচ্ছে । কুমোর পাড়ায় গেলে মনে হয়, সারি সারি করে; এস এম সুলতান, কামরুল হাসান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল , জয়নুল ও বিভিন্ন দেবদেবীরকে সাজিয়ে রেখেছেন।

আজকালকের দিনে মাটির তৈরি জিনিসগুলো প্রচুর বিক্রি হয়। কারণ অতি স্বল্প দামে ঘরের সব কিছু সাজাবার উপকরণ পাওয়া যায় তাই,অনেকে কিনে নায় । বিভিন্ন রকমের চিত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কাঠের ওপর খোদাই করা নকশা তৈরি করা আছে। আর কাঠের চাকার ওপর আস্তে আস্তে করে কাদা টিপে টিপে বসনো হয় নকশা। আর নকশা গুলো ফুটে উঠেছে মাটির তৈরি তৈজসপত্রে। এ সকল তৈজসপত্র গুলো প্রথমে রোদে শুকানো হয়। এরপর বাঁশের তৈরি কলম দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা রকমের নকশা এবং পরে ভাঁটিতে পোড়াবার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়।

এখানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কয়েকজন। তাদের মাঝে আছে কিশোর ও নারী। আর আছে দু’ চার জন মধ্যবয়স্ক লোক। আর এই সবকিছু একটি ছোট্ট চৌকিতে বসে তদারক করছেন বৃদ্ধ পালমশাই। তদারক করছেন, পান খাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে দাঁত খিলাল দিয়ে পরিষ্কার করছেন । তাহার মাথায় লম্বা চুল যদি উপুড় হয়ে থাকে, মনে হবে কোন বৃদ্ধ মহিলা বসে আছে। তার চুল গুলো পেকে সাদা হয়েছে। গলায় লাল রঙের গামছা। তিনি শকুনের চোখের মত কারিগরদের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে।

একটি কিশোর। একটু ভুল করতেই, পালমশাই বলে উঠলো এ কি করলি চ্যাংড়া !

এক কারিগরের, ভয়ে বাঁশের কলমটি মাটিতে পড়ে গেল। ভাবতে লাগলো এই কথাটি কাকে সম্বোধন করলেন। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু যাকে বলেছে সে বুঝতে পেরেছে। যখন ঘোড়ার উপর বসে থাকা বীরঙ্গনা সখিনার মূর্তি তৈরি করেছিল, তখন তার হাতে তরবারি না দিয়ে একটি ছড়ি ধরিয়ে দিল। মাথায় নেই তার যুদ্ধের মুকুট। পাল মশাই আমার দিকে ফিরে মুচকি হেসে বললেন, ছেলেপেলে বোঝেনা, সবকিছু তদারক আমারই করতে হয় । একটু যদি নজর না রাখি তাহলে কাম সারা। দেখলেন তো ? কি করলো বীরঙ্গনা সখিনার হাতে তরবারি না দিয়ে তার হাতে একটি ছড়ি ধরিয়ে দিল। তা আবার মাথায় যুদ্ধের মুকুট নেই । তোদের নিয়ে আর পারি না বলে, সে ‘উঁহুহু’ করে নিজেই উঠে দাঁড়ালেন এবং চ্যাংড়ার কাছে গিয়ে বললেন উট্।

তারপর চ্যাংড়ার হাত থেকে বীরঙ্গনা সখিনার ঘোড়ার উপর বসে থাকা মূর্তিটা নিয়ে, নিজেই একটি তরবারি হাতে তুলে দিলেন ও একটি মুকুট বানিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মথায় বসিয়ে দিয়ে, এঁকে দিলেন তার ওপর নকশা।

পিছন থেকে কে জানি পিসোমশাই বলে ডাক দিলেন।

আর পালমাশাই বিরক্ত হয়ে মুহুর্তের মাঝে বামে মোড় ফিরে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখ বড় হয়ে উঠলো মনে হয় কপালে চোখ উঠেছে ।

একবারে সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল। কারো মুখে কোন কথা নেই। ইতিমধ্যে সে বুঝতে পারলো যে চ্যাংড়াটি তাকে ডাক দিয়েছিল সেই চ্যাংড়াটি ভয়ে মাথা নিচু করে রয়েছে। আর যে চ্যাংড়া টি কাজে ভুল করেছিল সে হাঁড়ি পাতিল তৈরি করার কাঠের চাকার দিকে নিচু হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। মনে হয় একবারে হাবাগোবা ছেলে কিছুই বোঝেনা।

পাল মশাই বললেন। আরে চ্যাংড়া আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবি ? এবার আমার কাছে আয় কিভাবে কাজ করতে হবে তোকে দেখিয়ে দেই,এই বলে এম এ সুলতান এর চুলে রং করা শুরু করলো। আর বলতে লাগলো চুল তো গ্রাম বাংলার সবাই চেনে তাই চুল রাখলে যদি কুদ্দুস বয়াতি , হাসন রাজা, কবি নজরুল ইসলাম ও কবি শামসুর রহমান বলা হয়। তা হলের চুলের কি দোষ। চশমা পরলে যদি কামরুল হাসান মনে হয়, আরেকটা তো আছে দাড়ি। দড়ি যদি থাকে তা হলো,পুরুষ না থাকলে বলে নারী। কতমতবাদ! দাড়ি তো মসজিদের ইমামের ও আছে আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল। লালন ফকিরের ও ছিল মাওলানা ভাসানী ছিল। তাই বলে কি, কেউ যদি চশমা পরে আর চুল ও দাড়ি রাখে তাদেট সবাইকে ওই নাম ধরে ডাকতে হবে ?

