একটি শিকল পরা জীবন

একটি শিকল পরা জীবন
একটি শিকল পরা জীবন

আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে বেশ উৎফুল্ল রাহাত।তাঁর ভাবটা দেখে মনে হচ্ছে,পৃথিবীর সবচেয়ে মহামূল্যবান জিনিসটা সে পেয়ে গেছে।এখন তাকে আর কেউ আটকাতে পারবেনা।নিজেকে বড় শক্তিশালী মনে হচ্ছে তাঁর।একদম খুশিতে আত্নহারা।আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে কী করবে না করবে-একদম দোটানা অবস্থায় পড়ে গেছে সে।কোন ইচ্ছেটা আগে পূরণ করবে?চেরাগ থেকে দৈত্য বের হলে কোন ইচ্ছেটার কথা সর্বপ্রথম বলবে?কিছুই ভাবতে পারেনা সে।ভাবতে গেলে মাথার মধ্যে ইচ্ছেগুলো জট খায়।খুব দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায় সে।ভাবতেই থাকে রাহাত।একসময় তাঁর খেয়ালে আসে একটা ইচ্ছের কথা।হ্যাঁ,এখন যে কথাটা তাঁর মনের মধ্যে এসেছে।ঠিক সেই জিনিসটা তাঁর জীবনকে বেশ অতিষ্ঠ করে তুলছে।এই বিরক্তিকর ব্যাপারটা থেকে সে রেহাই পেতে চায়।

পড়াশোনা করতে তাঁর একদমই ইচ্ছে করেনা।বাবা-মা’র জন্য ছাড়তেও পারেনা।মানুষ হলে তো পড়াশোনা করতে হবে।কিন্তু তাঁর বাবা-মা তাকে যতটা চাপের মুখে রাখে।তাতে পড়াশোনার প্রতি একটা তিক্ততা সৃষ্টি হবারই কথা।তাঁর আর ভালো লাগেনা এসব করতে।মন চায় বাসা থেকে পালিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই।আর কখনো এই বাসায় ফিরে না আসি।সাথে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কিছু বই থাকবে।সারাদিন ওসবই পড়ব,আর ঘুরে বেড়াব।কিন্তু সে করতে পারেনা,হয়তো কোনো মনের ভয়ে।তাঁর বাবা-মা সবসময় চায়,সে যেন ক্লাসে প্রথম হয়,স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পায়…এত এত চাপ!এসব ভাবতে কতটা বিরক্ত লাগে,তা শুধু রাহাত আর রাহাতের মতো ছেলে-মেয়েরাই জানে।

রাহাত এবার একটা মহামূল্যবান জিনিস পেয়েছে-আলাদিনের চেরাগ।এখন তাঁর আর কোনো চিন্তা নেই।আলাদিনের দৈত্যকে বলে,পড়াশোনা থেকে একদম অব্যাহতি নিবে।দৈত্যকে বলে দিবে,সে যেন সবসময় ক্লাসের মধ্যে প্রথম আর স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পায়।আর সে সারাদিন তাঁর মনের মতো করে চলবে,গল্পের বই পড়বে,টিভি দেখবে,খাবে,ঘুমাবে এবং ইচ্ছে হলে টুকটাক স্কুলের বই পড়বে।বছর শেষে আলাদিনের দৈত্য তাঁর ইচ্ছেটাকে পূরণ করবে।সে ক্লাসের মধ্যে প্রথম হবে,স্কুলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাবে।কত্ত মজার!এসব ভাবতে ভাবতে অনেক আনন্দে হাসি পায় তাঁর।খুব জোরেই হাসতে থাকে।হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে সে বু্ঝতে পারে এটা নিছক স্বপ্ন ছিল।মুহূর্তেই হাস্যোজ্বল মুখ ছোট হয়ে আসে,কালো হয়ে যায়।মনে মনে ভাবে,স্বপ্নটা সত্যি হলে কী এমন ক্ষতি হতো?এত কষ্ট করতে হতো না।ইশশ!

