“অপেক্ষা”-শাহরিয়ার সিফাত

"অপেক্ষা"-শাহরিয়ার সিফাত
বিকেলে স্কুল ছুটির পর বাড়ি এসে কোনো মতো বইগুলো রেখেই খেলার জন্য মাঠে ছুটে যায় পবন।স্কুল শেষ করে বাড়ি এসে একটু খাবার যে খাবে সে খাবারের প্রতি তার যেন কোনো আগ্রহই নেই।বরং তার দুরন্তপনা স্বভাব বলে দেয়,খাবার গ্রহণ করা যেন সময় অপচয়ের একটা মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয়।কেননা স্কুল শেষে খাবার খেতে খেতে তার যে খেলার অনেক দেরি হয়ে যাবে।ওদিকে তার খেলার সাথীরা তার জন্য অপেক্ষা করবে।হয়তো অপেক্ষা করতে করতে তাকে ছাড়াই খেলতে শুরু করবে।কিন্তু পবন চায় না এক্ষেত্রে তার কোনো বিলম্ব হোক।খেলার প্রতি তার যে আগ্রহ,তার যে দুরন্তপনা স্বভাব-এ যেন শৈশবের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য।আর এই চিরচেনা বৈশিষ্ট্য সব শিশুর মাঝে ফুটে উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম।আর খেলতে খেলতে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে।তখন বাড়ি ফিরেই যেন পৃথিবীর যত ক্ষুধা পবনকে ঘিরে ফেলে।ঘর্মাক্ত চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ।এর একমাত্র প্রতিকার তার মা।প্রতিদিন সন্ধ্যায় খেলা শেষ করে বাড়িতে এসে উঠোন না পেরোতেই মা’কে বলবে,”মা,ক্ষুধা লাগছে।ভাত দ্যাও।”
তার এই কথাটা যেন নিত্যদিনের রুটিনে যোগ হয়েছে।সাথে মায়ের বকুনি।সন্ধ্যায় খাওয়া শেষে যখন ধীরে ধীরে রাত ঘন কালো হয়ে আসে।পবনের চোখেও তখন রাজ্যের ঘুম এসে হানা দেয়।কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে,সে নিজেও জানেনা।
একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে প্রতিদিনের মতো খাবার চায় পবন।বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও মায়ের খাবার দেয়ার কোনো নাম নেই।তার মায়ের কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে সে নিজ থেকে উঠে গিয়ে রান্না ঘরে চলে যায়।তার মা তখন রান্না করছিল।সে গিয়ে দেখে তার মায়ের চোখে পানি।সে বুঝতে পারে,এই চোখের পানি আগুনের ধোঁয়ার কারণে নয়।এই চোখের পানি কান্নার।তার মায়ের কান্নার কারণ বুঝতে একটু সময় লাগলেও পরে সে ঠিকই বুঝে যায়,তার মা কেন কাঁদছে।তার মায়ের চোখে কেন পানি।
পবনের বাবার স্বভাব ভালো ছিল না।তিনি ছিলেন নেশাগ্রস্থ।বিভিন্ন ধরণের নেশা করত।তার বাবা শুধু নেশা নয়,জুয়াও খেলত।একবার এই জুয়া খেলার অপরাধে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছিল তার বাবা।অনেক কষ্ট করে টাকা-পয়সা দিয়ে,মানুষের কাছে হাত জোড় করে সেবারের মতো ছাড়িয়ে এনেছে তার মা।তবুও তার বাবা এই জুয়া খেলা ছাড়তে পারেনি।এখন তাদের পরিবার অনেকটা বিধ্বস্ত।তবুও যেন তার বাবার টনক নড়েনা।সারাদিন কাজ-কর্ম ছেড়ে জুয়া খেলে রাতে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা যেন নিত্য দিনের ঘটনা।কোনো কোনো সময় নেশা করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে।আবার কখনো বা রাত কেটে সকাল হলেও বাড়ি ফেরার নাম করেনা।আর এদিকে পবনের মা পবনের বাবার জন্য সারারাত অপেক্ষা করে থাকে।কখনো চোখের পানি ফেলে,কখনো গম্ভীর হয়ে বসে থাকে তার বাবার জন্য অপেক্ষা করে।এই অপেক্ষা করা যেন অভ্যাস হয়ে গেছে তার।চোখের কোণ থেকে ঝরে পড়া পানি পড়তে পড়তে এক সময় শুকিয়ে যায়।তবুও যেন ক্লান্তি নেই।না দেহে,না মনে,না ওই দু’চোখে।কিছুতেই তার মায়ের ক্লান্তি নেই।আর এই ক্লান্তিহীন জীবন তার ভাগ্যের লিখন বলে মনে করে-খুব সহজেই তা মেনে নেয়।
