আমাদের পারিপার্শ্বিকতা, আমাদের বিবেক ও ভাবনা

সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম :

সমাজে নেতিবাচক কর্মকান্ডের পরিধি দিনে দিনে বেড়েই চলছে। মানুষ যেন ক্রমান্বয়ে বিবেকহীন হয়ে পড়ছে। হৃদয়ের কোমলতা হারিয়ে সত্যিই যেন পাষাণে পরিণত হচ্ছে। অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ তার মূল্যবোধ হারাচ্ছে। ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক ভুলে অনিয়মগুলোকেও নিয়মে পরিণত করছে। ব্যস্ততার মধ্যে অস্থিরতা নিয়ে মানুষ উপলব্ধি করছে না এর ভয়াবহতা, সচেতন নয় তারা সুন্দর আগামীর জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। আমাদের চারপাশে ঘটে চলা তেমনি অনেক নেতিবাচক কর্মকান্ড রয়েছে, যা সমাজে প্রতিনিয়ত আলোচিত-সমালোচিত হয়।

এখানে প্রতিষ্ঠিত ওষুধ কোম্পানির নামে অবৈধভাবে উৎপাদন করছে ভেজাল ওষুধ। জেনে বা না জেনে বিক্রেতা বিক্রয় করছে মেয়াদোত্তীর্ণ স্পর্শকাতর মেডিসিন। কোনো কোনো আমদানিকারক আমদানি করছে নিম্নানের দ্রব্যসামগ্রী। চাষি খেতে ব্যবহার করছে অতিমাত্রায় বিষাক্ত কিটনাশ, শাক-সবজি সতেজ রাখতে মেশাচ্ছে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ। চালকের ভুল কিংবা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালনায় যাত্রী, পথচারী, শিক্ষার্থী নিহত হয়, আপনজনের বিয়োগান্তে কাদছে পরিবারগুলো।

কোনো কোনো চিকিত্সালয়ে সেবার মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। অনেক শিক্ষকই পাঠশালায় পাঠদানে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে ঢের বেশি আগ্রহী প্রাইভেট পড়াতে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে কারো কারো আছে অবৈধ উপার্জন। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আছে, যারা ট্যাক্স ফাকি দেয়, অল্প বিনিয়োগে অধিক লাভ করে। দোকানদার বা বিক্রেতাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা ওজনে কম দেয়।

হোটেলওয়ালাদের কেউ কেউ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অধিক লাভের আশায় ক্ষতিকারক দ্রব্যাদি মিশিয়ে খাবার তৈরি করে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারই তার প্রমাণ। কালোবাজারিদের আছে রমরমা অবৈধ বাণিজ্য। মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা করেও রাতারাতি অঢেল টাকা অর্জন করছে কারবারিরা। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অস্থিরতা, আধুনিকতার খোলামেলা বন্ধুত্বে সম্ভ্রম হারায় পবিত্র বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

ভার্চুয়াল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করছে অবৈধ সম্পর্ক, সন্দেহের বিষপানেও ভাঙছে সুখের সংসার, ইতি ঘটছে অহরহ দাম্পত্যজীবনের। বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্বের আক্ষেপ আর হাহাকার জেনেও সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য বিদেশমুখী করছেন পিতা-মাতা। গোটা জাতি প্লাস্টিকের তৈরি দ্রব্য সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে গ্রহণ করছে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্ট বিষাক্ত পদার্থ। প্রাকৃতিক জিনিসের অবিকল তৈরি হচ্ছে কেমিক্যাল দিয়ে; পরিণতি না জেনে দিব্বি খাচ্ছে মহানন্দে। ক্যানসার তাই এখন প্রায় মহামারির দ্বারপ্রান্তে।

শিশুদের পুষ্টির জন্য পিতামাতা অধিক ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাইয়ে অতিরিক্ত মোটা (ওভেজ) বানাচ্ছেন, দৈহিক গঠন সঠিকভাবে হচ্ছে না। জীবনপ্রবাহ বড়ই জটিল, যান্ত্রিক গাড়ি অচল করেছে দেহগাড়ি। সামাজিকতা এখন মোবাইল বা ট্যাবে বন্ধী। খেলাধুলার মাঠের আয়তন এখন ৪-৬ ইঞ্চি (মোবাইল বা ট্যাব)। বন্ধুত্বের সংখ্যা হাজারো কিন্তু প্রকৃত বন্ধু নেই প্রকৃতিতে। তোষামোদকারীরা কর্তাব্যক্তিকে অনেক বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা বা সত্যতা উপলব্ধি করতে দেয় না। টাকার পেছনে ছুটছে মানুষ, ভুলে যাচ্ছে তার জীবনের ব্যপ্তিকাল।