তারপর কক্ষের দরজার ওদিকে উঁকি দেয় রাহাত।এত জোরে যে সে হাসছিল।কেউ শুনতে পেল কিনা।কেউ যদি শুনে ফেলে তবে এত রাতে জোরে শব্দ করে হাসার কারণ কী শুনতে চাইবে।আর তখুনি ঠাট্টার পাত্র বনে যাবে।বাহিরের মানুষ জানতে পারলে তো রেহাই নেই।নির্ঘাত পাগল বলবে।এসব ভাবতেই এই শীতের রাতে গা ঘেমে যাচ্ছে।

 

কিছুক্ষণ পর ভোর হতে না হতেই তাঁর মা এসে কক্ষে হাজির।রাহাতের কক্ষের দরজা সবসময় খোলা থাকে।রাতে ঘুমানোর সময়ও দরজা খোলা রেখে ঘুমাতে হয়।তাকে কঠোর পাহারার মধ্যে রাখে তাঁর বাবা-মা।কখন কী করে না করে সব গোয়েন্দার মতো তদবির করে যায়।আর যদি কিছু তাদের মন মতো না হয়েছে তো তখন শুরু হয় নানারকমের জেরা।একদম খুনি আসামীর মতো।যাইহোক,প্রতিদিনের মতো সেদিন ভোরের দিকে তার মা তাকে এসে ডাকছিল।তাঁর মায়ের ডাক ঘুমের মধ্যে শুনতে বেশ কর্কশ লাগে।তাঁর মনে হয় এরকম কর্কশ কণ্ঠ সে আগে কখনো শোনেনি।

ভোর বেলার ঘুম বেশ গভীর হয়।আর সেই সময়টা যদি হয় শীতের সময়।তাহলে তো লেপ আর কম্বলের নীচ থেকে উঠতেই ইচ্ছে করবেনা।আর সেখানে রাহাতের মা রাহাতকে এসে কর্কশ গলায় ডেকেই চলছে।সে ঘুম থেকে না উঠে পারেনা।অনেকটা বিরক্তি নিয়ে ঘুম থেকে উঠে।তাঁর মায়ের কথা,খুব ভোরে উঠে পড়তে বসতে হবে।ভোরের পড়া বেশি মনে থাকে।তার মায়ের কথা সত্য ঠিকই।কিন্তু রাহাত কখন ঘুমায়,না ঘুমায়-সেদিকেও তো খেয়াল রাখা উচিত তাঁর মায়ের।তাঁর মায়ের আরেক কথা,রাত বারোটার আগে কোনো ক্রমেই ঘুমানো যাবেনা।

রাহাত যে বয়স অতিবাহিত করছে।সেই বয়সে যদি তাঁর সঠিকভাবে ঘুমটাই না হয়।তবে তাঁর শরীর ঠিক থাকবে কীভাবে?আর মানসিক বিকাশ ঘটবেই বা কী করে?সেই ভোরে উঠে পড়তে হবে।পড়া শেষ করে সকাল হলেই নাস্তা করে স্কুল যেতে হবে।স্কুল থেকে কোচিং,কোচিং থেকে প্রাইভেট-এসব করতে করতে সন্ধ্যা।খেলাধুলা করার সময়টুকুও নেই।এভাবে একটা জাতি শিক্ষিত হতে পারে।কিন্তু এভাবে কখনোই তাদের শারীরিক বা মানসিক বিকাশ ঘটবে না।সন্ধ্যায় এসে আবার সেই পড়া।পড়ার টেবিলে বইয়ের দিকে চোখ বুজে থাকা।প্রতিদিন এই একই রুটিন রাহাতের খুব বিরক্ত লাগে।রাহাত এসব সহ্য করতে পারেনা।সে এসব থেকে মুক্তি চায়।

রাহাত এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।কয়েকদিন পরেই শুরু হবে তাদের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা।তাই পড়াশোনার চাপ আগের থেকে একটু বেড়ে গেছে।যদিও সারাবছর ভালোই পড়াশোনা করেছে সে।সব বই ভালোভাবে শেষ করে ফেলেছে অনেক আগেই।কিন্তু বাবা-মা’র চাপে এখন আরো বেশি পড়াশোনা করতে হচ্ছে তাকে।যদিও পরীক্ষার আগে রিভিশন দিতে তাঁর বেশি সময় লাগার কথা না।তবুও বাবা-মা’র চাপে পড়তে হয় তাকে।উপায় তো খুঁজে পায় না সে।