জুয়া খেলা,নেশা করা,পরিবারের প্রতি উদাসীনতা,দায়িত্ববোধহীন ও বিবেকবোধহীন চিন্তা-ভাবনার জন্য সমাজের মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা হারাতে থাকে তার বাবা।সেদিকে তার বাবার যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।থাকবেই বা কী করে?যে মানুষটি সন্তান,পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জুয়া খেলা,নেশায় বুঁদ হয়ে থাকাটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।যেখানে তার সন্তান,পরিবারের প্রতি এতো উদাসীনতা।সেখানে সমাজ আর সমাজের মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্যতা আছে কি নেই-এই ব্যাপারে তার বাবার কোনো মাথা ব্যথাই নেই।আর এটাই হওয়া স্বাভাবিক।
সেদিন পবনের বাবা তার মাকে প্রচুর মারধর করে।শুধু মারধর নয়,বাপ-মা তুলে খুব খারাপ ভাষায় গালিও দেয়।যদিও এই নোংরা কাজগুলো মাঝে মধ্যেই তার বাবা করে থাকে।আর তা নীরবে সহ্য করে যায় তার মা।এই অশিক্ষিত সমাজে স্বামী যাই-ই করুক-মারুক,কাটুক তারপরেও তো স্বামী।স্বামীর উপরে আর কিছু নেই।এই কথাগুলো যেন শুধু পবনের মায়ের মনের ভেতর নয়,সমাজের অধিকাংশ নারীর মনের ভেতর গেঁথে গেছে।আর যার কারণে এতো নির্যাতন,অত্যাচারের শিকার হবার পরেও প্রতিবাদ না করেই নীরবে সহ্য করে যায় তারা।নিজেদের স্বকীয়তা যেন নিজ হাতেই হত্যা করেছে।
পবনের বাবা জুয়া খেলা আর নেশা করার জন্য টাকা চেয়ে না পেলে মাঝে মাঝেই এরকম খারাপ আচরণ করে তার মায়ের সাথে।কখনো জুয়া খেলা,কখনো বা নেশা করার জন্য টাকা।তার বাবার জন্য শুধু টাকা চাই টাকা।এদিকে পরিবারের প্রতি কোনো খেয়ালই নেই।কী খায়?কীভাবে বেঁচে আছে সন্তান পরিবার?কোনো কিছুরই খেয়াল রাখেনা তার বাবা।আর টাকা না পেলে শুরু হয় নির্যাতন।পবনের মা কী করবে বুঝতে পারেনা।সেদিন টাকা না পেয়ে তার মাকে মারধর করে,গালি-গালাজ করে চলে যাবার পর সেই রাতে আর বাড়ি ফেরেনি তার বাবা।
এভাবে চলতে থাকে সবকিছু।পবন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।তার একটু হলেও বুঝ আসে।তার বাবার আচরণ,কাজ-কর্ম কোনো কিছু ভালো লাগেনা তার।তার বাবা যখন তার মাকে মারধর করে।তখন তার অনেক খারাপ লাগে।অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে যায় বাবার প্রতি।এক ধরণের তিক্ততা আর বিরক্তি কাজ করে তার বাবার জন্য।সে মনে মনে ভাবে আর পণ করে,সে তার বাবার মত হবেনা।সে একজন মানুষ হবে।শুধু মানুষ নয়,একজন খাঁটি মানুষ।বড় হয়ে তার মায়ের দুঃখ ঘুচাবে।সুখে রাখবে তার মাকে।সেজন্য তার চোখে অনেক স্বপ্ন ঘুরে ফিরে।আর এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে যে তাকে অনেক কষ্ট করতে হবে এবং অনেক পড়ালেখা করতে হবে,সেটা সে বোঝে।কিন্তু তার বাবা তাদের পরিবারের কর্তা হয়েও যে আচরণ,যে অবহেলা তাদের উপর করে আসছে।তাতে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত মুখে জুটানোই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।যেখানে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জুটাতে যুদ্ধ করতে হয়।সেখানে পড়ালেখা-
এসব ভাবতে ভাবতে পবনের মন খারাপ হয়ে আসে।সে আর ভাবতে পারেনা,ভাবতেও চায়না।সে শুধু ভাবতে চায়,এই দিনগুলো কবে শেষ হবে?সে শুধু ভাবে,কবে সুখে থাকব আমরা?কবে মায়ের ওই চোখের পানির বদলে মুখে ফুটবে সুখের হাসি?কবে?
