আত্মার আকুতি।

রুহেল মোক্তারা মুক্তা

ফরিদ শ্যামা বর্ণের ছেলেটি লম্বায় মাঝারী,মুখে পান চিবায় আর গল্প করে ক্রেতাদের সাথে।

ক্রেতা না থাকলে আপন মনে গান ধরে। হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে, পাশের দোকানদারদের সাথে।পথের ঠিকানা জানা নাই তাঁর অশিক্ষার বেড়াজালে বন্ধি সেএটা ভেবে মাঝে মাঝে মন খারপ হয় ফরিদের।
ভাবে জনমটাই এমন,অভাব আমাদের পিছু ছাড়বেনা।কাজের শেষে ফরিদ যখন বাসায় আশে,ছোট বোন আয়শার সাথে হাসি ঠাট্টা করে,বলে তোঁর বিয়ে দেব বড়লোক ঘরে সেখানে তোঁর অভাব থাকবেনা।

আয়েশেই দিন কাটাবি,বুঝলী পাগলী,ফরিদ তাঁকে আদর করে পাগলী বলে ডাকে।গ্রামে বাস ফরিদে,
বাবা মারা গেছে সেই শিশুকালে মা আর পাঁচ ভাই বোনের সংসারে সে আকাতরে খাটে রোজকার করে।
বড় বোনের বিয়ে হয়েছে বহুবছর আগে, ছেলে অপরের কাপরের দোকানে কাজ করে।আয় কম তাই স্বপরিবার নিয়ে শাশুড়ীর ঘারে এসে পরে মাঝে মাঝে। তাঁর তিন সন্তান ভরণ পোষন ঠিকমত হয় না।ফরিদ তাই বিষন্ন চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে,ছোট বোনটি ম্যাট্রিক কোনমতে পাশ করেছে,কলেজেও ভর্তি হয়েছে।

আর বড় ভাইটি রাগী বুদ্ধীতেও খাটো কিন্তু কথায় পটু ভালমন্দ কেউ বলতে গেলে তেড়ে আসে গালিগালাজ করে তাই পরিবারে কেউ কিছু বলে না। বিয়ে করেছে বড় ভাই করিম পরিবারকে না জানিয়ে বউটি তাঁর দর্জাল।
আর ছোট ভাই ছমির বুদ্ধী প্রতিবন্ধী কিন্তু প্রেম ভালবাসা বোঝে আর তাই ভালবেসে পাশের গ্রামের এক মেয়েকে ভাগিয়ে সেও বিয়ে করেছে ,শশুড় বাড়ীতে থাকে ঘরজামাই হিসাবে।

এখন সেজো ভাই ফরিদের মাথায় সংসারে দায় আর তাই সে রাতদিন চায়ের দোকানে কাজ করে তাঁর মা রমিছা বাসায় কাজ করে ছোট বোন আয়শা গ্রামে তাঁতের কাজ করে বাকী সময় পড়াশোনা করে।রমিছা সারাজীবন নিজের মনগড়া চিন্তায় মগ্ন ছিল বলে ছেলেমেয়েদের কে ভালভাবে মানুষ করতে পারে নাই।

বাল্য বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল,ভেবেছিল মেয়েকে বিয়ে দিলে সে হয়তো!পরের ঘরে সুখি হবে,এতো অভাব আর থাকবে না তাঁর।কিন্তু বিধি বাম গরীবদের কপালে সুখ থাকেনা।আর তাই আছিয়া ছেলেমেয়ে নিয়ে ছুটে মায়ের কাছে আসে,শশুড়বাড়ীর মুখো হতে চায়না অভাবের তারনায়।

মাঝে মাঝে শশুড়বাড়ী গেলেও আবার মায়ের কাছে চলে আসে স্বামী ,সন্তানসহ।ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকে তাঁদের সংসারে বড় ভাই করিম বউয়ের কথামত নিত্য ঝগড়া বাঁধায় সংসারে। কোন ভাবে চলে তাদের সংসার অভাবের তাড়না ধুকে ধুকে জ্বলেপোড়ে চিবিয়ে খায় যেন,ফরিদ একদিন হঠাৎ আসুস্থ হয় মাথার ব্যমো,গ্রাম্য ডাক্টারের কাছে যায়।