পরীক্ষার আর দুইদিন বাকি।হঠাৎ সেদিন পড়ার টেবিলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রাহাত।ডাক্তার আসে,চিকিৎসা হয়।কোনোমত সুস্থ হয়ে ওঠে সে।ডাক্তার,চিকিৎসা এসব করে কী-ই বা হবে,যদি না রাহাতের বাবা-মা রাহাতের ব্যাপারে সচেতন না থাকে?অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তো থেকেই যায় বার বার।রাহাত যে বয়সের ছেলে-সে যদি এই বয়সেই এত মানসিক চাপে ভোগে আর ঠিকমতো খাবার গ্রহণ না করে।তবে এর পরিণতি খুব ভয়াবহ হতে পারে।

রাহাতের পরীক্ষা মোটামুটি ভালোভাবেই শেষ হয়ে যায়।পরীক্ষা শেষে অনেকদিন অবসর।পড়াশোনা নেই।রাহাত ভেবে পায় না,এতদিনের অবসর-সে কীভাবে কাটাবে?অবসরের কথা চিন্তা করে মনের মধ্যে একধরণের আনন্দ,উদ্দীপনা কাজ করে।আর সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।তাঁর মায়ের হুকুম,এক সপ্তাহের মধ্যে নানু বাড়ি থেকে ঘুরে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করতে হবে।বেশি আনন্দ ভালো না।

মায়ের হুকুম শুনে বেশ মন খারাপ হয় রাহাতের।সে তো চেয়েছিল পরীক্ষা শেষে একটু ঘুরবে,নানু বাড়ি যাবে-সর্বোপরি খুব আনন্দে কাটাবে অবসরের এই সময়টুকু।কিন্তু তা আর হলো কোথায়?

রাহাত তাঁর নানু বাড়ি গিয়ে আনন্দ পায় না।এক সপ্তাহ কতদিন?এই তো শেষ হয়ে যাবে।দিনের হিসাব কষতে কষতে আনন্দের কথা ভুলে যায়,মন খুব খারাপ হয়ে আসে তাঁর।রাহাত তাঁর ইচ্ছামত কিছুই করতে পারেনা।এই পরাধীন জীবন তাঁর আর ভালো লাগেনা।রাহাত আকাশের দিকে তাকায়,গাছে ডাল-পালার দিকে পাখিদের দেখে ভাবে,পাখিরা কত সুন্দর ডানা মেলে নিজের ইচ্ছামত যেখানে ইচ্ছা সেখানেই ঘুরে বেড়ায়।পাখিরা কত স্বাধীন।আমি যদি পাখি হতাম-খুব মজা করতাম।নিজের ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াতাম।কেউ বাধা দিতে আসত না।

রাহাতের ইচ্ছাগুলো অপূর্ণই থেকে যায়।নানু বাড়িতে এসেছে এক সপ্তাহ হলো।তাঁর বাবা রেখে গিয়েছিল।আজ আবার নিতে এসেছে।রাহাত কোনো উপায় না পেয়ে বাবা’র সাথে বাসা চলে আসে।

মায়ের আদেশ এখন থেকে আবার পড়াশোনা শুরু কর।এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করতে হবে।ভালো কলেজে ভর্তি হতে হবে।ভালো ফলাফল করতে হবে।ভালো ফলাফল ছাড়া ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া যাবেনা।তাই কোনো ভাবেই অবহেলা করা চলবে না।

মায়ের হুকুমের গোলাম রাহাত।ইচ্ছে করেও কখনও মায়ের কথার উপর না শব্দটা বলতে পারেনা সে।

রাহাতের পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে।রাহাত বেশ ভালো করেছে।সবাই বেশ খুশি।রাহাতের মা বেশ আনন্দের সাথে রাহাতের ভালো ফলাফলের কথা সবাইকে মুঠোফোনের মাধ্যমে জানাচ্ছে।কিন্তু রাহাতের মনে যেন বিন্দু পরিমাণ আনন্দের ছাপ নেই।

রাহাতে মন খারাপ।রাহাত ভালো ফলাফল করলেও সে চায় মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করতে।আর তা তাঁর বাবা-মা মেনে নিবে না।