যে বয়সে পবনের দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা।সহপাঠী,স্কুল,খেলা-এসব নিয়ে ভাবার কথা।সেখানে বাস্তবতার নির্মম বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে সে।মাঝে মাঝে বুঝতে পারেনা,সে কোথায় যাচ্ছে।দিন যত যায় তার সেই রুটিন বদলে যেতে থাকে।
বাবা-মা’র সাথে আর থাকা হচ্ছেনা পবনের।তার বাবা-মা দুজনেই ঢাকা চলে যাবে টাকা উপার্জন করার জন্য।
পবন কখনো ঢাকা যায়নি।দেখেনি ঢাকা কেমন।অনেক বার নাম শুনেছে মানুষের মুখে মুখে।টিভিতে মাঝে মধ্যে দেখেছে।আর বইয়ে পড়েছে,বাংলাদেশের রাজধানীর নাম ঢাকা।
তার বাবা-মা’র পেটের দায়ে ঢাকা যাওয়া কতদিন কত সময়ের জন্য পবন তা জানেনা।মায়ের হাতের রান্না,আদর,বকুনি-আবার কবে পাবে,সে তাও জানেনা।গভীর অনিশ্চয়তা কাজ করে তার মনে।সে ভাবতে পারেনা তার জীবনে একটা দেয়াল সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।সে সত্যিই সহ্য করতে পারেনা,এই বয়সে তাকে কেন এত অনিশ্চয়তা আঁকড়ে ধরে আছে!সে তো ছুটতে চায়,খেলতে চায় সারাটা বিকেল।তার সেই দুরন্ত শৈশব কাটিয়ে দিতে চায় হেসে খেলে।সন্ধ্যা হলে ঘর্মাক্ত শরীরে মাকে এসে বলতে চায়,”মা,ক্ষুধা লাগছে।ভাত দ্যাও।”
পবনের বাবা-মা শুধু পেটের দায়েই ঢাকা যাচ্ছেনা।তার বাবা অনেক টাকা ঋণ করে ফেলেছে।জুয়া খেলা,নেশা করা এসব করতে করতে নিজেকে তো ধ্বংস করেছেই,অনেক টাকা ঋণও করে ফেলেছে।আর এই ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবে,তা ভেবেই অনেকটা চাপের মুখে পড়েই-এই ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের।দুজন মিলে একসাথে রোজগার করলে অনেক টাকা খুব কম সময়ে পুঁজি করা যাবে।এই ভেবে তার বাবা-মা দুজনেই ঢাকা যাচ্ছে।এছাড়া তাদের আর কী-ই বা করার আছে?কিছু করার নেই।পবনকে রেখে যাবে তার ফুপুর কাছে।মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবে তার ভরণ-পোষণের জন্য।তাছাড়া কে আর তাকে রাখতে চাইবে?
ঢাকা চলে যায় পবনের বাবা-মা।এদিকে পবন খুব একা হয়ে যায়।তার সেই দুরন্তপনা স্বভাব যেন দিন দিন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।বাবা-মা’হীন,তাদের সান্নিধ্য,তাদের আদর-সবকিছু থেকেই এখন বঞ্চিত সে।প্রাণহীন হয়ে উঠছে তার জীবন।তার চারপাশ,তার জীবন-সবকিছু সবকিছুই পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।তার জন্য এখন আর তার সহপাঠীরা অপেক্ষা করে থাকেনা।সবকিছু স্তব্ধ,আনমনা পবন।
পবনের বাবা-মা মাঝে মাঝেই মুঠোফোনে খোঁজ-খবর নেয় তার।তবে খুব বেশি নেয়না।এসব কোনো কিছুর কারণ খুঁজেনা সে।যখন তার বাবা-মা’র সাথে কথা বলে।তখন সে ফুঁপে ফুঁপে খুব কাঁদে।তখন তার ইচ্ছে করে বাবা-মা’র কাছে ছুটে যেতে,একটু আদর নিতে।সে পারেনা।সে কাঁদে আর কাঁদে।সেই কান্নার চোখ মুছে দেয়ার কেউ নেই।আর আট-দশটা শিশুর মতো তার জীবনটা হতে পারত না কি?