আবার তাড়াহুড়া করে সবাইকে নিয়ে পাল মশাই কাজ শুরু করল। কাঁচা মাটি দিয়ে মাটির তৈজসপত্র যদিও তৈরি করা মহা বিরক্ত কর হয়, তাদের কাছে কোন ব্যাপারই না তারা মনের আল্পনা দিয়ে নিরলসভাবে তৈরি করে যাচ্ছে। কেউ বা, আলপনার কাজ করছে। কেউ বা, কাদা মাটি মিশিয়ে তৈজসপত্র উপকরণ তৈরি করছে। কেউ, বা আবার কিভাবে ভাঁটিতে দেওয়ার আগে রোদে শুকানো যায় সেই ব্যবস্থা করছে। সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। আবার কাঠের ছাঁচের ওপরে সকল নকশার ঠিক মত বসলো কি না সে দিকে খেয়াল রাখতে হয়। একটু নষ্ট হলে তাড়াতাড়ি সেটা ঠিক করতে হয়। আর যদি ঠিক করা না হয়, তাহলে ওই উপকরণ গুলো নষ্ট হবে। উপকরণ নষ্ট মানে, সময় নষ্ট । আর সময় নষ্ট মনে, টাকা-পয়সা সবই নষ্ট। অনেক সময় ভাঁটিতে থেকেও কিছু মাটির তৈজসপত্র নষ্ট বের হয়।

এরপর চোখ পড়লো একটি মাটির সুন্দর কলসির ওপর। দেখলাম তাতে, আঁকা কামরুল হাসানের বধূ গরুর গাড়িতে করে বাপের বাড়ি নাইওর যাচ্ছে, যে ছবিটি এঁকেছিলেন। সেই ছবিটি দেখিয়ে পালমশাইকে জিজ্ঞেস করলাম এটি কি ছবি ? সে, বললেন দেখেন না গরুর গাড়িতে করে বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে।

সেই কথা নয়। বললাম ছবিটি কে এঁকেছেন ? পালমশাই একটু রাগান্বিত ভাষায় উত্তর দিলেন কেন এইডা আবার কেডায় আঁকবো ? বুঝেন না আমাগো আঁকা।

আমি একটু মৃদু হেসে বললাম। পাল মহাশয় এটা কিভাবে আপনারা আঁকা ছবি হবে ? এটা তো চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা ছবি । যিনি নিজেকে পটুয়া কামরুল বলে পরিচিতি দিতে গর্ববোধ করত। সে ই আমাদের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত নকশা করেছেন।

আমার কথা শুনে পাল মহাশয় মনে হয় আকাশ থেকে পরলেন। হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটু নিম্নস্বরে, ভাঙ্গা গলায় বললেন। ও হয়তো হতে পারে। কেডায় জানে সে কথা। কত শিল্পীর আঁকা কত ছবি, কত কারিগরের নিপুন ছোঁয়ায় প্রাণ পাচ্ছে! আমরা গায়ের মূর্খ মানুষ। এতটা তো আপনাদের মত জানি না। ওই যে কইলেন ছবিটা কামরু না কেডায় জানি আঁকছে ? বৃদ্ধ মানুষ। তাই, নাম মনে থাকে না। তারপরও মনে করেন, আমরা যে কত কারিগরি কাম করি, আমাগো আর কেডায় চেনে ? মনে রাখবে বা, কয়জন ? নাম জানবে বা, কয়জন ? আমার বাবা কুমোরের কাজ করত। আমার দাদাও করত। তার বাবা ও করত। আর তার বাবা করত আর্টিস্টের কাজ অর্থাৎ আমার পর দাদা ছিলেন একজন আর্টিস্ট। আজ তারে কেডায় স্মরণ করে রাখছে ? তারপর একটু নীরবতা পালন করলেন। এবার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন হয় তো বা কামরুল হতে পারে। তবে এই নকশাটা গ্রাম্য মেলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পালমশাই কে জিজ্ঞেস করলাম, এটা তো এস এম সুলতানের ছবি, এটা কামরুল হাসানের ছবি, এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, এটা নজরুল ইসলামের ছবি, আর ওটা রাখাল ছেলে বাঁশি বাজাচ্ছেন।

পাল মহাশয় একটু আড়চোখে আমার দিকে, আরেকবার কাঠের তৈরি চাকার দিকে তাকালেন। ভাবলে হয়তো বা সবার চেহারা ঠিক মতো মেলেতে পারেনি, তাই বললেন কেন কী হইছে ?
না, তেমন কিছু হয়নি। আমি জানতে চেয়েছি আপনারা কি বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ছবি করেন না ?

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা?
হ্যাঁ।

কেন, আপনারা দেখেন নাই? ওই যে উপরে দেখেন, সবার উপরে এই দুইটা ছবি। এদের ছবি কি আর নিচে রাখুন যায় ?

পালমশাই বললেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ যেমন একই সূত্রে গ্রথিত, তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও (যিনি বঙ্গবন্ধুর প্রিয় রেণু) পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। ফজিলাতুন্নেছার শৈশবের সঙ্গী শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা একই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। জীবন চলার পথে একে অপরের অপরিহার্যতার প্রমাণ দিয়েছেন ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে, এই মহীয়সী নারী।

এতক্ষণ ধরে পাল মশায়ের কথা শুনে আমি একটু চমকে গেলাম। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তো; বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতাকে ছবি সবার উপরে রেখেছেন।

এতক্ষণ আমি বুঝতে পারলাম। সত্যি, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ছবি কারিগরের স্থান দখল করে নিয়েছেন সবার উপরে। এই কথা ভাবতে, ভাবতে সারাটা দিন কাটিয়ে দিলাম।

আপনার মতামত লিখুনঃ