গ্রামছাড়া মানুষগুলো শহরে এসে দমবন্ধ জীবন যাপন করছে। শিখে নেওয়া আদর্শগুলো বাস্তবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনর্গল মিথ্যা বলার লোকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যে যা বলে, তাদের অনেকেই তা করে না। সম্পদ শুধু করে যাচ্ছে, সন্তান কিন্তু একটি বা দুটি। কে দেখবে, কে খাবে এই সম্পদ তারও হিসাব করে না। কতটুকু প্রয়োজন তা-ও জানে না। ‘অর্থই যেন তাদের সকল সুখের মূল’।

বাস্তবতা হয়তো এমনই, দীর্ঘদিন যাবৎ মাছওয়ালার ফরমালিনযুক্ত মাছ আর সবজিওয়ালার বিষক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত সবজি খেয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল ফলওয়ালা। কলাওয়ালার কার্বাইডযুক্ত কলা আর ফলওয়ালার ফরমালিনযুক্ত ফল খেয়ে একসময় ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল মাছবিক্রেতা।

ব্যবসায়ীদের যারা ট্যাক্স ফাকি দিল, তাদের কারণে রাষ্ট্রের আয় কমে গেল, উন্নয়নের গতি মন্থর হলো, প্রকারান্তরে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। সন্ত্রাসীদের মৃত্যু হয় নাকি সন্ত্রাসেই। আধিপত্য বিস্তারে এক সন্ত্রাসী হত্যা করল তার প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসীকে।

বাসচালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনায় নিহত হলো ছাত্র, কিছুদিন পরে মালবাহী ট্রাকের তলায় চাপা পরল ঐ চালকেরই পুত্র। কোনোটাই কাকতালীয় নয়। অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় বানিয়েছে, সন্তান হয়েছে অমানুষ। বৃদ্ধ বয়সে উপলব্ধি হয় এ উপার্জন কিছু নয়, আদর্শ সন্তানের পিতা হওয়াই ছিল বড় অর্জন। মাদক ব্যবসা করে কামাচ্ছে বড্ড, দিন শেষে দেখল নিজ সন্তানই বড় মাদকসেবী।

বড়ো বড়ো দালান বানাচ্ছে অঢেল টাকার মালিক, রাখছে না অগ্নি নিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা। অগ্নি দুর্ঘটনায় পুড়ছে মানুষ, হারাচ্ছে আপনজন। কোথাও কোথাও বাড়ির নিচে কেমিক্যাল গোডাউন, গ্যাস সিলিন্ডারের স্তূপ, তার ওপর বসবাস করছে মানুষ।

এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনি, তৈরি করেনি প্রশস্ত রাস্তা। দুর্যোগে, দুর্বিপাকে, অগ্নিকা-ে দ্রুত সাহায্য পৌঁছাতে পারে না, অবশেষে আর্তনাদ ও করুণ মৃত্যু। আবার ভবনে আগুন, পুড়ছে মানুষ, সহায়তা না করে ক্যামেরা বা মোবাইলে ছবি তুলছে বা ভিডিও করছে। এর চেয়েও নিষ্ঠুরতা, যখন দেখি দিনে দুপুরে জনসমাগমে শত শত মানুষের সম্মুখে রাস্তার ওপরে এক বা একাধিক সন্ত্রাসী হত্যা করছে একজনকে।

নারীর শ্লীলতাহানি কিংবা নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। অনেক অপরাধই আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। অনেক ক্ষেত্রেই অসৎ ব্যক্তিরা জোটবদ্ধ হয়ে সৎ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে। মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে। তবে সত্যই সর্বদা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সরকার কর্তৃক কত যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সবার সতঃস্ফূর্ততা থাকে না। যে কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলো সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াস। সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলো, সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল, কিন্তু এই সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিপূর্ণতা দিচ্ছে না নকল নামক মহামারি।

আধুনিক প্রযুক্তি জীবনকে করেছে অধিক গতিময়, বাড়িয়েছে অনেক ব্যস্ততা, আর তাই এই ব্যস্ততার জন্যই মনে হয় জীবনকে উপলব্ধি করার ফুরসত নেই কারো, জীবন ফুরিয়ে যায় দ্রুত সময়ে। সমাজে অজ¯্র ঘটনা আছে, যা লিখে শেষ করার নয়।

তাই বলছি, আমাদের নিজ নিজ কর্মকান্ডগুলি আমরা যেন উপলব্ধি করি, নেতিবাচক কর্মকান্ড পরিহার করি, সচেতন হই এবং বিবেককে জাগ্রত করি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে দিই, একটি সুন্দর ও সভ্য সমাজে সবাই মিলে বসবাস করি।

লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, জাহানাবাদ, খুলনা

আপনার মতামত লিখুনঃ