এর মাঝে একটা ইদে পবনের বাবা-মা ঢাকা থেকে এসেছিল।তার জন্য অনেক কিছু নিয়ে এসেছিল।কিন্তু অন্যান্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে সেসব জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি সে।কারণটা তার বাবা-মা বুঝলেও,না বোঝার ভান করে সেবারের মতো আবার ঢাকায় চলে যায়।পবন-আবারও একা।
এরপর অনেকদিন খোঁজ নেই।একদিন কোনো একটা কারণে তার বাবা’র সাথে তার মায়ের ঝগড়া লেগে যায়।একটা প্রবাদ আছে,”Black will take no other hue-কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না।”পবনের বাবা’র স্বভাবটাও ঠিক তেমন।নিজের এই অস্বাভাবিক স্বভাবটা বাইরে গিয়েও বদলাতে পারেনি।সেদিন খুব মারধর করে পবনের মাকে।তার মা এসব যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে তার বাবাকে  ছেড়ে বেরিয়ে যায়।কোথায় যাবে এখন সে?ঢাকা শহরে কে বা কাকে জায়গা দিবে?ঢাকা শহরের এমন কাউকে সে চিনেনা,যেখানে একটু জায়গা পাবে।তবে তার মা যে আর তার বাবা’র কাছে ফিরবেনা,তা নিশ্চিত করে বলা যায়।কোনো কিছু না ভেবেই তার মা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
দুর্ভাগ্য যার কপালে লেখা,সে কি সহজে মুছে ফেলা যায়?পবনের মা যে গাড়িতে করে গ্রামের বাড়ি ফিরছিল।সেই গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং সেই দুর্ঘটনায় তার মায়ের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে।তার মায়ে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা গ্রাম।সে বাকরূদ্ধ হয়ে যায় মায়ের নিথর দেহ দেখে।তার তো অনেক স্বপ্ন ছিল।মাকে সুখে রাখবে,মায়ের দুঃখ ঘুচাবে।কিন্তু সেই আশা,সেই চাওয়া,সেই ইচ্ছে শুধু স্বপ্নই থেকে গেল।পূর্ণ আর হলো না।
ওদিকে পবনের বাবা’র খোঁজ মিলছেনা।মুঠোফোন বন্ধ!গ্রামে সবার মুখে মুখে গুঞ্জন।কিসের গুঞ্জন-তা সহজেই বুঝতে পারে পবন।সে তো আগে থেকেই বাস্তবতা কী জিনিস তা বুঝতে শিখেছে।মুহূর্তেই সে বুঝে যায়।মনে তার প্রশ্ন আসে,মা হঠাৎ না বলে বাড়ি ফিরবে কেন?আর যদি ফিরেই,তো সাথে বাবা নেই কেন?কেন তার বাবা’র ফোন বন্ধ?
হয়তো সে বুঝতে পারে,হয়তো না।তবে গ্রামের মানুষদের কথায় পরিষ্কার বোঝা যায়,এটা নিতান্ত হত্যা।তার মাকে খুন করা হয়েছে।আর খুনিটা তার বাবা নিজেই!