হাতে ধরিয়ে দেয় একগাদা ঔষুধ,সেই ঔষুধ খেয়েও তাঁর মাথার ব্যমো কমেনা। মা, বলে কবিরাজ দেখাও কবিরাজ মশাই বাসায় আসে,সাথে তার পুটলী ভর্তি ঝারফুঁকের জিনিসপত্র । কবিরাজ মশাই আর চোখে তাকিয়ে ফুঁ দেয় ফরিদের গায়ে।আর বলে এটা তেমন কিছু না দুষ্টজিনের নজর পরেছে তাঁর উপর সেটা তাড়াতে হবে,তাঁর জন্য আমায় হাজার টাকা দিতে হবে,কিছু দাওয়াই দিচ্ছি খেলে সেরে যাবে।

দরিদ্র সংসার তাঁর উপর রোজকার সম্পন্ন ছেলে,মা রমিছা বলে কবিরাজ মশাই টাকা আমি জোগার করে দেব,আপনি আমার ছেলেকে সাড়িয়ে তুলুন আপনার হাতে ধরি। কবিরাজ বলে বেশ বেশ মা, চিন্তার কিছু নাই।
সেরে যাবে দয়াল সাঁইয়ের রহমতে।ফরিদ কবিরাজে দেয়া দাওয়াই রোজ খেতে লাগে,আর অসুস্থ সত্তে ও কাজে যেতে হয় তাঁকে।হঠাৎ একদিন সে মাথা ঘুরে পরে যায় বাড়িতে,তাঁর মাথায় পানি ঢালা হয়,কবিরাজ আবার আসে ঝারফুঁক হয়,কিন্তু ফরিদের মাথার ব্যমো কমেনা।

প্রতিবেশী রহিম মিয়া একটু সচেতন ব্যাক্তি সে বলে,কোন ভাল এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার কে দেখান ফরিদ কে,ঝাড় ফুঁকে কিছু হবেনা ছেলেটা সুস্থ করতে চাইলে শীগ্রই ভাল ডাক্টার দেখান।রমিছা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে,ভাই সাহেব,আমার ছেলেটা সেই বাল্য বয়স থেকে সংসারে ঘানি টানছে,ছোট ছেলে আমার বোকাসোকা সে আগেই বিয়ে করে ফেলল।ফরিদের বয়স এখন বাইশ বছর তাঁর বিয়া নিয়া যখন ভাবছি,তখন তাঁর একি ব্যমো হলো।

করিম মায়ের পাশে কথাগুলো শুনছে।এদিকে তাঁর স্ত্রী গোলাপী রেগে আগুন,কেন তাঁর স্বামী তাঁর মায়ের সংসারের ব্যপারে নাক গলাবে। গোলাপি অগ্নিমূর্তি হয়ে কর্কশ গলায় বলে সামান্য ব্যমো হয়েছে তাতেই দেখি তোমার মা পাড়াশুদ্ধ লোক কে জড়ো করেছে।ওরা তো ভাল আছে তোমার খবর কয়বার নেয় , উচ্চস্বরে কথাগুলো বলে গোলাপী।সেই থেকে তাঁর ভাই করিম আর কোন খোঁজখবর নেয় না ফরিদের অসুখের।
এদিকে দিনে দিনে ফরিদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে,পাশ করা ডাক্টার দেখানো হয় কিন্তু ডাক্টার পরীক্ষা করে বলে, ফরিদে ব্রেইন টিউমার হয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এখন টিউমার খরচ ব্যায়বহুল যদি ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারেন তাহলে, অপারেশন করলে সেরে যেতে পারে।