এই প্রথম রাহাত তাঁর বাবা-মা’কে তাঁর ইচ্ছার কথা জানিয়েছে।আর তাঁর ফলাফল হিসেবে পেয়েছে,না শব্দটি।তাঁর বাবা-মা কোনোভাবেই তাঁর কথা মেনে নিতে পারছে না।তাদের কথা,আমাদের ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে।এসব ছাড়া দুনিয়ায় দাম আছে নাকি?মানবিক বিভাগে পড়ে কিছু হওয়া যায় না।এই সব কথা রাহাতের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।সেদিন বাসার পরিস্থিতি বেশ গরম-ই ছিল।রাহাত আর একটা কথা বলারও সাহস পায়নি।তবুও তাঁর যে ইচ্ছেটা তাঁর বাবা-মা’র ইচ্ছার থেকে ভিন্ন।সে মানতে পারেনা,বাবা-মা’র ইচ্ছাগুলো কেন তাঁর উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে?তাঁর ইচ্ছার কি কোনো মূল্য নেই?

রাহাত অনেক চেষ্টা করেও পারলো না তাঁর বাবা-মাকে রাজি করাতে।তাদের কথা,এত ভালো ফলাফল করে যদি মানবিক নিয়ে আমাদের সন্তান পড়াশোনা করে,তাহলে আমাদের মান-সম্মান থাকবে না।আর পাড়ার লোকেরাই বা কী ভাববে?কী বলবে?কোনো মতেই এটা মেনে নেয়া যায় না।তোমাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে হবে।ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে।

রাহাতের বাবা-মা’র ইচ্ছাই পূর্ণ হলো।রাহাত বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো।বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলে কী হবে!রাহাত তাঁর বিজ্ঞান বিভাগের সাথে সম্পর্কযুক্ত বইগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।বিজ্ঞান বিভাগের বইগুলো তাঁর পড়তে ইচ্ছে করেনা।দিনকে দিন রাহাতের পড়াশোনার অবস্থা খারাপ পর্যায়ে চলে যেতে লাগলো।টেবিলে বই নিয়ে বসে থাকে ঠিকই।কিন্তু কোনো পড়াই পড়তে পারেনা সে।পড়ার যে একটা আগ্রহ থাকে,সেই আগ্রহের ছিটে ফোঁটাও রাহাতের মাঝে নেই।রাহাত ভেবে পায় না,সে এখন কী করবে!সামনে বার্ষিক পরীক্ষা।প্রস্তুতি অনেকটা খারাপ।সারাবছর না পড়ে কি ভালো পরীক্ষা দেয়া যায়?আর ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে না পারলেই বা কীভাবে ভালো ফলাফল আসবে?

রাহাত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলো।পরীক্ষা শেষে বেশ কয়েদিন পর পরীক্ষার ফলাফল বের হলো।রাহাতের পরীক্ষার ফলাফল ভয়াবহ ধরণের খারাপ হয়েছে।স্কুল থেকে তাদের বাসায় খবর এলো।রাহাতের মা  রাহাতের ফলাফল শুনে রীতিমতো অবাক!নিজের ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে রাহাতকে বেশ মারধরই করলো।

আজ তাদের বাসার পরিস্থিতি বেশ থমথমে।রাহাত কখনো নিজের কক্ষের দরজা বন্ধ করে থাকেনা।আজ বন্ধ করে আছে তো আছেই,খুলছে না।রাতের খাবার টুকুও সে খেলো না।

রাহাত বিশ্বাস করতে পারেনা,তাঁর মা তাকে এভাবে মেরেছে!মারার ফলে অনেক জায়গায় চামড়া ফুলে কালো বর্ণ ধারণ করেছে।রাহাত অনেক কাঁদে,কষ্টে তাঁর বুক ফেটে যায়।এভাবে তাঁর মা তাকে মারতে পারলো!রাহাত ভাবে,এরপর যদি মা আমাকে মারে,আমি আর বাসায় থাকব না।অন্য কোথাও চলে যাব।আর ফিরে আসব না।না খেয়ে মরলেও আসব না।প্রয়োজনে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব।এই বন্দি জীবনের চেয়ে এসব করাই ভালো।এসবে স্বাধীনতা আছে।