পবনের বাবা’র খোঁজ নেই অনেকদিন যাবত।তার ফুপু আর তাকে রাখতে চাইছে না নিজের কাছে।নিজের পেটের আহার জোটাতে যার অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়।সে আবার আরেকজনকে খাওয়াবে কীভাবে?যদিও তাকে রাখার সামর্থ্যটা তার ফুপুর ছিল।কিন্তু এই যুগে কারো দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না।অনেক কে দেখা যায়,সন্তানেরা অনেক ভালো অবস্থানে থেকেও নিজের বাবা-মা’র খেয়ালটুকুও রাখেনা।অনেক সময় দেখা যায়,সন্তানেরা থাকে বড় বড় দালানে।আর বাবা-মা কোনো মতো মাথা গুঁজে থাকে ছোট্ট কুড়ে ঘরে।কখনো বা আশ্রয় নেয় বৃদ্ধাশ্রমে।যেখানে এত আপন সম্পর্ক মানুষকে টানতে পারেনা।সেখানে পবনের ব্যাপারটা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মেনে নিতে হয়।
পবনকে আশ্রয় দেবার মতো আর কেউ রইলো না।ওদিকে বাড়ি-ভিটা অন্যেরা দখলে নিয়েছে।তার বাবা’র খোঁজ নেই।অন্যের ঋণের টাকা শোধ করার নাম নেই।উপায় না দেখে পাওনাদার লোকেরা বাড়ি-ভিটা দখলে নিয়েছে।শেষ আশ্রয় টুকুও শেষ।এখন কী করবে পবন?
লালমনিরহাট থেকে রংপুর।রংপুর থেকে লালমনিরহাট।।হয়তো কখনো লালমনিরহাট ছেড়ে বুড়িমারী বা রংপুর ছেড়ে দিনাজপুর অথবা রেললাইন যতদূর গেছে ট্রেনে ট্রেনে বগিতে বগিতে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে এখন নিজের পেটের অন্ন জোগান দেয় পবন।হয়তো কোনোদিন কিছু টাকা বেশি আয় হলে সেটা নিজের কাছে জমা রেখে দেয় ভবিষ্যতের জন্য।
এই বয়সে এতটা নির্মম বাস্তবতার শিকার হতে হবে,সে তা কখনো ভাবতে পারেনি।যে বয়সে দুরন্তপনায় বুঁদ হয়ে থাকার কথা ছিল।সেই বয়সে পবন যে নিষ্ঠুর সময় অতিবাহিত করে আসছে,তা ভাবাতীত।কিন্তু তার অভ্যাস হয়ে গেছে এই সময়গুলোর সাথে লড়তে লড়তে।একদিনে তো এমনটা হয়নি।তবে এটা কখনো কেউ চায় না।কোনো শিশু মনে এভাবে এত বড় মানসিক আঘাত কখনোই কাম্য নয়।
পবন এসব বুঝতে চায় না।সে বোঝে,লড়তে হবে,পেটে অন্ন দিতে হবে,বাঁচতে হবে তাকে।
কষ্টগুলোকে তার আর কষ্ট মনে হয় না।শুধু মনে হয়,কষ্টগুলো হয়তো তার নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী।
বাড়ি-ঘর কিছু নেই।স্টেশনের প্লাটফর্মের মেঝেতেই রাত কাটিয়ে দেয় সে।উত্তরাঞ্চলে শীতকালে ঠাণ্ডার প্রকোপ অনেক বেশি থাকে।এই শীতে স্টেশনের প্লাটফর্মের মেঝে কনকনে ঠাণ্ডা থাকে।সেই মেঝেতেই বস্ত্রহীন রাত কাটিয়ে দেয় পবন।কত শত যাত্রী,কত শত মানুষ।কেউ তাদের কষ্ট দেখেনা।তার মতো অনেকেই মেঝেতে রাত কাটিয়ে দেয় এই কনকনে ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে।কেউ হয়তো পাগল,কেউ হয়তো ঘরহীন আর কেউ হয়তো পবনের মতো।
পড়ালেখা করা হলো না পবনের।অনেক স্বপ্ন ছিল তার,পড়ালেখা করবে।আর পড়ালেখা শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে তার মাকে সুখে রাখবে,তার মায়ের দুঃখ ঘুচাবে।কিন্তু কোনোটাই পূর্ণ হলো না তার।মাকে হারালো,পড়ালেখা করতে পারল না-সবকিছু শেষ হয়ে গেল তার।তার বয়সের অনেক শিশুর জীবনের ফুল তো কেবল ফুটতে শুরু করেছে।কিন্তু তার জীবনের ফুল ফোটার আগেই ঝরে পড়ে গেল।এসব কিছু নিয়ে আফসোস করেনা সে।তবে মাঝে মাঝে এসব ভেবে তার অনেক মন খারাপ হয়।