আমি কিছু ঔষুধ লিখে দিচ্ছি এগুলো তাঁকে নিয়মিত খাওয়ান।ডাক্টার দেখানোর পর ফরিদ কে বাড়ীতে আনা হয়।ঔষুধ খাওয়ার পর ফরিদ একটু সুস্থ বোধ করে, তাই মাকে বলে,মা আমি তো এখন একটু সুস্থ আছি,আমায় কাজে যেতে হবে,তা নাহলে খাব কি? আমার ঔষুধ খেতেই তো জমানো টাকা কয়টা শেষ।
মা রমিছা ফ্যালফ্যালিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে,তাঁর যেন বলার ভাষা হারিয়ে গেছে,রমিছা ভাবনার জগৎে হারিয়ে যায়,ভাবে এখন যদি বড় ছেলে করিম সংসারে কিছু দায়ভার নিতো তাহলে আমার অসুস্থ ছেলেকে কাজে যেতে হতো না।

মায়ের নিরব থাকা দেখে ফরিদ কাজে বেড়িয়ে পরে।কয়েক দিন কাজ করার পর সে আবার বেশি অসুস্থ হয়ে পরে। কুসংস্কারে ঢাকা পরিবার এমবিএস ডাক্টারের ঔষুধ শেষ না হতেই তাঁর এক অজ্ঞ এক পরশি মিয়ার কথায় তাকে হোমিওপ্যথী ডাক্টার দেখানো হয়। সেই হোমিওপ্যথী ডাক্টার তাকে দেখে একগাদা ঔষুধ খেতে দেয়।ঔষুধ খাওয়ার পর ক্রমে তাঁর শরীরের অবনতি ঘটে।

এদিকে হাতে ও কোন টাকা পয়সা নাই পরিবার একবেলা খায় তো দুইবেলাই অনাহারে থাকে।
বাধ্য হয়ে তাঁর মা অপরের কাছে হাত পাতে,কিছু টাকাও পায় তাই দিয়ে আগের এমবিবিএস সেই ডাক্টার দেখানো হয়।

ফরিদ কে দেখে ডাক্টার সাহেব রাগান্তিত কণ্ঠে বলেন,আপানারা তো রুগিকে শেষ করে ফেলেছেন হোমিও আর এলোপ্যথী খাইয়ে এখন টিউমার ক্যনসার রুপ নিতে পারে,কিছু পরীক্ষা দিচ্ছি করিয়ে নিয়ে আসেন।
ফরিদকে সিটিস্ক্যানে মধ্যে পরীক্ষা করানো হয়।

ডাক্টার যা ভেবেছিল ফরিদের তাই হয়েছে ক্যানসার এখন আর করার কিছুই নাই ডাক্টারে।
তবুও কিছু ঔষুধ দিলো ব্যামোর যন্ত্রণা নিরময়ে জন্য,আর বললো অপারেশন করাতে পারেন খরচ ব্যায়বহুল তাতে রোগীর মৃতুও ঘটতে পারে।

ডাক্টারের এই কথাগুলো শুনে রমিছা কান্নায় ভেঙে পরল। ফরিদকে বাড়ীতে নিয়ে আসা হলো।
কিন্তু ঔষুধ কেনার মতো সামর্থ্য তাঁদের রইলো না,প্রতিবেশীরা যার যার সাধ্যমত সাহয্য করলো,তাতে কি আর মরণব্যধীর খরচ জোগার হয়। ফরিদ যখন মৃতুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে তখন তাঁর বড় ভাই করিমের টনক নরলো সে একটু খোঁজ খবর নিতে লাগলো।

অভাবী মা, আর বোনেরা অকাতরে চোখের জল ঝড়াতে লাগলো।হঠাৎ একদিন রমিছা দেখলো ফরিদ বিছানায় নড়ছে না সোজা হয়ে পরে আছে,রমিছা চিৎকার করে উঠলো,সবাই ফরিদকে দেখার জন্য ছুটলো,তাঁর বড় বোন আছিয়া ফরিদে শ্বাস বন্ধ বুঝলো,আর করিম নাভী খুঁজে পেলোনা গ্রাম্য ডাক্টার এলো,ফরিদকে মৃত বলে চলে গেল।

রমিছার পরিবারে ক্রন্দনের আহাজারীতে যেন ফরিদের আত্মার আকুতির শেষ কৃর্তি বিদায় হলো।