ইদানীং রাহাত বেশ উদাস ধরণের হয়ে গেছে।ঠিকমতো খায় না,ঘুমায় না-শরীরের অবস্থা নেহাৎ খারাপ।সেদিন স্কুল শেষে রাস্তা দিয়ে এক বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে আসছিল রাহাত।বান্ধবীর নাম দৃষ্টি।দৃষ্টির সাথে রাহাতের বেশ ভালো বন্ধুত্ব।রাহাতের যত সমস্যা,যত কথা-সব তাঁর বান্ধবী দৃষ্টিকে বলে।হয়তো এতে কোনো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।হয়তো কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।তবে মনের ভেতরে থাকা জমা কষ্টের কথাগুলো কাউকে বললে মন হালকা হয়ে আসে।তাঁর সমস্যার সমাধান হোক বা না হোক,রাহাত তাঁর মনের কথাগুলো দৃষ্টিকে বলে মনটা হালকা করে।কারো সাথে তো তাঁর সেরকম বন্ধুত্ব নেই।স্বয়ং বাবা-মা’ও রাহাতের ইচ্ছার গুরুত্ব দেয়না,রাহাত কী চায় বা তাঁর কোনো কথা আছে কি না-কিছুই শোনেনা।সেখানে দৃষ্টিকে মনের কথাগুলো বলে খুব সুখবোধ করে রাহাত।নিজের ইচ্ছা,নিজের চাওয়া,নিজের না পাওয়া জিনিসগুলো,নিজের কষ্টগুলো একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করে নেয় তাঁরা।

হঠাৎ রাহাতের মা সেদিন রাহাত ও দৃষ্টিকে এক সঙ্গে দেখতে পায়।তৎক্ষণাত কিছু না বললেও রাহাত যখন বাসায় যায়,তখন তাঁর মা এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ জেরা শুরু করে দেয়।অকারণে রাগারাগি করে রাহাতের সঙ্গে।রাহাত নিশ্চুপ!তাঁর হয়তো কিছু বলার আছে।কিন্তু বলে কী হবে?কোনো লাভ-ই তো হবেনা!

রাহাতের পড়াশোনার অবস্থা আগের চেয়ে বেশ খারাপ।রাহাত নিজেও ভেবে পায় না,সে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে!

ধীরে ধীরে এসএসসি পরীক্ষার সময় নিকটে চলে আসে।রাহাত তবুও পড়াশোনায় মন বসাতে পারেনা।আগে পড়াশোনায় যে দম তাঁর ছিল,তা আর নেই।এখন আর তেমন আগ্রহ জাগেনা পড়াশোনা করতে।অথচ অনেক পড়া এখনো বাকি!

রাত যখন গভীর হয়,রাহাতের বাবা-মা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে।রাহাত তখন ফুঁপে ফুঁপে কাঁদে।তাঁর কান্নার শব্দ নেই।মাঝে মাঝে রাহাত নিজেও টের পায় না,সে কাঁদছে।অথচ চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছে।

এসএসসি পরীক্ষা চলে আসে।রাহাত পরীক্ষা দিতে যায়।রাহাত কেন পরীক্ষা দিতে যায়-এই উত্তরটা খুঁজে পায় না সে।সে নিজেই মনে করে,তাঁর পরীক্ষা দেয়াটা অর্থহীন।এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কোনো অর্থ নেই।তবে কেন সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে?শুধু বাবা-মা’র জন্য,তাদের ইচ্ছার জন্য।রাহাতের এখানে কোনো ইচ্ছা নেই,কখনো ছিলও না।রাহাতের ইচ্ছা থাকবেই বা কী করে?তাঁর সব ইচ্ছাকেই তো হত্যা করেছে তাঁর বাবা-মা।তাই রাহাত এখন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবা-মা’র ইচ্ছা রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

রাহাত পরীক্ষা দেয়।কোনোটা ভালো কোনোটা খারাপ।এভাবেই তাঁর পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়।

রাহাত হতাশা ও বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে।মাঝে মাঝে তাঁর মনে হয়,এই জীবন রেখে কী হবে?আত্নহত্যা করে নিজের জীবনটাকে শেষ করে দেই।সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে।কিন্তু সে আত্নহত্যা করেনা।সে কোনো ভুল বা অনৈতিক পথে পা বাড়াবে না।যদি বাড়াতোই অনেক আগেই সে শেষ হয়ে যেত নেশায় ডুবে।রাহাত তা করেনি।অন্তত এরকম নৈতিক অধঃপতন তাঁর দ্বারা সম্ভব না।এই শিক্ষাটা সে গ্রহণ করেনি।

রাহাতের পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে।যেদিন ফলাফল বের হবে সেদিন সকাল হতেই রাহাতের হাত-পা কাঁপতে থাকে।বুকের ভেতর কেমন জানি একটা ভয় কাজ করছে তাঁর।কোথাও স্থির থাকতে পারছেনা সে।আরেক দিকে বাবা-মা’র জন্য ভয়।রাহাতের মা’ও অপেক্ষায় আছে,কখন ফলাফল বের হবে!