গ্রামে ফুপু ছাড়া আর কেউ নেই পবনের।মাঝে মাঝে ফুপুর সাথে যোগাযোগ হয় তার।কখনো কখনো ফুপুর সাথে দেখা করতে ছুটে যায় গ্রামে।হয়তো কখনো একটা রাত ফুপুর বাড়িতেই কাটিয়ে দেয়।স্টেশনের প্লাটফর্মের মেঝেতে ঘুমাতে ঘুমাতে অভ্যাস হয়ে গেছে তার।তবে আস্ত একটা নরম বিছানায় রাত কাটাতে পারলে মন্দ হয় না।সেই আশায় রাতে ঘুমিয়ে যায় ফুপুর বিছানায়।তার ফুপু যখন তাকে রান্না করে খাওয়ায়।তখন তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।মনে পড়ে যায়,সন্ধ্যা হলে খেলার মাঠ থেকে এসে ঘর্মাক্ত চোখ-মুখ,ক্লান্ত দেহ নিয়ে মাকে বলা সেই কথাটি,”মা,ক্ষুধা লাগছে।ভাত দ্যাও।”আজ সব স্মৃতি।
ওদিকে পবনের বাবা’র কোনো খোঁজই মিলছে না।এত বড় একজন মানুষ যদি নিজ থেকেই নিঃখোঁজ হয়ে যায়।তখন তাকে খুঁজে না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।যদিও তার বাবাকে খুঁজতে কেউ কখনো আগ্রহ দেখায়নি।আগ্রহ দেখাবেই বা কী করে?নিজের একটা সন্তান আছে।সেই সন্তান কেমন আছে?কী করে বেঁচে আছে?কোনো খবর নিতে যে একবারের জন্য খোঁজ রাখেনি।তার আবার কে খোঁজ রাখবে?নিজের ঔরস জাত সন্তানের প্রতি এরকম অন্যায় কতটা নিষ্ঠুর বাবা হলে করতে পারে?তা ভাবতেও কষ্ট লাগে।হয়তো কোনো কারণে তার বাবা গা ঢাকা দিয়ে আছে।হয়তো কারণ হতে পরে এমনও যে,অন্য কোনো নারী সাথে আবার-
এর মাঝে অনেকদিন গ্রামে ফুপুর কাছে যাওয়া হয়নি পবনের।সেদিন মুঠোফোনের দোকানে গেছে মুঠোফোনে ফুপুর সাথে কথা বলতে।সে তার ফুপুর মুঠোফোর নম্বর মুখস্থ রেখেছে।তবুও তার পকেটে থাকা মুঠোফোন নম্বর লেখা কাগজটি খুব সাবধানে বের করছে।যদি ছিড়ে যায়।ফুপুর নম্বর লেখা কাগজটি সব সময় তার পকেটেই থাকে।কাগজের জীর্ণ অবস্থার মতো তার পরনের জামা-কাপড়ও জীর্ণ হয়ে গেছে।যা রোজগার করে,তাতে নতুন পোশাক ধরা ছোঁয়ার বাইরে।নম্বর মুখস্থ থাকা সত্ত্বেও পকেট থেকে নম্বর লেখা কাগজটি বের করে দোকানদারকে দেয়।সে ভাবে,মুখস্ত বললে যদি ভুল হয়ে যায়।তখন অন্য নম্বরে কল গেলে বারতি টাকা খরচ হয়ে যাবে।তার কাছে প্রত্যেকটা টাকাই এখন মূল্যবান।তাই এত সাবধানতা।ফুপুকে ফোন দিয়ে বলে,”আগামী বৃহস্পতিবার রাতে সে গ্রামে যাবে…।”
বৃহস্পতিবার।প্রতিদিনের মতো খুব ভোরে উঠে জিনিসপত্র গুছিয়ে ঠিকঠাক করে ট্রেনে উঠে পবন।এই ট্রেন,ওই ট্রেন বগিতে বগিতে ঘুরতে ঘুরতে দুপুর।হঠাৎ লালমনিরহাট স্টেশনে দেখে তার বাবা।কাকতালীয়ভাবে তার বাবাও তাকে দেখে ফেলে।হঠাৎ তার বাবাকে দেখে কেমন নিশ্চল,স্তব্ধ হয়ে যায় সে।বুঝতে পারেনা,এখন তার কী করা উচিত।অনেক্ষণ রোবটের মতো দাঁড়িয়েই থাকে।তার বাবা প্রতারিত হয়েছে এক নারীর কাছ থেকে।ঢাকা শহরের কিছু মানুষ অনেক ফাঁদ পেতে বসে থাকে।তার বাবা তা বুঝতে পারেনি।তাই নিজের অজান্তেই এক নারী ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে।হয়তো এই শিক্ষাটার দরকার ছিল তার।
যা রোজগার করেছিল,তার প্রায় সবটুকু ওই প্রতারক নারীর পিছনে শেষ করে ফেলেছে তার বাবা।তার বাবা জানেনা,জীবন কত কঠিন।জানেনা,তার কর্মের ফল তাকে একদিন দিতে হবে।তার বাবা জানেনা,মানুষের জীবনটা প্রতিধ্বনির মতো।যা করবে তাই ফেরত পাবে।কথায় আছে,”As you make your bed,so you must lie on it-যেমন কর্ম তেমনি ফল।”এই সূত্রটা তার বাবা জানেনা।আর জানলে হয়তো পবন তার মাকে হারাতে না,তার পড়ালেখা বন্ধ হতো না।
পবনের বাবা তার দিকে এগিয়ে আসে।সে স্তব্ধতা কাটিয়ে ভাবনায় ফিরে আসে।অতীত মনে পড়ে।তার এই অবস্থার জন্য যে তার বাবা দায়ী-সহজে তা অনুমান করতে পারে।আর সবকিছুর জন্য তার বাবা’র প্রতি তার যে ঘৃণা জন্মেছে।সে ঘৃণা যেন জলন্ত আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে।তাই তার বাবা’র সাথে দেখা করার,কথা বলার-কথা ভাবতে পারেনা সে।তার বাবা’র হাতে কয়েকটা ব্যাগ ছিল।পবনের জন্য বোধহয় জামা-কাপড় আর খাবার এনেছে।ব্যাগের সংখ্যা আর ব্যাগের দিকে তাকালেই বোঝা যায়,অনেক কিছুই এনেছে তার জন্য।কিন্তু ওসবের প্রতি তো তার কখনো কোনো আগ্রহ ছিল না।আগ্রহ ছিল শুধু একটু ভালোবাসার প্রতি।সেটা তো সে পায়নি।এখন এসব দিয়ে কী করবে সে?
সে অতীত ভাবতে পারেনা,আর ভাবতেও চায় না।তাই সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রংপুর মুখী এক চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ে সে।চলন্ত ট্রেনে দৌঁড়ে উঠা তো তার অভ্যাস হয়ে গেছে।আর তার চলে যাওয়ায় তার বাবা হাত বাড়িয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে।
পবনের বাবা গ্রামে ফিরে যায়।গ্রামে ফিরে দেখে তার বাড়ি-ভিটা দখল হয়ে গেছে।অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে চলে যায় তার বোনের কাছে।তার বোন মানে পবনের ফুপু।তার বোন অবাক হয়ে যায় তার ভাইকে দেখে।এতদিন যার খোঁজ ছিল না-হঠাৎ তার আবির্ভাবে খুশি হওয়ার কারণ খুঁজে পায় না সে।স্টেশনে যে পবনের সাথে তার দেখা হয়েছিল-সব কথা বোনকে খুলে বলে।তখন তার বোন বলে,সেদিন ফোন করে আজ রাতে আমার এখানে আসার কথা বলেছিল পবন।
পবনের বাবা এই কথা শুনে আশায় বুক বেঁধে থাকে,পবন ফিরবে।অপেক্ষা করে রাত হয়ে যায়।পবন আসে না।তবুও পবনের বাবা আশা ছাড়তে পারেনা।পবন ফিরবে।অপেক্ষা করতে করতে মনে পড়ে যায়,পবনের মা তার জন্য ঠিক এভাবেই অপেক্ষা করত,কখন বাড়ি ফিরবে।আজ ঠিক সেই কাজটাই পবনের জন্য তার বাবাকে করতে হচ্ছে,অপেক্ষা।আর এই অপেক্ষা যে কত কষ্টের তা অনুভব করতে পারে পবনের বাবা।নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হয় তার।আর ওদিকে রাত গভীর হয়ে আসে।আর অপেক্ষার প্রহর বাড়তেই থাকে…।
লেখক: শাহরিয়ার সিফাত
কারমাইকেল কলেজ,রংপুর
এইচএসসি ব্যাচ: ২০১৯
==============================
আপনার মতামত লিখুনঃ