রাহাতের ফলাফল হাতে পেয়েছে তাঁর মা।ফলাফল পাওয়ার পর রাহাতের মা’র কেমন যেন একটা অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে।যা মুখ দেখলে সহজে অনুমান করা যায়।

মুখটা বেশ গম্ভীর!রাহাতের ফলাফল ভয়াবহ ধরণের খারাপ হয়েছে।তাঁর মা চিন্তা করতে পারেনা,এই ফলাফল দিয়ে রাহাত কী করবে?এত বাজে ফলাফল সে কীভাবে করেছে?

রাহাত সেদিন আর নিজের কক্ষ থেকে বের হয়নি।রাতে খেতে যখন খাবার টেবিলে যায়,তখন রাহাতের মা ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে খাবার টেবিলেই রাহাতকে খোঁটা দিতে শুরু করে।এসব শুনে রাহাতের চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়!রাহাত কী করবে ভেবে পায়না।টেবিল থেকে সহসা উঠে গেলেও ব্যাপারটা বেয়াদবির পর্যায়ে চলে যাবে।কিছু করার কথা ভাবতে পারেনা রাহাত।মাথা নীচ করে খাবার প্লেটের দিকে এক দৃষ্টিতে খেয়েই চলছে।যদিও গলা দিয়ে খাবার নামছেনা তাঁর।

এক পর্যায়ে তাঁর মা তাকে খাবার টেবিলেই মারধর করতে শুরু করে।এ কী কাণ্ড!রাহাতের বাবা মারধর করার আগ পর্যন্ত নিশ্চুপ ছিল।কিন্তু রাহাতকে এভাবে মারধর করতে দেখে রাহাতকে তাঁর মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজ কক্ষে পাঠিয়ে দেয়।

রাহাত আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল,পূর্বের ন্যায় তাঁর মা যদি তাঁর সাথে এরকম আচরণ করে।তাহলে সে আর বাসায় থাকবেই না।বাসা থেকে বেড়িয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।যেখানে কিছু না থাকুক,অন্তত স্বাধীনতা থাকবে।

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাহাত রাতের আঁধার কাটতে না কাটতেই খুব ভোরে তাঁর সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করবে বলে ঠিক করে রাখে।সে আর এই বাসায় থাকবেনা।এই পৃথিবীতে যত বাস্তুহারা বাবা-মা’হীন শিশু আছে,তাঁরাও পথে ঘাটে শুয়ে-পড়ে বেঁচে আছে।সে কেন পারবে না?না হয় ভেবে নিবে,এই পৃথিবীতে তাঁর কেউ নেই।কষ্ট হলেও অন্তত স্বাধীন ও নিতান্ত এক সুখী জীবন পাবে সে।এই ভাবনাই তাকে সব দুঃখের কথা ভুলিয়ে আনন্দ দেয়,সে স্বাধীন হবে,সে স্বাধীনতা পাবে-নিজের ইচ্ছামত যা খুশি তাই করতে পারবে।

সারারাত ঘুমাতে পারেনি রাহাত।শুধুই কেঁদেছে।তাঁর ইচ্ছের মূল্যায়ন কখনো করেনি তাঁর বাবা-মা।আজ কার ভুলে রাহাত শাস্তি পাচ্ছে?তাঁর নিজের ভুলে?না তাঁর জন্মদাতা পিতা ও জন্মদাত্রী মাতার ভুলের জন্য?

 

রাতের আঁধার কাটতে না কাটতেই রাহাত বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে।কেউ এতটুকুও টের পায়নি।

 

রাহাতের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।সে কোথায় যাবে,সেটাও জানেনা।রাহাত শুধু জানে,এই বন্দি কারাগারে পরাধীনতার শিকল পরতে আর কখনোই ফিরবেনা সে।

 

=======================================================================

 

 

লেখক: শাহরিয়ার সিফাত

কারমাইকেল কলেজ,রংপুর

এইচএসসি ব্যাচ: ২০১৯

 

মোবাইল: 01710457536